দুঃখ কি মানসিক রোগ নাকি ইমানের পরীক্ষা

· Prothom Alo

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জীবনের যেকোনো সাধারণ ব্যর্থতা, দুঃখ-কষ্ট, বিচ্ছেদ কিংবা সামান্য মন খারাপকেও একটি বড় ধরনের মানসিক রোগ (ডিজঅর্ডার) হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

দুঃখকে বা জীবনের প্রতিকূলতাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার যে সহজাত প্রতিরোধ ক্ষমতা, মানুষ তা দিন দিন হারিয়ে ফেলছে এবং সামান্য আঘাতেই চিকিৎসকের চেম্বার বা থেরাপির দিকে ছুটছে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

প্রতিটি দুঃখকে রোগের মোড়কে দেখার বিপরীতে ইসলামি জীবনদর্শন মানুষকে ‘সবর’ ও ‘তাওয়াক্কুল’-এর মাধ্যমে এক অনন্য ও ইস্পাতকঠিন মানসিক শক্তি (রেজিলিয়েন্স) গড়ে তোলার তাগিদ দেয়।

দুঃখ কোনো রোগ নয়

ইসলাম মানুষকে একটি অবাস্তব ও কল্পিত সুখের দুনিয়ায় বাস করতে শেখায় না। ইসলাম শুরুতেই স্পষ্ট করে দেয় যে এই পৃথিবী কোনো চিরস্থায়ী আনন্দের জায়গা নয়, বরং এটি মানুষের জন্য একটি পরীক্ষাগার। এখানে দুঃখ, কষ্ট, একাকিত্ব ও ক্ষতি আসবেই—এটিই জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম।

কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব; আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।’

কোরআনে আল্লাহ–তাআলা মানুষের জীবনের এই বাস্তবতাকে ঘোষণা করে বলেছেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব; আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)

এই সত্য মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে পারলে, জীবনের প্রতিটি কষ্টকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একটি সাময়িক পরীক্ষা বুঝলে, সামান্য মানসিক ধাক্কাতেই ভেঙে পড়ব না এবং একে ‘ক্লিনিক্যাল ট্রমা’ বা রোগ ভেবে হীনম্মন্যতা আসবে না।

ইসলাম দুঃখকে কোনো মনস্তাত্ত্বিক অভিশাপ হিসেবে দেখে না, বরং একে আত্মিক উন্নতির একটি সোপান মনে করে।

মানুষ ও পরিবেশের সম্পর্ক: ইসলাম যেভাবে মূল্যায়ন করে

‘সবর’ এক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ

আজকাল দেখা যায়, কীভাবে ব্যক্তি নিজের দুঃখের জন্য চারপাশের পরিবেশ, পরিবার বা অতীতকে দোষারোপ করে মজলুম (বা ভিকটিম) সাজেন। ইসলাম মানুষকে বলে ‘সবর’ করতে। সবর মানে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অটলতা।

শরিয়তের পরিভাষায় সবর মানে কেবল হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে নিজের ভেতরের মানসিক ভারসাম্য ধরে রাখা।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের ব্যাপারটি কতই না চমৎকার! তার প্রতিটি কাজেই কল্যাণ রয়েছে, আর এটি মুমিন ছাড়া অন্য কারও জন্য নয়। যদি তার কাছে কোনো সুখের দিন আসে, তবে সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে (শোকর করে), ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি তার ওপর কোনো দুঃখের দিন আসে, তবে সে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা–ও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)

কোরআন, সুরা তালাক, আয়াত: ৩আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।

ইসলামের এই মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থাপত্র মানুষের ভেতর এমন এক আত্মিক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে, যা কোনো আধুনিক কাউন্সেলিং সেশন দিতে পারে না। দুঃখের দিনে মুমিন ভেঙে পড়ে না। কারণ, সে জানে এই কষ্টের বিনিময়ে তার পাপ মোচন হচ্ছে।

আল্লাহর ওপর ভরসা

আজকের তরুণদের মানসিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা (ওভারথিঙ্কিং) এবং জীবনের সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার এক অবাস্তব চেষ্টা।

যখনই কোনো পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, তখনই মানুষ চরম বিষাদে (ডিপ্রেশন) তলিয়ে যায়। ইসলাম এখানে এনেছে ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর ওপর চূড়ান্ত ভরসার ধারণা।

কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)

যে ১০ কারণে আত্মার মৃত্যু হয়

নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলাফলের ভার স্রষ্টার ওপর ছেড়ে দেওয়া এবং বিশ্বাস করা যে ‘আল্লাহ আমার জন্য যা ফয়সালা করেছেন, তা-ই আমার জন্য সর্বোত্তম’—এই মনস্তাত্ত্বিক আত্মসমর্পণ মানুষকে ডিপ্রেশনের ব্ল্যাকহোল থেকে রক্ষা করে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর ওপর সঠিক উপায়ে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের ঠিক সেভাবে রিজিক দিতেন যেভাবে পাখিদের দিয়ে থাকেন—যারা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হয় এবং সন্ধ্যায় তৃপ্ত হয়ে ফেরে।’ (সুনান তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৪)

জীবনের প্রতিটি স্বাভাবিক দুঃখ, একাকিত্ব বা ব্যর্থতাকেই ‘মানসিক রোগ’ বা ট্রমার তকমা দিয়ে নিজেকে দুর্বল ও পঙ্গু ভাবার হুজুগ থেকে আমাদের যুবসমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কষ্টের আড়ালে কল্যাণ

মানুষকে তাৎক্ষণিক সুখ বা ‘হ্যাপিনেস’ চায়। ফলে দ্রতু থেরাপির দিকে ছোটে। কিন্তু ইসলাম শেখায়, মাঝেমধ্যে মানুষের জন্য কষ্ট ও ক্ষতিই দীর্ঘ মেয়াদে সবচেয়ে বড় কল্যাণ বয়ে আনে, যা মানুষ তার সীমিত বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারে না।

কোরআনে এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর হতে পারে যে কোনো বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জানো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৬)

জীবনের ব্যর্থতা বা ট্রমাগুলোকে যখন কোনো মানুষ আল্লাহর নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তার মনের সব অস্থিরতা এক পরম শান্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে।

হ্যাঁ, গুরুতর মানসিক রোগ বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া শরিয়তসম্মত এবং জরুরি। কিন্তু জীবনের প্রতিটি স্বাভাবিক দুঃখ, একাকিত্ব বা ব্যর্থতাকেই ‘মানসিক রোগ’ বা ট্রমার তকমা দিয়ে নিজেকে দুর্বল ও পঙ্গু ভাবার হুজুগ থেকে আমাদের যুবসমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে।

জীবন মানেই পরীক্ষা, আর পরীক্ষার হল কখনোই আরামদায়ক হয় না। লোকদেখানো সংস্কৃতির আধুনিক ফাঁদ এড়িয়ে ইমান, সবর ও তাওয়াক্কুলের আধ্যাত্মিক শক্তিকে হৃদয়ে ধারণ করার মাধ্যমেই কেবল মানুষ যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক বিজয় লাভ করতে পারে।

মুমিনের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনে যে ৬ অভ্যাস

Read full story at source