মঙ্গল গ্রহে কি ড্রোন ওড়ানো সম্ভব

· Prothom Alo

খেলনা ড্রোন ওড়াতে কি তুমি ভালোবাসো? রিমোটের বোতাম চাপলেই শোঁ করে আকাশে উড়ে যায় ছোট্ট এই যন্ত্রটি। কিন্তু পৃথিবীর বদলে এই ড্রোনটিকে যদি আমরা মঙ্গল গ্রহে নিয়ে যাই, তবে কী ঘটবে? লাল গ্রহের আকাশে কি ড্রোন ওড়ানো সম্ভব?

Visit h-doctor.club for more information.

বিজ্ঞান বলছে, তাত্ত্বিকভাবে মঙ্গল গ্রহে ড্রোন ওড়ানো অবশ্যই সম্ভব। তবে এই কাজটা পৃথিবীতে ড্রোন ওড়ানোর মতো এত সহজ নয়। এর পেছনে বেশ বড় কিছু চ্যালেঞ্জ লুকিয়ে আছে। কী সেই চ্যালেঞ্জ?

এই প্রশ্নের উত্তর বুঝতে হলে জানতে হবে, পৃথিবীতে একটি ড্রোন কীভাবে আকাশে ভেসে থাকে। ড্রোনের পাখাগুলো যখন ঘোরে, তখন তারা বাতাসকে প্রচণ্ড বেগে নিচের দিকে ধাক্কা দেয়। ফলে উল্টো দিকে অর্থাৎ ওপরের দিকে একটি ধাক্কা তৈরি হয়। এই ঊর্ধ্বমুখী ধাক্কা যখন পৃথিবীর মহাকর্ষ বলকে হার মানাতে পারে, ঠিক তখনই ড্রোনটি আকাশে ভেসে ওঠে।

মঙ্গলে ড্রোন ওড়ানোর ব্যাপারে একটা ভালো খবর আছে, আবার একটা খুব খারাপ খবরও আছে। ভালো খবরটা হলো, মঙ্গল গ্রহের অভিকর্ষ টান পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম, প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ! অর্থাৎ পৃথিবীতে যে ড্রোনের ওজন তিন কেজি, মঙ্গলে তার ওজন হবে মাত্র এক কেজি। ফলে ড্রোনের পাখাগুলোকে অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য খুব বেশি কষ্ট করতে হবে না।

মঙ্গল অভিযানের জন্য পৃথিবীর আদলে বানানো এক্সপেরিমেন্ট কেন ব্যর্থ হয়েছিল

কিন্তু খারাপ খবরটা বেশ ভয়ানক। মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর মতো এত ঘন নয়। এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ পাতলা! অর্থাৎ মঙ্গলের বাতাসে ড্রোনের পাখা ধাক্কা দেওয়ার মতো যথেষ্ট বাতাসই খুঁজে পাবে না। এত পাতলা বাতাসে সাধারণ ড্রোন কিছুতেই থ্রাস্ট তৈরি করতে পারবে না।

মঙ্গল গ্রহ

তাহলে উপায়? মঙ্গলের এই পাতলা বাতাসে ড্রোন ওড়াতে হলে ড্রোনের পাখাগুলোকে এমনভাবে বানাতে হবে, যেন তারা খুব কম বাতাসকেও দারুণভাবে কাজে লাগাতে পারে। এর জন্য পাখার আকার বড় করতে হবে, পাখার সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং এদের ঘোরার গতি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু পাখার সংখ্যা ও দৈর্ঘ্য দ্বিগুণ করে দিলে ড্রোনটি অনেক ভারী ও বিশালাকার হয়ে যাবে, যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো শক্তির জোগান বা ব্যাটারি চার্জ করা। মঙ্গলে সূর্য থেকে পৃথিবীর তুলনায় অর্ধেকের কম আলো পৌঁছায়। তাই সোলার প্যানেল দিয়ে ড্রোনের ব্যাটারি চার্জ করা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

বিজ্ঞানীরা একসময় ভাবতেন, মঙ্গলে হয়তো ছোটখাটো বেলুন-জাতীয় কিছু ওড়ানো বেশি সুবিধাজনক হবে। কিন্তু মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এই অসম্ভবকে সম্ভব করে দেখিয়েছে! তারা মঙ্গলের জন্য বিশেষ একটি ড্রোন তৈরি করেছে, যার নাম ইনজেনুইটি।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসার পারসিভিয়ারেন্স রোভারে চড়ে এই ছোট্ট ড্রোনটি মঙ্গলে পৌঁছায়। এরপর ২০২১ সালের ১৯ এপ্রিল এটি প্রথমবারের মতো মঙ্গলের আকাশে উড়ে ইতিহাস তৈরি করে!

কিন্তু ইনজেনুইটি কীভাবে মঙ্গলে উড়ল? নাসার বিজ্ঞানীরা ইনজেনুইটি ড্রোনটিকে মঙ্গলের পাতলা বাতাসের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করেছিলেন। পৃথিবীতে এর ওজন মাত্র ১.৮ কেজি, যা মঙ্গলের কম গ্র্যাভিটির কারণে মাত্র ৬৮০ গ্রামের মতো মনে হয়।

মঙ্গল গ্রহের দুটি চাঁদ কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে

এই ড্রোনের দুটি বড় বড় পাখা আছে, যেগুলো কার্বন ফাইবার দিয়ে তৈরি এবং একেকটি প্রায় ৪ ফুট লম্বা। পৃথিবীতে সাধারণ হেলিকপ্টারের পাখা মিনিটে ৪০০ থেকে ৫০০ বার ঘোরে। কিন্তু মঙ্গলের পাতলা বাতাসে ওড়ার জন্য ইনজেনুইটির পাখাগুলো বিপরীত দিকে মিনিটে প্রায় ২৪০০ থেকে ২৮০০ বার ঘোরে! এই প্রচণ্ড গতির কারণেই এটি মঙ্গলের আকাশে উড়তে পেরেছিল।

মঙ্গল গ্রহে নাসার পাঠানো হেলিকপ্টার ইনজেনুইটি

মঙ্গলে রাতের বেলা তাপমাত্রা মাইনাস ৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় ড্রোনের যন্ত্রপাতি যেন জমে নষ্ট না হয়, সে জন্য ইনজেনুইটি তার ব্যাটারির একটা বড় অংশ শুধু নিজেকে গরম রাখতেই খরচ করত। আর পৃথিবী থেকে মঙ্গলে রেডিও সংকেত যেতে কয়েক মিনিট সময় লাগে। তাই এই ড্রোনটিকে রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে ওড়ানো সম্ভব ছিল না। এটিকে এমনভাবে প্রোগ্রাম করা হয়েছিল যে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজেই নিজের রাস্তা চিনে উড়তে পারত!

ইনজেনুইটিকে মূলত মাত্র পাঁচবার ওড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল নাসা। কিন্তু এটি এতই ভালো পারফর্ম করেছিল যে বিজ্ঞানীরা এটিকে ৭২ বার উড়িয়েছিলেন! এটি মঙ্গলের আকাশে সর্বোচ্চ প্রায় ৭৯ ফুট ওপরে উঠতে পেরেছিল। সৌরশক্তি ব্যবহার করে এর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি চার্জ হতো। দীর্ঘ তিন বছর মঙ্গলের আকাশে কাটানোর পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে পাখা ভেঙে যাওয়ায় এর ঐতিহাসিক মিশন শেষ হয়।

অর্থাৎ মঙ্গলে ড্রোন ওড়ানো কেবল সম্ভবই নয়, মানুষ ইতিমধ্যে সেই অসাধ্য সাধন করেও ফেলেছে! বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জাদুতে মহাকাশ গবেষণায় এটি একটি বিশাল মাইলফলক।

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস এবং নাসামঙ্গল গ্রহের অজানা ৭

Read full story at source