যে যুগে লম্বা চুল রাখা অপরাধ ছিল
· Prothom Alo

স্কুলে বা কলেজে পিটি স্যারদের কাছে চুল নিয়ে বকুনি খায়নি, এমন ছেলে বোধ হয় খুব কমই আছে। ‘চুল এত বড় কেন? কালই সেলুনে গিয়ে ছেঁটে আসবে’—কথাটা অনেকের কাছেই পরিচিত মনে হতে পারে। স্কুল-কলেজের নিয়মকানুন তো আমরা বুঝি, কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে আস্ত একটা সাম্রাজ্যে ছেলেদের লম্বা চুল রাখার ওপর রীতিমতো সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ! দেশের সরকার রীতিমতো আইন করে ছেলেদের বড় চুল রাখা নিষিদ্ধ করেছিল! চলো, আজ তোমাদের সেই অদ্ভুত ফ্যাশন পুলিশের গল্প শোনাই।
ফ্যাশন মানে কিন্তু সব সময় শুধু নিজেকে সুন্দর বা স্টাইলিশ দেখানো নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখবে, মানুষ কেমন পোশাক পরছে বা কেমন হেয়ারস্টাইল করছে, সেটা দিয়ে অনেক সময় তার সামাজিক অবস্থান, রাজনীতি বা মানসিকতাও বোঝা যায়। তুমি কোন দলকে সমর্থন করো বা কোন সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট, তা তোমার স্টাইল দেখেই অনেকটা বলে দেওয়া যায়। ঠিক এ কারণেই অনেক সময় ক্ষমতাবান মানুষেরা সাধারণ মানুষের সাধারণ একটা ফ্যাশন দেখলে ভয় পেয়ে যান!
Visit saltysenoritaaz.com for more information.
৪১৬ খ্রিষ্টাব্দের কথা। রোমান সম্রাট হনোরিয়াস এবং দ্বিতীয় থিওডোসিয়াস দেখলেন, রোমের তরুণ ও পুরুষদের মধ্যে ঘাড় অবধি লম্বা চুল রাখার একটা মারাত্মক ট্রেন্ড শুরু হয়েছে। সম্রাটরা চোখ কপালে তুলে ভাবলেন, ‘অ্যাঁ! আমাদের সভ্য রোমান পুরুষেরা এসব জংলির মতো কী শুরু করেছে?’ ব্যস, তাঁরা লম্বা চুলের বিরুদ্ধে কড়া আইন পাস করে দিলেন!
পশুদেরও কি পোষা প্রাণী থাকেএখন তোমার মনে হতে পারে, সম্রাটদের হয়তো ছেলেদের এই লম্বা চুল দেখতে জংলি জংলি লাগত বলেই তাঁরা এ আইন করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসবিদ হাভিয়ের আর্স তাঁর গবেষণাপত্রে আসল সত্যিটা ফাঁস করেছেন। ব্যাপারটা মোটেই শুধু সৌন্দর্যের ছিল না, এর পেছনে ছিল রোমানদের বিশাল ইগোর গল্প! তা ছাড়া লম্বা চুলের জন্য একটা দেশের সব মানুষকে তো আর জংলির মতো লাগে না!
রোম সাম্রাজ্যের চারপাশে তখন ফ্রাঙ্ক, গথ ও জার্মান আদিবাসীদের ঘোরাঘুরি। রোমানরা নিজেদের পৃথিবীর সবচেয়ে সভ্য জাতি মনে করত এবং এদের নিচু জাতের বলে গাল দিত। সমস্যা হলো, এই বর্বরদের স্টাইল ও লম্বা চুলের ফ্যাশন রোমানদের মধ্যে এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠল যে রোমের সাধারণ মানুষও তাদের মতো স্টাইল করতে শুরু করল। ভেবে দেখো, তুমি হয়তো তোমার অপছন্দের কোনো মানুষের হেয়ারস্টাইল তোমারই দলের লোকদের কপি করতে দেখছ! রোমান অভিজাতদের জন্য এর চেয়ে বড় অপমানের আর কী হতে পারে? শত্রুদের ফ্যাশন নিজেদের দেশের ছেলেরা কপি করছে, এটা তো রীতিমতো প্রেস্টিজ ইস্যু!
প্রাচীন রোমে মানুষের ফ্যাশন নিয়ে এমন খবরদারি করাটা অবশ্য নতুন কিছু ছিল না। সেখানে লেক্স ভেস্টিয়ারিয়া নামে একধরনের আইন ছিল। এই আইনের কাজ কাজ হলো, কে কী পরবে, তা ঠিক করে দেওয়া! সমাজের পদমর্যাদা অনুযায়ী পোশাক ঠিক করা হতো। একজন সাধারণ মানুষ বা দাস যেন কখনোই ভুলে অভিজাতদের মতো পোশাক পরতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করা হতো। এমনকি রাষ্ট্রের বড় বড় সেনেটরেরও সামরিক পোশাক বা আর্মিদের মতো বুট পরা নিষেধ ছিল।
এআই প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোনো বই কিনে স্ক্যান করেই পুড়িয়ে দিচ্ছে কেনলম্বা চুল নিষিদ্ধ করার সময়টাও কিন্তু একেবারেই কাকতালীয় ছিল না। ৪১০ খ্রিষ্টাব্দে ভিজিগথ রাজা অ্যালারিক রোম আক্রমণ করে পুরো শহর রীতিমতো তছনছ করে দিয়েছিলেন। সেই লজ্জাজনক ঘটনার মাত্র ছয় বছর পর যখন রোমান সম্রাটরা দেখলেন, দেশের মানুষ শত্রুদের মতো লম্বা চুল রাখছে, পশুর চামড়ার পোশাক পরছে; তখন তাঁরা প্রমাদ গুনলেন। তাঁদের ভয় হলো, রোমানদের বুঝি জার্মানিকরণ হয়ে যাচ্ছে! এই ট্রেন্ড চলতে থাকলে তো মানুষের মন থেকে রোমান সম্রাটদের প্রতি ভক্তিই উঠে যাবে। তাই লম্বা চুলের পাশাপাশি পশুর চামড়ার পোশাক পরাও পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হলো, এমনকি দাসদের জন্যও!
এখন প্রশ্ন হলো, রোমান সম্রাটদের এই ফ্যাশন পুলিশগিরি কি শেষ পর্যন্ত কাজে লেগেছিল? একদম না! জোর করে, আইন চাপিয়ে কি আর মানুষের স্টাইল বদলানো যায়? মজার ব্যাপার হলো, সম্রাটরা যাদের স্টাইলকে এত ভয় পেতেন, সেই তথাকথিত বর্বরদের হাতেই ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। রোমান সম্রাটদের গদি, সামরিক শক্তি, অর্থনীতিসহ সবকিছুই সেই লম্বা চুলওয়ালাদের দখলে চলে যায়। অর্থাৎ শেষ হাসিটা কিন্তু ওই লম্বা চুল ও পশুর চামড়া পরা ফ্যাশন-সচেতন বর্বররাই হেসেছিল!
সূত্র: পপুলার সায়েন্স
গড়িমসি কেন করি