স্ত্রীর মৃত্যু, জেল, এবার নিলামে বাড়ি—রাজপালের জীবনে একের পর এক ধাক্কা

· Prothom Alo

পর্দায় তাঁকে দেখলেই দর্শক হাসবেন—বলিউডে প্রায় তিন দশকের ক্যারিয়ারে রাজপাল যাদব যেন এমন এক নিশ্চয়তার নাম হয়ে উঠেছেন। কখনো তাঁর মুখভঙ্গি, কখনো সংলাপ বলার ধরন, কখনো আবার উদ্ভট পরিস্থিতিতে তাঁর অসহায় উপস্থিতি হাসিয়েছে কোটি দর্শককে। অথচ পর্দার সেই হাসির মানুষের নিজের জীবনটা মোটেও হাসির ছিল না। মাত্র ২০ বছর বয়সে স্ত্রীকে হারিয়েছেন। ক্যারিয়ার গড়তে করেছেন দীর্ঘ সংগ্রাম। সিনেমা বানাতে গিয়ে ঋণের জালে জড়িয়েছেন। সেই ঋণ থেকে চেক বাউন্স মামলা, বারবার আদালত আর কারাগার। এবার তাঁর পৈতৃক সম্পত্তিও নিলামে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংক।

একদিকে তাঁর অভিনীত সিনেমা হলে দর্শক হাসছেন, অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে চলছে একের পর এক কঠিন অধ্যায়। রাজপালের জীবনের এই দুই বিপরীত ছবি যেন বলিউডের ঝলমলে পর্দার আড়ালের আরেক গল্প।

Visit grenadier.co.za for more information.

ছোট শহর থেকে শুরু
১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরের কুন্দ্রায় জন্ম রাজপাল যাদবের। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায়। সেখান থেকে অভিনয়ের পাঠ নিয়ে শুরুতে টেলিভিশনে কাজ করেন। পরে পা রাখেন সিনেমায়।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তাঁর পরিচিতি কিন্তু কৌতুক অভিনেতা হিসেবে নয়। রাম গোপাল ভার্মার ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন। এরপর ধীরে ধীরে কমেডিতে নিজস্ব জায়গা তৈরি করেন।

‘মুঝসে শাদি করোগি’, ‘চুপ চুপ কে’, ‘মালামাল উইকলি’, ‘ফির হেরা ফেরি’, ‘ঢোল’, *‘ভুল ভুলাইয়া’*সহ অসংখ্য ছবিতে ছোট-বড় চরিত্রকে নিজের অভিনয়গুণে স্মরণীয় করেছেন। বড় তারকাদের পাশে থেকেও বহুবার দৃশ্য নিজের করে নিয়েছেন রাজপাল।
কিন্তু এই সাফল্যে পৌঁছানোর অনেক আগেই তাঁর জীবনে নেমে এসেছিল বড় বিপর্যয়।

২০ বছর বয়সেই স্ত্রীর লাশ কাঁধে
তখন তাঁর বয়স মাত্র ২০ বছর। সংসার শুরু করেছিলেন। প্রথম সন্তানের জন্মের সময়ই মারা যান তাঁর স্ত্রী। জীবনের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে রাজপাল এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, পরদিন স্ত্রীকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু তার বদলে স্ত্রীর মরদেহ কাঁধে নিয়ে শ্মশানে যেতে হয়েছিল।
‘আমার প্রথম স্ত্রী বাচ্চা প্রসব করতে গিয়ে মারা যান। আমার পরের দিন ওকে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। আর সেদিন আমি ওর লাশ কাঁধে নিয়ে শ্মশানে যাই’—বলেছিলেন রাজপাল।

প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর সদ্যোজাত মেয়েকে বড় করার দায়িত্ব নেয় তাঁর পরিবার। মা ও শ্যালিকার অবদানের কথা বিভিন্ন সময়ে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলেছেন অভিনেতা। জীবনের এত বড় আঘাতের পরও থেমে থাকেননি। অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে গেছেন।

রাজপাল যাদব। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

জীবনে এলেন রাধা
২০০৩ সালে রাধা যাদবকে বিয়ে করেন রাজপাল। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিজের জীবনের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবেই বর্ণনা করেছেন তিনি। রাজপালের প্রথম পক্ষের মেয়েকেও নিজের সন্তানের মতোই গ্রহণ করেন রাধা।

এক সাক্ষাৎকারে স্ত্রীকে নিয়ে রাজপাল বলেছিলেন, ‘আমার গুরুর পর আমার মা–বাবা, আর তারপর ও আমাকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন করেছে। ১০০ শতাংশ।’
ব্যক্তিজীবন নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তখন পেশাজীবনেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। বলিউডে কমেডির পরিচিত মুখ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পর নিজের সিনেমা নির্মাণের স্বপ্নই তাঁকে এমন এক আর্থিক জটিলতার দিকে ঠেলে দেয়, যার রেশ ১৬ বছর পরও কাটেনি।

কারাগার আর আদালতের লড়াইয়ের মধ্যেই এবার সামনে এসেছে নতুন বিপদ। গতকাল ৬ আগস্ট প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রাজপাল যাদবের উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে থাকা পৈতৃক সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাঁর কুন্দ্রা গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে ব্যাংকের নোটিশও টাঙানো হয়েছে।ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, বকেয়ার পরিমাণ ১৬ কোটি ৬১ লাখ রুপির বেশি। ঋণের নথিতে রাজপালের স্ত্রী রাধা যাদব ও মা গোদাবরী দেবীর নামও রয়েছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনলাইন নিলামের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

একটি সিনেমা, পাঁচ কোটি রুপি ঋণ
২০১০ সালে নিজের পরিচালনায় ‘আতা পাতা লাপাতা’ নির্মাণের উদ্যোগ নেন রাজপাল। ছবিটির জন্য দিল্লিভিত্তিক মুরলি প্রজেক্টস প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে পাঁচ কোটি রুপি ঋণ নেন। ২০১২ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। কিন্তু বক্স অফিসে প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। এখান থেকেই শুরু আর্থিক সংকট।

ঋণ পরিশোধ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। পাওনাদার প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া একাধিক চেক বাউন্স করে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এরপর বছরের পর বছর ধরে মামলা, অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি, সময় চাওয়া—সব মিলিয়ে যে সিনেমা ছিল রাজপালের স্বপ্ন, সেটিই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের দীর্ঘতম দুঃস্বপ্নগুলোর একটি।

রাজপাল যাদব। অভিনেতার ইনস্টাগ্রাম থেকে

প্রথমবার নয় জেল
রাজপালের কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও নতুন নয়। ২০১৮ সালে ঋণসংক্রান্ত মামলায় তাঁকে তিন মাস কারাগারে থাকতে হয়েছিল। সেই জেলজীবন নিয়েও পরে কথা বলেছেন অভিনেতা। তাঁর দাবি, কারাগারে থাকার সময়ও তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেননি। বরং বন্দীদের সঙ্গে মিশেছেন, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকেছেন। জেল থেকে বের হওয়ার সময় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া প্রশংসার কথাও তিনি সাক্ষাৎকারে স্মরণ করেছেন।
কিন্তু সেখানেই আইনি জটিলতার শেষ হয়নি।

২০২৬ সালে আবার তিহার
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুরোনো চেক বাউন্স মামলাতেই আবার তিহার কারাগারে আত্মসমর্পণ করতে হয় রাজপালকে। আদালতকে দেওয়া অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর আত্মসমর্পণের সময় বাড়াতে রাজি হয়নি। ৫ ফেব্রুয়ারি তিহার জেলে যান তিনি। পরে দেড় কোটি রুপি জমা দেওয়ার পর অন্তর্বর্তী জামিনে মুক্তি পেয়েছিলেন।

কিন্তু আইনি লড়াই চলতেই থাকে
গত ১০ জুলাই দিল্লি হাইকোর্ট সাতটি চেক বাউন্স মামলায় রাজপালের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বহাল রাখেন। আদালত প্রতিটি মামলায় তিন মাস করে সাধারণ কারাদণ্ড দিলেও সব সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি প্রতিটি মামলায় ১ কোটি ৫ লাখ রুপি করে অর্থদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়। আগে জমা দেওয়া ২ কোটি ২৫ লাখ রুপি চূড়ান্ত দায় থেকে সমন্বয় করার কথাও আদালত বলেছেন।
আদালত তাঁর বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরণ না করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। দিল্লি হাইকোর্ট তাঁর আচরণ নিয়েও কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন।

অভিনেতা রাজপাল যাদবের তিন মাসের কারাদণ্ড

এবার পৈতৃক সম্পত্তিও নিলামের মুখে
কারাগার আর আদালতের লড়াইয়ের মধ্যেই এবার সামনে এসেছে নতুন বিপদ। গতকাল ৬ আগস্ট প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইন্ডিয়া রাজপাল যাদবের উত্তর প্রদেশের শাহজাহানপুরে থাকা পৈতৃক সম্পত্তি নিলামে তোলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাঁর কুন্দ্রা গ্রামের পৈতৃক বাড়িতে ব্যাংকের নোটিশও টাঙানো হয়েছে।
ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, বকেয়ার পরিমাণ ১৬ কোটি ৬১ লাখ রুপির বেশি। ঋণের নথিতে রাজপালের স্ত্রী রাধা যাদব ও মা গোদাবরী দেবীর নামও রয়েছে। আগামী ৯ সেপ্টেম্বর অনলাইন নিলামের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাসির মানুষের কঠিন জীবন
রাজপাল যাদবের গল্পটা তাই কেবল একজন সফল কৌতুক অভিনেতার গল্প নয়। এতে আছে খুব অল্প বয়সে প্রিয়জন হারানোর শোক, ছোট শহর থেকে মুম্বাইয়ে এসে নিজের জায়গা করে নেওয়ার সংগ্রাম, সাফল্য, নিজের সিনেমা বানানোর স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নের আর্থিক মূল্য।

কয়েক দশক ধরে যাঁর কাজ দর্শককে দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে হাসিয়েছে, তাঁর নিজের জীবনেই বারবার ফিরে এসেছে কঠিন বাস্তবতা। স্ত্রীকে হারানোর শোক পেরিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন, অভিনয়ে নিজের জায়গাও তৈরি করেছেন। কিন্তু একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য নেওয়া ঋণের জটিলতা এত বছর পরও তাঁকে ছাড়েনি।

পর্দায় রাজপাল যাদবের চরিত্রগুলো প্রায়ই বিপদে পড়ে, হোঁচট খায়, অসহায় মুখে এমন কিছু করে বসে যে দর্শক হেসে ওঠেন। বাস্তবের রাজপালের বিপদ অবশ্য হাসির নয়। পুরোনো ঋণ ও চেক বাউন্সের মামলা তাঁকে আবারও নিয়ে গেছে কারাগারে। এর মধ্যেই সামনে এসেছে নতুন দুশ্চিন্তা—ঋণের টাকা আদায়ে তাঁর সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংক।

আগামী ৯ সেপ্টেম্বর সেই নিলামের দিন নির্ধারিত। অর্থাৎ ১৬ বছর আগে একটি সিনেমা নির্মাণের জন্য নেওয়া ঋণের যে জটিলতা শুরু হয়েছিল, তা এখনো পিছু ছাড়েনি রাজপাল যাদবের। বর্তমানে কারাগারে থাকা এই অভিনেতার সামনে তাই আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি বড় হয়ে উঠেছে কোটি কোটি রুপির দেনা এবং সম্পত্তি হারানোর আশঙ্কাও।

Read full story at source