কাদম্বরীর অভিসম্পাত ও...
· Prothom Alo

জন্মের দেড় শ বছরও পার হয়ে গেছে ২০১২–তে। তারপরও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়েই যত কথা, যত ভাবনা, যত কল্পচিত্র নব নব রূপে ছড়াচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে আর ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ নিজেকে, মানে নিজের যেকোনো গভীর অনুভূতিকে সুন্দর ও শৈল্পিকভাবে প্রকাশ করতে চাইলে যাঁর কাছে হাত পাতে, তিনি রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রপাঠ অন্তরকে একই সঙ্গে আনন্দ–বেদনার নিবিড় এক স্পর্শে জড়ায়, কান্না–হাসির গভীর এক দোলায় দুলিয়ে দেয়, দৃশ্যাতীত তরঙ্গ শিহরিত হয় সমগ্র আমিত্বে। ইংরেজ কবি উইলফ্রেড আওয়েন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন আর তাঁর বুকপকেটে রাখা নোটবইতে রবীন্দ্রনাথের কবিতার কবির নিজের অনূদিত লাইনগুলো লেখা ছিল—
Visit esporist.com for more information.
‘যাবার দিনে এই কথাটি
বলে যেন যাই
যা দেখেছি যা পেয়েছি
তুলনা তার নাই’
(হোয়েন আই গো ফ্রম হেন্স, লেট দিস বি মাই পার্টিং ওয়ার্ড দ্যাট হোয়াট আই হ্যাভ সিন ইজ আনসারপাসেবল)।
রবীন্দ্রনাথের ছন্দোবদ্ধ বাণীতে ছিল গাঁথা আওয়েনের সত্তার শেষ উচ্চারণ ।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
প্রায় শৈশবে মাকে হারিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর চেয়ে মাত্র বছর দুইয়ের বড় নিতান্তই বালিকা বউদি কাদম্বরীর স্নেহ-মমতা, সৌহার্দ্য-সখ্যের মধ্যে নির্ভর করার জায়গা খুঁজে পান। সময় গড়ায়। শৈশব-বাল্য-কৈশোর দুজনের একই সঙ্গে কাটে। কাটে বিদ্যাশিক্ষায়, কাটে ঠাকুরবাড়ির আবহের মানানসই পরিশীলিত রুচি ও গুণ অর্জনে ও তার বিকাশে। গান-নাটক-কবিতা ছিল ঠাকুরবাড়ির দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। অতি সাধারণ পরিবারের মেয়ে হয়েও কাদম্বরী ওই ঠাকুরবাড়িরই পরিচর্যায় ও নিজ প্রয়াসে কবিতার বোদ্ধা, নাটকের শিল্গী হয়ে ওঠেন। কবির উৎসাহী পাঠক, সমালোচক ও প্রেরণাদাত্রী ছিলেন বউদি কাদম্বরী। কাদম্বরী স্বামীর সখ্য, সোহাগ পাননি। বয়স-রুচি-বিদ্যা—সব বিষয়ে ছিল দুজনের মধ্যে বিস্তর তফাত। নিরলস চেষ্টায় রুচি–বিদ্যার ফারাক কমানো গেলেও ১৩ বছরের দূরত্ব কীভাবে কাটবে? স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রয়ে গেল দুস্তর ব্যবধান। সুদর্শন-গুণী-নাটক থেকে নটীর নিকেতন ইত্যাদি নানাকর্মে ব্যতিব্যস্ত রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ স্ত্রী কাদম্বরীর মনোবেদনার খবর জানতেন না বা রাখতেন না। কাদম্বরী দেবী বিদ্যা-গুণ-রুচিতে ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত বউ হয়ে উঠলেন, সাহিত্য-কবিতা সভার সমঝদার আয়োজক হলেন। কবি রবীন্দ্রনাথের সাহচর্য ছিল তাঁর শান্তি ও সান্ত্বনা। সাধারণ একজনের অসাধারণ হয়ে ওঠায় উচ্চ রুচিশীলদের চিত্তও দহন জ্বালায় জ্বলে। বিলেতফেরত বড় জা জ্ঞানদানন্দিনী কাদম্বরীর গুণপনার প্রশংসা দেখে কুপিত হলেন। কাদম্বরীকে অবহেলা ও কোণঠাসা করা হলো। সাহিত্যবাসর স্থান নিল জ্ঞানদানন্দিনীর বাড়ি। সবচেয়ে নিষ্ঠুরতম কাজটি ছিল, বাড়ির অন্দরমহলে কাদম্বরীকে বাঁজা বা নিঃসন্তান বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।
রবীন্দ্রনাথের বিয়ের তিন কি চার মাস পর নিঃসঙ্গ কাদম্বরীদেবী আত্মহত্যা করেন। রবীন্দ্রনাথ কি তখন ওই কবিতাটি লিখেছিলেন, ‘হৃদয়, হৃদয় মোর, সাধ কি যায় রে তোর/ ঘুমাইতে ওই মৃত তারাটির পাশে’। হয়তোবা।
কাদম্বরী দেবীর আত্মার অভিশাপ স্পর্শ করেছিল ঠাকুরবাড়িকে। জ্ঞানদানন্দিনী অন্দরমহলকে প্ররোচিত করেছেন কাদম্বরীর বন্ধত্বকে কটাক্ষ করে তাঁকে দগ্ধ করার। তারই পরিণতিতে বোধ হয় জ্ঞানদানন্দিনীর একমাত্র সন্তান অত্যন্ত গুণী–বিদুষী নারী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী কাদম্বরীর মতোই ছিলেন সন্তানহীনা।