লিওনেল আন্দ্রেস মেসি: একুশ বছরের নীল-সাদা গল্প

· Prothom Alo

বুয়েনস এইরেসের আকাশে তখনো আতশবাজির আলো। মনুমেন্টালের গ্যালারিতে হাজার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। নীল-সাদা পতাকাগুলো বাতাসে উড়ছে, কোথাও লেখা ‘Gracias, Leo’। কোথাও শুধু একটি সংখ্যা ‘১০’। আর সেই দশের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ, যাঁর চোখে জল। মাঠে তখনো তিনি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। কিন্তু সেই রাতের পর থেকে আর কোনো দিন তাঁকে এই জার্সিতে দেখা যাবে না।

তখন সবে শেষ হয়েছে আর্জেন্টিনা ও বেনিনের ম্যাচ। ৩-০ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা। একটি গোল করেছেন তিনি, করিয়েছেন আরও দুটি। ৩৯ বছর বয়সেও শেষবারের মতো তিনি মাঠটাকে নিজের মতো করে ছুঁয়ে গেলেন। কিন্তু শেষ বাঁশির পর তাঁর মুখের অভিব্যক্তিতে জয়ের উল্লাসের চেয়ে বিদায়ের ভারটাই ছিল বেশি।

Visit playerbros.org for more information.

কিছু জয় আসলে উদ্‌যাপনের জন্য আসে না। আসে শেষবারের মতো একটি দরজা বন্ধ করার আগে মানুষটিকে একটু হাসতে দেওয়ার জন্য। মেসির জন্য এই জয়টাও তেমন। শেষবারের মতো জাতীয় সংগীত। শেষবারের মতো নীল-সাদা জার্সি। শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার হয়ে বল পায়ে দৌড়। শেষবারের মতো গ্যালারি থেকে একসঙ্গে উঠে আসা সেই পরিচিত ডাক ‘মেসি! মেসি! মেসি!’
তারপর বাঁশি। তারপর নীরবতা। একুশ বছরের একটি গল্পের শেষ অধ্যায়।

২০০৫ সালের সেই ১৮ বছরের কিশোর থেকে ২০২৬-এর ৩৯ বছরের কিংবদন্তি—এই পথটুকু শুধু একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার ছিল না। ছিল একটি দেশের সঙ্গে একজন মানুষের দীর্ঘ, কঠিন, কখনো নিষ্ঠুর, কখনো অসম্ভব সুন্দর সম্পর্কের গল্প।

শৈশবে লিওনেল আন্দ্রেস মেসি

গল্প শুরু হয়েছিল আরও অনেক আগে
১৯৮৭ সালের ২৪ জুন। রোজারিও শহর। পৃথিবী তখনো জানত না, এই শহরের একটি সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ছোট্ট শিশুটি একদিন ফুটবল নামের খেলাটিকে নতুন করে সংজ্ঞা দেবে। শিশুটির নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ছোটবেলা থেকেই বল ছিল তাঁর সবচেয়ে কাছের বন্ধু। অন্য শিশুরা যখন মাঠে বলের পেছনে ছুটত, মেসি যেন বলের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর পা বলকে শুধু নিয়ন্ত্রণ করত না, তাঁকে নিজের ভাষায় কথা বলতে শেখাত।

কিন্তু জীবনের শুরুতেই একটি কঠিন সত্য সামনে এসে দাঁড়াল। মেসির শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ছিল। চিকিৎসা প্রয়োজন। এর জন্য অনেক অর্থ লাগবে। সেই অর্থের ভার তাঁর পরিবারের একার পক্ষে বহন করা সম্ভব ছিল না।

নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বয়সভিত্তিক দলে তাঁর খেলা ধীরে মানুষের চোখে পড়তে শুরু করল। ছোট শরীর, ছোট পা, কিন্তু বল পায়ে যেন অন্য এক পৃথিবী। তারপর এল সেই সিদ্ধান্ত। বার্সেলোনায় পাড়ি জমানোর। পরিবারকে পেছনে রেখে, পরিচিত শহর পেছনে রেখে, শৈশবের মাঠকে পেছনে রেখে কিশোর মেসি পাড়ি দিলেন স্পেনে। হয়তো সেদিন তিনি জানতেন না, এই যাত্রা একদিন তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে নিয়ে যাবে। হয়তো তাঁর পরিবারও জানত না, সেই ছোট্ট ছেলেটির বাঁ পায়ে ভবিষ্যৎ কতটা আলো লুকিয়ে রেখেছে।

২০০৫ সাল। নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ। ১৮ বছরের মেসি সেখানে ছয় গোল করলেন। ফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দুটি গোলও তাঁর। আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন। তিনি জিতলেন গোল্ডেন বল, গোল্ডেন বুট। এরপর আর তাঁকে আটকে রাখা গেল না। সিনিয়র জাতীয় দলের দরজা খুলে গেল। ১৭ আগস্ট ২০০৫, হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেক। মেসি মাঠে নামলেন। একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। কিন্তু সেই অধ্যায়ের প্রথম গল্প ছিল অদ্ভুত। মাত্র ৪৭ সেকেন্ড পর লাল কার্ড। কেউ জানত না, এই লাল কার্ড একদিন কী বিশাল গল্পের প্রথম চিহ্ন হয়ে থাকবে। কেউ জানত না, যে ছেলেটি সেদিন এত দ্রুত মাঠ ছাড়ল, সে একদিন আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচ খেলবে। ১২৬ গোল করবে। বিশ্বকাপ জিতবে। দুটি কোপা আমেরিকা জিতবে।

২০০৬-এ খেললেন প্রথম বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের মঞ্চে বিশ্ব প্রথমবারের মতো দেখল ঝাঁকড়া চুলের এক বিস্ময়বালককে।

২০০৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো মেসির পা পড়ল। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে নতুন এক গল্পের শুরু হয়েছে। মেক্সিকোর বিপক্ষেও তাঁর পায়ের ছোঁয়ায় বদলে গেল ম্যাচের গতি। কিন্তু সেই যাত্রা থামল জার্মানির কাছে টাইব্রেকারে। একটি তরুণ স্বপ্ন আবারও দাঁড়িয়ে রইল অপূর্ণতার সামনে।

পরের বছর, ২০০৭ কোপা আমেরিকা। আর্জেন্টিনা উঠল ফাইনালে। সামনে ব্রাজিল। কিন্তু শিরোপার শেষ দরজাটিও খুলল না। হারতে হলো।
তারপর ২০০৮। বেইজিং অলিম্পিক। এবার হাতে উঠল সোনা। যেন দীর্ঘ অপেক্ষার অন্ধকারে হঠাৎ একফালি আলো। তখন হয়তো মনে হয়েছিল, সামনে পড়ে আছে সাফল্যে মোড়া এক দীর্ঘ পথ। কিন্তু মেসির জন্য সেই পথ কখনোই এত সহজ ছিল না। সামনে ছিল আরও অনেক রাত, আরও অনেক অপেক্ষা, আরও অনেক অসমাপ্ত স্বপ্ন।

জাতীয় দলের হয়ে কঠিন পথ
বার্সেলোনায় তখন মেসির জয়জয়কার। এক ম্যাচে তিন গোল, আরেক ম্যাচে চার, একটার পর একটা রেকর্ড ভাঙছেন, প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে বল নিয়ে ছুটছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগ, লা লিগা, ব্যালন ডি’অর, ক্লাব ফুটবলে তাঁর সাফল্যের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছিল। পৃথিবী তাঁকে দেখতে শুরু করেছিল ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা হিসেবে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে গল্পটা যেন অন্য রকম। সেখানেই উঠতে শুরু করল প্রশ্ন—ক্লাবে মেসি এতটা সফল, দেশের হয়ে কেন নয়? প্রশ্নের পর প্রশ্ন।

সমালোচকেরা বলেছিল বার্সেলোনার মেসি আর জাতীয় দলের মেসি যেন দুই ভিন্ন মানুষ

একসময় সেই প্রশ্নই পরিণত হলো সমালোচনায়। কেউ বললেন, আর্জেন্টিনার জন্য মেসির আবেগ যথেষ্ট নয়। কেউ বললেন, বার্সেলোনার মেসি আর জাতীয় দলের মেসি যেন দুই ভিন্ন মানুষ। আবার অনেকেই তাঁকে দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করে দেখতে চাইলেন, সেই তুলনায় খুঁজতে লাগলেন তাঁর সীমাবদ্ধতা। কিন্তু মেসি থামেননি। সমালোচনার জবাব তিনি কথায় দেননি, দিয়েছেন মাঠে নেমে। প্রতিটি ম্যাচে, প্রতিটি ব্যর্থতার পর, প্রতিটি নতুন সুযোগে তিনি আবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তুলেছেন। কারণ, তাঁর কাছে এই জার্সি শুধু একটি দলের পরিচয় ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি দেশের প্রত্যাশা, একটি ইতিহাস এবং কোটি মানুষের আবেগ। যতবারই প্রশ্ন উঠেছে, মেসি ততবারই ফিরে এসেছেন মাঠে নীরবে, নিজের মতো করে।

২০১৪ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা ধীরে এগিয়ে চলেছে। সেই পথের কেন্দ্রবিন্দুতে মেসি। গোল করছেন, ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছেন, দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন একের পর এক ধাপ পেরিয়ে। শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন ফাইনালে। প্রতিপক্ষ জার্মানি। ভেন্যু মারাকানা। সামনে তখন শুধু একটি ম্যাচ, একটি জয়, একটি ট্রফি। মেসি তখন বিশ্বকাপ থেকে মাত্র ৯০ মিনিট দূরে। কিন্তু ফুটবল সব সময় মানুষের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত গল্পের শেষটা নিজের ইচ্ছেমতো লিখতে দেয় না। নির্ধারিত ৯০ মিনিট পেরিয়ে গেল। গোল হলো না। ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। তারপর ১১৩ মিনিটে মারিও গোটজের সেই গোল। মুহূর্তের মধ্যেই আর্জেন্টিনার স্বপ্ন যেন ভেঙে গেল। মেসি দাঁড়িয়ে রইলেন মাঠে। হাতে গোল্ডেন বল; কিন্তু নেই সেই বিশ্বকাপ ট্রফি, যার জন্য এত দূর এসেছিলেন। চারপাশে হতাশা, নীরবতা আর হারিয়ে যাওয়া একটি স্বপ্ন।

২০১৫–তে আবার একটি ফাইনাল, এক বছর পর কোপা আমেরিকা। চিলির বিপক্ষে ফাইনাল। ৯০ মিনিট। অতিরিক্ত সময়। গোল নেই। টাইব্রেকার। আর্জেন্টিনা হারল। মেসি তাকিয়ে রইলেন। একটি ট্রফি আবারও হাতছাড়া।

২০১৪ বিশ্বকাপে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও আক্ষেপ নিয়েই ফিরেছেন মেসি

তারপর ২০১৬। কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসর। আবার চিলি। আবার ফাইনাল। আবার টাইব্রেকার। এবার মেসির নিজের পেনাল্টিও জালে জড়াল না। সেই মুহূর্তটা ছিল ভয়াবহ। একজন মানুষকে পৃথিবীর সেরা বলা হচ্ছে, অথচ দেশের হয়ে একটি বড় শিরোপা জিততে পারছেন না। মেসি মাঠে বসে পড়লেন। চোখে পানি। হৃদয়ে পরাজয়ের ভার। তারপর বললেন জাতীয় দল থেকে অবসর নিচ্ছেন। কতটা ক্লান্ত হলে একজন মানুষ নিজের দেশের হয়ে খেলার স্বপ্নটাকেও বিদায় বলতে চান? কতটা কষ্ট পেলে একজন মানুষ ভাবেন, ‘হয়তো আমি আর পারছি না?’ সেদিন মেসি হয়তো ফুটবলকে হার মানাতে পারেননি। কিন্তু নিজের ভেতরের ক্লান্তিকে সামলাতেও পারেননি।

আর্জেন্টিনা মেসিকে ছেড়ে দেয়নি। সমর্থকেরা চেয়েছিল তিনি ফিরে আসুন। সতীর্থরা তাঁকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কাছের মানুষেরাও তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। যেন পুরো দেশ একসঙ্গে একজন মানুষকে বলছিল, ‘এখনো শেষ হয়ে যায়নি। আরেকবার চেষ্টা করো।’ মেসি শেষ পর্যন্ত ফিরে এলেন। আবার গায়ে তুললেন আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি। ফিরে দাঁড়ালেন সেই মাঠেই, যেখানে কয়েক দিন আগেও তাঁর চোখে ছিল পরাজয়ের ভার। আর সেই ফিরে আসার পর থেকেই বদলাতে শুরু করল গল্পটা। যে গল্প এত দিন বারবার থেমে যাচ্ছিল শিরোপার ঠিক আগে, সেটিই ধীরে এগিয়ে যেতে শুরু করল তার কাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে।

২০১৮ বিশ্বকাপেও মেসির পথ থামল শেষ ষোলোতে। ফ্রান্সের কাছে ৪–৩ গোলে হেরে বিদায় নিল আর্জেন্টিনা।
পরের বছর ২০১৯ কোপা আমেরিকাতেও এল হতাশা। ব্রাজিলের কাছে সেমিফাইনালে হেরে আবারও থামতে হলো তাঁকে। তবে এবার মেসির মধ্যে আগের সেই অস্থিরতা ছিল না। দীর্ঘ ব্যর্থতা তাঁকে যেন আরও ধৈর্যশীল করে তুলেছিল। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে পাওয়া যায় না। কিছু অপেক্ষার উত্তর সময়ই একদিন এনে দেয়।

কোপা আমেরিকা ট্রফিতে চুমু খাচ্ছেন লিওনেল মেসি

সেই অপেক্ষার অবসান হলো ২০২১ সালে। কোপা আমেরিকার ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। ভেন্যু সেই মারাকানা, যে মাঠে ২০১৪ সালে বিশ্বকাপের স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল। এবার সেই একই মাঠে অপেক্ষা করছিল অন্য এক রাত। আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করলেন আনহেল দি মারিয়া। স্কোরলাইন আর বদলাল না। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে আর্জেন্টিনা ১–০ গোলে জিতে গেল। মেসি মাটিতে বসে পড়লেন। তারপর একে একে সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন। কেউ তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন, কেউ তুলে নিলেন। কারও চোখে পানি, কারও মুখে উচ্ছ্বাস। আর মেসি, তিনি যেন কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়েই রইলেন। ২৮ বছরের অপেক্ষার পর আর্জেন্টিনা আবার কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন। আর মেসির হাতে উঠল জাতীয় দলের হয়ে তাঁর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা।

সেদিন শুধু একটি ফাইনাল জেতা হয়নি। বহু বছরের অপেক্ষা, ব্যর্থতা আর সমালোচনার পর মেসির গল্পে যেন প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণতার অধ্যায় যোগ হলো। তবে সেই সাফল্যের পরও তাঁর যাত্রা থামেনি। প্রায় এক বছর পর, ২০২২ সালের ১ জুন, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন ইতালির বিপক্ষে ফাইনালিসিমায় আবারও মাঠে নামল আর্জেন্টিনা। ওয়েম্বলির সেই ম্যাচে ৩–০ গোলে জিতল আর্জেন্টিনা। মেসি গোল না করলেও পুরো ম্যাচে ছিলেন দলের আক্রমণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এবং সতীর্থদের জন্য তৈরি করেছিলেন একের পর এক সুযোগ। কোপা আমেরিকার পর ফাইনালিসিমার এই জয় যেন আরও একটি বার্তা দিল—মেসির আন্তর্জাতিক সাফল্য আর কোনো একক মুহূর্তের ঘটনা নয়। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনি তখন নতুন এক অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছেন। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অধ্যায়টি তখনো বাকি।

২০২২ সালে বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে লিওনেল মেসি

২০২২ বিশ্বকাপে সাফল্য
২০২২ বিশ্বকাপ। শুরুটাই হলো অপ্রত্যাশিত এক ধাক্কায়। সৌদি আরবের কাছে ২–১ গোলে হেরে গেল আর্জেন্টিনা। আবার প্রশ্ন উঠল, আবারও শুরু হলো সংশয়। এত বছর পরও কি মেসির বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে? কিন্তু এবার তিনি আর থামলেন না। মেক্সিকোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল। পোল্যান্ডের বিপক্ষে নেতৃত্ব। এরপর অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া—একটির পর একটি ম্যাচ পেরিয়ে আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল ফাইনালে। প্রতিটি ম্যাচে মেসি যেন তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের আরেকটি অধ্যায় লিখে যাচ্ছিলেন। তারপর ফাইনাল। সামনে ফ্রান্স। ম্যাচটি যেন শুরু থেকেই উত্তেজনায় ভরা। আর্জেন্টিনার গোল, ফ্রান্সের প্রত্যাবর্তন, আবার আর্জেন্টিনার এগিয়ে যাওয়া, আবার সমতা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটেও মীমাংসা হলো না। অতিরিক্ত সময়েও নাটক চলল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে। তারপর আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। মেসি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

লুসাইলের আলোয় মেসির মুখে তখন যে হাসি, সেখানে শুধু জয়ের আনন্দ ছিল না। ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বস্তি। ছিল বহু বছরের ব্যর্থতার পর পাওয়া মুক্তি। ছিল এমন এক অনুভূতি, যার জন্য হয়তো এত দিনের সব কষ্টই সইতে হয়েছিল। ২০১৪ সালের মারাকানা, ২০১৫ সালের ফাইনাল, ২০১৬ সালের সেই টাইব্রেকার, চোখের পানি, জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা—সবকিছু যেন সেদিন অনেক দূরের স্মৃতি হয়ে গেল। বিশ্বকাপের ট্রফিটা হাতে নিয়ে মেসি শুধু একটি শিরোপা জিতলেন না। পূর্ণতা পেল তাঁর জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার একটি অধ্যায়। একজন ফুটবলার অবশেষে পেলেন তাঁর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ট্রফি। আর মেসির দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও সেদিন পূর্ণ হলো।

বিশ্বকাপ জয়ের পরও মেসির গল্প থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার মঞ্চে আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিলেন তিনি। ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতল আর্জেন্টিনা। মেসির হাতে উঠল আরও একটি আন্তর্জাতিক ট্রফি। একের পর এক সাফল্যে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার তখন পৌঁছে গেছে এক নতুন উচ্চতায়। এবার তিনি আর সেই মেসি নন, যাঁকে একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা না জেতার জন্য প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছিল। তিনি এখন সেই অধিনায়ক, যাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা ও বিশ্বকাপ—একটির পর একটি বড় শিরোপা জিতেছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করার পর মেসি

তারপর এল ২০২৬। আরেকটি বিশ্বকাপ। বয়স তখন ৩৯। শরীর আগের মতো নেই, দৌড়েও নেই আগের সেই গতি। কিন্তু বয়সের সঙ্গে একজন খেলোয়াড়ের গতি কমতে পারে, অভিজ্ঞতা আর প্রভাব কমে না। মেসিও আবার নামলেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। আর্জেন্টিনা একের পর এক ধাপ পেরিয়ে পৌঁছে গেল ফাইনালে। প্রতিপক্ষ স্পেন। নিউইয়র্ক–নিউজার্সির সেই রাত যেন একই মাঠে ফুটবলের অতীত ও ভবিষ্যৎকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। একদিকে ৩৯ বছরের মেসি, যাঁর ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় চলছে; অন্যদিকে ১৯ বছরের লামিনে ইয়ামাল, যাঁর সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ এক ভবিষ্যৎ। মনে হচ্ছিল, ফুটবল যেন একই রাতে একটি প্রজন্মকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি আরেকটি প্রজন্মকে স্বাগত জানাচ্ছে। কিন্তু সেই রাতে মেসির হাতে উঠল না দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের গোল স্পেনকে এগিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধান আর ঘোচাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। ১–০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ শেষ করতে হলো রানার্সআপ হয়ে।

মেসির শেষ বিশ্বকাপের শেষ দৃশ্য তাই হয়ে রইল একটি পরাজয়। তবে এই পরাজয় আর ২০১৪ সালের মতো ছিল না। এবার তাঁর হাতে ইতিমধ্যেই ছিল সেই বহুপ্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ। ছিল দুটি কোপা আমেরিকার শিরোপা, ছিল ফাইনালিসিমা, ছিল আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে একের পর এক সাফল্যের দীর্ঘ পথ। তাই ২০২৬-এর সেই হার মেসির গল্পকে অসম্পূর্ণ করে দিতে পারেনি। বরং মনে করিয়ে দিয়েছে একজন মানুষের জীবনে সবশেষে প্রতিটি ট্রফি জেতা জরুরি নয়। কখনো সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলো পূরণ হয়ে যাওয়ার পরও একটি পরাজয় থেকে যায়, শুধু গল্পের শেষ অধ্যায় হিসেবে। মেসির ক্ষেত্রেও তাই। বিশ্বকাপের ফাইনালে হারলেও তাঁর আন্তর্জাতিক গল্প তখন আর অপূর্ণ ছিল না। বহু বছরের অপেক্ষার পর তিনি যা চেয়েছিলেন, তার সবচেয়ে বড় অংশটুকু তিনি ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছেন।

শেষবার আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন মেসি

শেষবারের মতো নীল-সাদা
অবশেষে এল সেই দিন, ৬ অক্টোবর ২০২৬। বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ। সেদিন মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ এসেছিল একজন ফুটবলারকে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখতে। শেষবারের মতো ১০ নম্বর জার্সিটাকে নীল-সাদার রঙে দেখতে। মেসি যখন মাঠে প্রবেশ করলেন, পুরো স্টেডিয়াম যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেল। গ্যালারিতে পতাকা উড়ছে, চারদিকে তাঁর নামের ধ্বনি। জাতীয় সংগীত বাজছে। পাশে সতীর্থরা, সামনে প্রতিপক্ষ। অথচ সেই মুহূর্তে মেসির চোখে যেন ম্যাচের চেয়েও বড় কিছু ছিল। ছিল স্মৃতি। এক জীবনের স্মৃতি। হয়তো মনে পড়ছিল রোজারিওর সেই ছোট্ট মাঠ। ছোট্ট শরীর নিয়ে বলের পেছনে ছুটে চলা সেই ছেলেটাকে। হয়তো মনে পড়ছিল বার্সেলোনার উদ্দেশে পরিবার ছেড়ে পাড়ি দেওয়ার দিনটি। হয়তো হাঙ্গেরির বিপক্ষে সেই ৪৭ সেকেন্ডের অভিষেক। হয়তো ২০১৪ সালের মারাকানার রাত। ২০১৬-এর সেই কান্না, অবসরের ঘোষণা। ২০২১-এর সেই বহুপ্রতীক্ষিত কোপা আমেরিকা। তারপর কাতারের রাত—যেদিন বিশ্বকাপটা হাতে উঠেছিল। আর হয়তো মনে পড়ছিল তাঁর বাবা হোর্হে মেসির কথা। মনে পড়ছিল সেইসব মানুষকে, যাঁরা তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় কোনো না কোনোভাবে পাশে ছিলেন।

ম্যাচ শুরু হলো। প্রথমার্ধে কোনো গোল হলো না। যেন সময়ও একটু ধীরে চলছিল। যেন এই রাতটাকে দ্রুত শেষ করতে চাইছিল না কেউ। তারপর দ্বিতীয়ার্ধ। মেসির কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দির গোল। কিছুক্ষণ পর মেসির পাস থেকে নিকো পাজের গোল। আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেল ২–০। তারপর এল সেই মুহূর্ত। পেনাল্টি। মেসি বলটি হাতে তুলে নিলেন। হয়তো মনুমেন্টালের হাজারো মানুষ তখন একই সঙ্গে বুঝে গিয়েছিল এই দৃশ্য আর কখনো ফিরে আসবে না। এই মানুষটি আর কোনোদিন আর্জেন্টিনার হয়ে পেনাল্টির জন্য বল হাতে দাঁড়াবেন না। বলটা রাখা হলো। মেসি প্রস্তুত হলেন। কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন পুরো স্টেডিয়াম নিঃশব্দ। তারপর দৌড়। শট। বল জালে। গোল।

শেষবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসি

যে মানুষটির আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিল ৪৭ সেকেন্ডের লাল কার্ডে, তাঁর শেষ ম্যাচ শেষ হলো একটি গোল, দুটি অ্যাসিস্ট এবং বিজয়ের মধ্য দিয়ে। এ যেন ফুটবল নিজেই তাঁর গল্পের শেষ বাক্যটি একটু যত্ন করে লিখে দিয়েছে।

শেষ বাঁশি বাজার পর মেসি কাঁদছিলেন। সতীর্থরা তাঁকে জড়িয়ে ধরছিল। প্রতিপক্ষও এগিয়ে এল। স্টেডিয়াম তাঁকে বিদায় জানাল। আকাশে ভেসে উঠল আলো। ‘Gracias Leo’। ধন্যবাদ, লিও। এই দুটি শব্দের মধ্যে কত ইতিহাস জমে থাকে! ধন্যবাদ সেই ছেলেটির জন্য, যে ছোট শরীর নিয়ে লড়াই করেছিল। ধন্যবাদ সেই কিশোরটির জন্য, যে সমুদ্র পেরিয়েছিল। ধন্যবাদ সেই খেলোয়াড়টির জন্য, যে ক্লাব ফুটবলের সব সাফল্য পেয়েও দেশের জার্সি ছাড়েনি। ধন্যবাদ সেই মানুষটির জন্য, যে চারটি বড় ফাইনাল হারার পরও ফিরে এসেছিল। ধন্যবাদ সেই অধিনায়কের জন্য, যে অবশেষে কোপা আমেরিকা জিতেছিল। ধন্যবাদ সেই মানুষটির জন্য, যে বিশ্বকাপ ট্রফি মাথার ওপরে তুলেছিল। ধন্যবাদ সেই ৩৯ বছরের ফুটবলারের জন্য, যে শেষ ম্যাচেও তরুণদের মতো লড়েছিল। আর সবচেয়ে বেশি ধন্যবাদ হাল না ছাড়ার জন্য।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা

Read full story at source