হজ ২০২৬: আত্মশুদ্ধির পথে অনন্য যাত্রা, বিহাইন্ড দ্য সিনস: শেষ পর্ব

· Prothom Alo

হজ একটি অনন্য ইবাদত, যা সবার ওপর ফরজ করা হয়নি, শুধু আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম ব্যক্তির ওপর ফরজ করা হয়েছে। আমরা যখন সক্ষম থাকি, তখন ব্যস্ততা বা অন্য কোনো অজুহাত দেখিয়ে শয়তান আমাদের বাধা দেয়। বৃদ্ধ বয়সে যখন মনে হয় যাওয়া দরকার, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়, শরীর আর সেভাবে সক্ষম থাকে না। অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের হজের খরচ (বিমানভাড়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয়) মাত্রাতিরিক্ত। বাংলাদেশের হাজিদের মধ্যে তাই তরুণদের সংখ্যা অনেক কম।

আমার এই ধারাবাহিক লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল সবার মধ্যে এই প্রণোদনা তৈরি করা, যাতে সুস্থ ও সক্ষম থাকতেই আমরা হজব্রত যথাযথভাবে পালন করতে পারি। নইলে হয়তো শুধু যাওয়া হবে, দেখা হবে, শপিং হবে, হজ হবে না।

Visit moryak.biz for more information.

জামারাত ভ্রমণ

হজের আনুষ্ঠানিকতার ওয়াজিব হলো শয়তানকে তিন দিন পাথর মারা। জামারাতে তৃতীয় দিনের মতো পাথর মারার কার্যক্রমটি একটু অন্য রকম ছিল আমাদের জন্য। জুমার নামাজ মসজিদুল হারাম–এর বাইরে রাস্তায় পড়তে হলো স্থানাভাবে। লাঞ্চ সেরে আমরা বাসে উঠে শুরুতে চলে গেলাম মুজদালিফা। সেখান থেকে সৌদি মেট্রোরেলে চড়ে আমাদের বিশাল কাফেলা (প্রায় ২০০ জন) চলল মিনা–৩ স্টেশনে। রেল ভ্রমণে বাড়তি আনন্দ যোগ হলো উঁচু থেকে মিনার ময়দানে সারি সারি তাঁবু আর পেছনে বাদামি রঙের পাহাড়ের পটভূমি।

হজ ২০২৬: আত্মশুদ্ধির পথে অনন্য যাত্রা, বিহাইন্ড দ্য সিনস: মক্কা পর্ব-৩

ফরজ তাওয়াফ ও বিদায়ী তাওয়াফ

সেই রাতেই আমরা ফরজ তাওয়াফ ও সাঈ (সাফা–মারওয়া) সম্পন্ন করলাম। কাবা শরিফ এলাকায় এর আগের দুই দিন প্রচণ্ড ভিড় ছিল, আমরা একটু কম ভিড় পেলাম সেই রাতে।

এর পরদিন আবার গেলাম আল্লাহর ঘরের কাছে, শেষবারের মতো। এবার বুক ভেঙে কান্না এল। আবার কি আসতে পারব? তেমন কিছুই তো করতে পারলাম না। আল্লাহর ঘরের দরজা ছুঁয়ে কাঁদতে লাগলেন কিছু হাজি, কেউ কেউ হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার জন্য হুড়োহুড়ি করতে লাগলেন। কাবা শরিফের দেয়ালে এক অনন্য আতর মাখানো থাকে, মসৃণ আর শীতল সে পাথরের দেয়াল, কিন্তু নিষ্প্রাণ নয়। অনেকেই সেই দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে প্রার্থনা ও কান্নায় মগ্ন। মুঠোফোনে ভিডিও কল করে কেউ কেউ ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত করছেন তাঁর প্রিয়জনকে। এ এক অনন্যসাধারণ দৃশ্য! তার পাশে নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশেরা ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত।

আমি অতীতে অনেক মানুষকে দেখে অবাক হয়েছি, যাঁরা বারবার ওমরাহ বা হজ করেছেন। এখানে এসে কারণটা বোঝলাম। আসলেই তৃষ্ণা মেটে না। বিশেষ করে বিদায়ের দিন মনে হয়, আবার কি আসতে পারব?

এখানে আমরা শুধু নিজেদের জন্য দোয়া করি না, আপনজনদের জন্য, আত্মীয়, বন্ধু, সহকর্মী, প্রতিবেশী, বন্ধু—সব শুভার্থীর কল্যাণ ও ক্ষমা প্রার্থনা করি পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে।

আমি অতীতে অনেক মানুষকে দেখে অবাক হয়েছি, যাঁরা বারবার ওমরাহ বা হজ করেছেন। এখানে এসে কারণটা বোঝলাম। আসলেই তৃষ্ণা মেটে না। বিশেষ করে বিদায়ের দিন মনে হয়, আবার কি আসতে পারব?

আমাদের বিদায়ী তাওয়াফ সফলভাবে শেষ হলো ১৩ জিলহজ মধ্যরাতে। আমার অন্য কয়েকবারের তুলনায় এবারের অভিজ্ঞতা অপ্রীতিকর। কারণ, আল্লাহর ঘরের সামনে মানুষের ধাক্কাধাক্কি ও অশান্তির পরিবেশ। ভালো লাগেনি মাতাফে (কাবা–সংলগ্ন মার্বেল পাথরের মেঝে)–তে জুসের প্যাকেট, স্যান্ডেল, ভুট্টা ইত্যাদি। ভালো লাগেনি পুরুষদের পায়ের ও হাতের চাপে নারীদের ব্যথা পাওয়া। ভালো লাগেনি হাজরে আসওয়াদ ও কাবার স্বর্ণনির্মিত দরজার সামনে দাঁড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা। জানি না কাল কিয়ামতের ময়দানে একই দৃশ্যের অবতারণা হবে কি না, যেখানে সবাই শুধু নিজেরটা বুঝে নিতে মরিয়া থাকবে।

আত্মশুদ্ধির পথে অনন্য এক যাত্রা: মক্কা পর্ব-২মেট্রোরেল স্টেশনে অপেক্ষা

হজ এজেন্সির সূক্ষ্ম প্রতারণা

এখানে হজ এজেন্সিগুলোর কিছু ভূমিকা আমার ও আমার সহযাত্রীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ এবং একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে আমি প্রায় একই ফিডব্যাক পেয়েছি। এটি বিশেষ কোনো এজেন্সির বিষয়ে নয়; বরং এটিই সাধারণ চিত্র। প্রথমত, হজ এজেন্সি রেজিস্ট্রেশনের সময় যে প্যাকেজ ঘোষণা করে, তা স্পষ্ট নয়। ফলে অনেকেই বিভ্রান্ত হন। কেউ থাকার জায়গা পান হারাম শরিফ থেকে দূরে (যা আগে জানানো হয়নি), কেউবা সময়মতো খাবার পান না। খাবারের মান ও পরিমাণ নিয়ে তো অভিযোগ বিস্তর। অনেক এজেন্সি নাকি দম (ভুলের কাফফারা হিসেবে কোরবানি)–এর টাকা অগ্রিম নিয়ে রাখে। জানি না এগুলো দেখার দায়িত্ব যাদের, তারা কীভাবে উদাসীন থাকে।

আত্মার শুদ্ধতার পথে অনন্য এক যাত্রা: মক্কা পর্ব-১

আমাদের এজেন্সি খাবার ও হোটেলের বিষয়ে যথেষ্ট ভালো সেবা দিয়েছে। বাসগুলো ছিল বিশ্বমানের। কিন্তু অবাক লাগল, যখন দেখলাম ছয় লাখের প্যাকেজ আর ১০ লাখের প্যাকেজ কেনা হাজিরা একই তাঁবুতে পাশাপাশি ঘুমাচ্ছেন, একই ওয়াশরুমের লাইনে ধাক্কাধাক্কি করছেন, একই বাসে সিটে বসা নিয়ে প্রতিযোগিতা করছেন। অনেকেই বলবেন, এতে সমস্যা কোথায়? ইসলাম তো সাম্যের ধর্ম। সেটা নিয়ে তর্ক করব না। কিন্তু মানুষের অভিরুচি, আচরণ, পরিচ্ছন্নতা, পোশাক ও সহনশীলতা—এসব তো প্রত্যেক মানুষের আর্থসামাজিক পটভূমি অনুযায়ী হয়। মিশ্র পটভূমিতে এত মানুষ একত্রে বাস করতে গেলে দ্বন্দ্ব হয়, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এটা প্রকট। অবশ্য দ্বন্দ্ব পরিহার করে চলা ও সহনশীলতার চর্চা হজের অন্যতম শিক্ষা, সেটা ভুলে গেলে চলবে না।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

এবার একটু পেছনে যাই। হজের প্রশিক্ষণের সময় আমাদের এজেন্সি থেকে বারবার একটা কথা বলা হয়েছিল। আমরা যেন কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করি। অত্যন্ত ভালো পরামর্শ। কিন্তু হাজিদের রীতিমতো মগজ ধোলাই করা হয় একটা কথা বারবার বলে, সেটা হলো ‘এটা করলে আপনার হজ হবে না।’ অধিকাংশ হাজিরা তাই মুখে কুলুপ আঁটেন, ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করেন। আর আমাদের হজ এজেন্সিগুলোর চাতুর্য ও সূক্ষ্ম প্রতারণা নতুন নতুন মাত্রা পায়। আল্লাহর মেহমানরা তাদের কাছে যেন শুধুই ক্রেতা বা টাকার উৎস। খাবার কম দিয়ে, সস্তা হোটেলে রেখে, যাতায়াতের ব্যবস্থা ঠিকঠাক না করে তারা হাজিদের অযথা পেরেশানির মধ্যে রাখে, আর বলতে থাকে, এই পেরেশানি মেনে নেওয়াই নাকি হজ।

আত্মার শুদ্ধতার পথে অনন্য এক যাত্রা: হজের মদিনা পর্ববিদায়ী তাওয়াফ শেষে সস্ত্রীক দোয়া প্রার্থনা

এবার আসি সর্বোচ্চ পেরেশানির প্রসঙ্গে। আমরা চট্টগ্রামভিত্তিক বিখ্যাত একটি এজেন্সির মাধ্যমে ২৪ জনের কাফেলা হজে এসেছিলাম ১৮ দিনের প্যাকেজে। এ প্যাকেজটি পরিষ্কারভাবে ডিফাইন করা ছিল না। ‘পরে জানানো হবে’ বলে বারবার আমাদের ইমানের পরীক্ষা নিয়েছে তারা। ঢাকায় ফেরার টিকিট ঢাকায় বসে দেওয়া হয়নি। মানে, টিকিট বুকিং ঠিকঠাক হয়নি। টিকিট হাতে পেয়েছি মদিনায় বসে, শুরু থেকেই যা নিয়ে ছিল লুকোচুরি। টিকিটে দেখি জনপ্রতি লাগেজের ওজন ২০ কেজি পর্যন্ত বরাদ্দ। অথচ হাজিরা ৪৬ কেজি পর্যন্ত পান। বলা হলো, ৩৫ কেজির ব্যবস্থা করা হবে। সেটা মাথায় রেখে সবাই কেনাকাটা, খেজুর ও জমজমের পানি বহন করেছি। এয়ারপোর্টে লাগেজ দিতে গিয়ে আমাদের কাফেলা আটকে গেল। মোয়াল্লেম সাহেব সবার পাসপোর্ট নিয়ে একত্র করলেন, তার কারণ ব্যাখ্যা করলেন না। পরে বোঝা গেল, বেছে বেছে কয়েকজনের নামে ২০ কেজির ওপর ১৫ কেজির বুকিং দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁরা চেয়েছিলেন, ওই কয়েকজনের সঙ্গে অন্যদের দু–একটা লাগেজ যোগ করে দেবেন। কিন্তু বেসরকারি এয়ারলাইনসের সফটওয়্যার সেটি প্রদর্শন করছে না। তাই ২০ কেজির বেশি ওজন নিতে চাইলে বাড়তি টাকা দিতে হবে প্রত্যেক যাত্রীকে। এ সমস্যার সমাধান করতে কয়েক ঘণ্টা লাগল। সেই কয়েক ঘণ্টা ছিল আমাদের গোটা সফরের সবচেয়ে মানসিক চাপের সময়। অনেকেই ক্রেডিট কার্ড দিয়ে পরিশোধ করলেন, অনেকে ব্যাগ থেকে বের করে ফেললেন পকেটের টাকায় কেনা উপহার বা খাবার।

বিমানের বাস (ছবি: সংগৃহীত)

এই পেরেশানি আমাদের প্রাপ্য ছিল না। হজ এজেন্সির উচিত ছিল শুরু থেকেই বিষয়টি সুরাহা করা এবং আসল ঘটনা ব্যাখ্যা করে আমাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া। আল্লাহর মেহমানদের এভাবে প্রতারিত করা কত বড় গুনাহের কাজ, তারা বোধ হয় সেটা উপলব্ধি করার পর্যায়ে নেই।

তবু আল্লাহর দরবারে অশেষ কৃতজ্ঞতা, বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে আমরা পড়িনি, যা অনেক কাফেলার সঙ্গেই ঘটে থাকে।

সমাপ্তি

অবশেষে বড় কোনো হতাহতের ঘটনা ছাড়া আমরা ঢাকায় অবতরণ করলাম। শেষ হলো হজের সব আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু এটাই তো শেষ নয়, এটা আসলে নতুন এক শুরু। দেশে ফিরে গিয়ে যদি পুরোনো আমিত্বে ফিরে যাই, তাহলে সবই বৃথা। আর যদি নতুন আমাকে খুঁজে পাই, যার ভেতরে ও বাইরে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন, তাহলেই দুনিয়া ও আখিরাতে মিলবে সত্যিকারের হাসানাহ। সবার কাছে সেই দোয়া চাই।

Read full story at source