মা কি এখনো আমায় খোঁজেন

· Prothom Alo

যেখানে রোগী ছাড়া আর কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না, গেটের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। মা তত দিনে যন্ত্রণায় ঠিকমতো কথা বলার শক্তিও হারিয়েছেন।

মাকে ছাড়া এই প্রথমবার মা দিবস। আমার পৃথিবীটা মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। গত বছর এই সময়ে মা আমাদের মাঝেই ছিলেন। তখন আমরা লড়াই করছিলাম ওনাকে ধরে রাখার জন্য। তিনি যে মৃত্যুর এত কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন, সেটা টের পাইনি। শারীরিকভাবে স্থিতিশীল মাকে চিকিৎসার জন্য ট্রেনে নিয়ে গিয়েছিলাম; আর ঠিক দুই মাস সাত দিন পর যখন ফিরলাম, মা ফিরলেন এক নিথর দেহ হয়ে, লাশবাহী গাড়িতে।

সেই দুই মাসে মায়ের অবর্ণনীয় কষ্ট আর পৃথিবীর সব অসহায়ত্ব দেখেছি। একজন প্রাণশক্তিতে ভরপুর মানুষ কীভাবে এত অল্প সময়ে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন! হাসপাতালে প্রতিদিন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার পর মনে হতো মন-মস্তিষ্ক আর সইতে পারছে না। মায়ের আড়ালে গিয়ে কখনো একা, কখনো–বা তিন ভাই–বোন মিলে কাঁদতাম।

Visit palladian.co.za for more information.

সেই নির্ঘুম রাতগুলোতে মায়ের পা জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতাম। মা ঘুমাতে পারতেন না, তবু সকালে উঠে কাঁদতেন আমার কষ্ট হচ্ছে ভেবে। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়েও তিনি আমার সামান্য কষ্টের কথা ভেবে বিচলিত হতেন। মা ছাড়া সন্তানের জন্য এভাবে আর কে কাঁদবে? যখন খাওয়ানোর চেষ্টা করতাম, বলতেন, ‘আগে তুমি খাও, নয়তো আমি খাব না।’

যেখানে রোগী ছাড়া আর কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না, গেটের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। মা তত দিনে যন্ত্রণায় ঠিকমতো কথা বলার শক্তিও হারিয়েছেন। তবু ডাক্তারদের অনুরোধ করতেন, ‘আমার মেয়েকে একটু আসতে দেন, ওকে একটু ডাকেন।’ সেই পরম মমতাময়ী মানুষটা আজ কত দূরে চলে গেছেন! মা কি এখনো আমায় খোঁজেন?

মায়ের সঙ্গে বই পড়া, একসঙ্গে অডিও বুক শোনা

মনে পড়ে, যখনই বাড়ি থেকে হোস্টেলে ফেরার সময় হতো, মায়ের জন্য বারবার দিন পাল্টাতে হতো। মা আকুল হয়ে বলতেন, ‘আর একটা দিন থাকো, আর দুটি দিন থেকে যাও।’ সেই মানুষটা আর আমাকে একটুখানি সময় ধরে রাখার আবদার করেন না। কত দিন হয়ে গেল মায়ের নম্বর থেকে আর কল আসে না। আমি জন্মান্তরের বাঁধন হারিয়ে ফেলেছি।

মা আমাদের পরম মমতায় পথ দেখিয়ে বড় করে মাঝপথে ফেলে শেষ গন্তব্যে চলে গেলেন। কত কথা জমে আছে, কত কথা বলা হলো না।

আমি আমার মায়ের শরীরের সেই পরিচিত গন্ধ মিস করি। তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর হাসিমাখা মুখ আর সাহস জোগানো প্রতিটি কথা কানে বাজে। তাঁর হাঁটাচলা, তাঁর অবয়ব—সবই এখন কেবলই স্মৃতি। আমি শুধু মাকেই হারাইনি, হারিয়েছি জীবনের শ্রেষ্ঠ বন্ধুকেও। মা শারীরিকভাবে নেই সত্য, কিন্তু আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে তিনি বেঁচে আছেন চিরকাল।

রাজশাহী

Read full story at source