পাইলট, মিস্ত্রি, দন্তচিকিৎসক—কার কার চেষ্টায় রক্ষা পেল ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজটি
· Prothom Alo

উড়োজাহাজের ককপিটের মেঝেতে পড়ে ছিলেন পাইলট স্মিথ মছার। রক্ত গড়াচ্ছে। এ অবস্থাতেও তিনি ককপিটের দরজা খোলার সুইচ চেপে দেন, যাতে ক্রু-যাত্রীরা ককপিটে ঢুকতে পারেন। তাঁরা যেন হামলাকারী পাইলটকে কাবু করতে পারেন। এর পর রক্ষা পায় উড়োজাহাজটিতে থাকা ১৭৪ জন যাত্রীর জীবন।
Visit bettingx.bond for more information.
এর কিছুক্ষণ আগেই স্মিথকে ককপিটে থাকা আরেকজন পাইলট ছুরি দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত করেন। ধারণা করা হচ্ছে, উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা থেকে এ হামলা করা হয়েছিল। ফ্লাইদুবাইয়ের উড়োজাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবে যাচ্ছিল।
ঘটনাটি ঘটে গতকাল বুধবার। তখন উড়োজাহাজটি ওমানের আকাশসীমায় ছিল। পরে উড়োজাহাজটির দিক ঘুরিয়ে সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবুক শহরের বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করানো হয়। সেখানকার একটি হাসপাতালে এখন চিকিৎসা নিচ্ছেন স্মিথ।
ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ধারণা করা হচ্ছে, যাত্রীবোঝাই উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত করানোই ছিল হামলাকারীর উদ্দেশ্য। তবে স্মিথের সময়মতো ককপিটের দরজা খুলে দেওয়া এবং যাত্রী ও ক্রুদের উদ্যোগের ফলে বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে।
এ ঘটনায় প্রশংসায় ভাসছেন স্মিথসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের ‘নায়ক’ বলা হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে স্মিথকে ‘নায়ক’ বলে প্রশংসা করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
মোদি লেখেন, ‘ভয়াবহ বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি (স্মিথ) অসীম সাহস ও অন্যদের জীবন রক্ষায় দৃঢ়সংকল্প দেখিয়েছেন। তাঁর সাহস শত শত মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। বড় একটি বিপর্যয় এড়াতে সহায়তা করেছে।’
এর আগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পাইলট স্মিথকে ‘নায়ক’ উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন। নেতানিয়াহু লেখেন, ‘ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি (স্মিথ) লড়াই করেছেন। হামলাকারীকে প্রতিহত করেছেন। ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছেন। এতে যাত্রী ও ক্রুরা হামলাকারীকে কাবু করতে পেরেছেন।’
‘মনে হচ্ছিল উড়োজাহাজ না, রোলারকোস্টার, হুড়মুড়িয়ে নিচে নামছিল’যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
পুরো ঘটনাটি ঘটে মাঝ আকাশে। ককপিটে হঠাৎ দুই পাইলটের ধস্তাধস্তি হয়। তখন হামলাকারী পাইলট (তিনি ওমানের নাগরিক বলে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানা যাচ্ছে) ভারতীয় পাইলট স্মিথকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। হামলাকারী স্মিথের সহ–পাইলট ছিলেন।
এ ঘটনায় যাত্রীবোঝাই উড়োজাহাজটি ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে হুড়মুড়িয়ে ১৪ হাজার ফুট বা প্রায় ৪ হাজার ২৬৭ মিটার নিচে নেমে আসে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যাত্রীরা। উড়োজাহাজটিতে থাকা আলমগ ইতালি নামের এক যাত্রী জানান, পরপর দুবার উড়োজাহাজটি ‘রোলারকোস্টারের মতো করে’ হুড়মুড়িয়ে নিচে নামতে শুরু করেছিল
পরে কয়েকজন যাত্রী ও ক্রু ককপিটে ঢুকতে এবং হামলাকারীকে নিবৃত্ত করতে সক্ষম হন।
ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজ। ইসরায়েলের তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ঘটনার সময় ককপিটে ঢুকেছিলেন যাত্রী ইয়ানিভ হায়ুন। নেতানিয়াহুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়ানিভ পেশায় পাইপমিস্ত্রি (প্লাম্বার)। ইয়ানিভ বলেন, স্মিথকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল। তিনি দরজার এক পাশে ছিলেন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে ইয়ানিভ জানান, হামলাকারীর সঙ্গে অন্যরা যখন ধস্তাধস্তি করছিলেন, তখন তিনি পেছনে সরে গিয়ে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন। ইয়ানিভ বলেন, ‘আমি উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণের হাতল ধরে টানতে শুরু করি। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলোয় যেভাবে দেখেছি, ঠিক সেভাবেই। পরে ক্রুরা এসে উড়োজাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেন।’
ককপিটে ছুটে গিয়েছিলেন উড়োজাহাজের আরেক যাত্রী শোতা মুসায়েভ। পেশায় দন্তচিকিৎসক তিনি। সিএনএনকে শোতা বলেন, ককপিটে গিয়ে তাঁরা দেখেন, হামলাকারী মেঝেতে পড়ে থাকা পাইলটের (স্মিত) ওপর বসে তাঁকে ছুরিকাঘাত করছেন।
তখন শোতা দ্রুতবেগে স্মিততে সহায়তা করার জন্য ছুটে যান। বলেন, ‘ভয় লাগছিল। ভেবেছিলাম, তিনি (স্মিত) মারা যেতে পারেন।’
সহ–পাইলটকে কুপিয়ে ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন পাইলটশোতা আরও বলেন, ‘তাঁর (স্মিত) মাথা, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা ছিল। হাতের ক্ষত এত গভীর ছিল, মনে হচ্ছিল, প্রায় দুভাগ হয়ে গেছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তাঁর অবস্থা খুবই খারাপ ছিল। তাঁর (স্মিত) রক্তচাপ হঠাৎ অনেক কমে যায়। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারান। চারদিকে রক্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। আমরা যদি আরও কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করতাম, তাহলে হয়তো তাঁকে হারাতাম,’ সিএনএনকে বলেন দন্তচিকিৎসক শোতা।
শোতা আরও দাবি করেন, হামলাকারীকে কাবু করতে তিনি সহায়তা করেছিলেন। হেডফোনের তার আর প্লাস্টিকের জিপ-টাই দিয়ে হামলাকারীর হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল।
ফ্লাইদুবাইয়ের যাত্রীদের ফেরাতে সামরিক উড়োজাহাজ পাঠাতে চেয়েছিল ইসরায়েল, মানেনি সৌদি আরবযেভাবে নিরাপদে অবতরণ
ওই উড়োজাহাজে আরও দুজন পাইলট ছিলেন। তবে তাঁরা তখন ফ্লাইটটি পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন না। জানা গেছে, ফিরতি পথে ওই দুজনের দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁরা উড়োজাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নেন। সেটিকে নিরাপদে সৌদি আরবে অবতরণ করান।
এ বিষয়ে যাত্রী আলমগ ইতালি বলেন, ‘বিকল্প ওই দুজন পাইলট ইউরোপীয়। তাঁদের একজন ব্রিটিশ নাগরিক। তিনি ককপিটে ঢুকে উড়োজাহাজের সামনের অংশ ওপরের দিকে তোলেন। উড়োজাহাজটিকে স্থির করেন। এরপর আমাদের সৌদি আরবে নিরাপদে অবতরণ করান।’
ভারতীয় পাইলট স্মিথ মছারবিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, বিকল্প দুজন পাইলটের একজন ব্রিটিশ নাগরিক। অন্যজন দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা নিউজিল্যান্ডের নাগরিক ছিলেন।
স্মিথ এখন সৌদি আরবের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই পাইলটের অস্ত্রোপচার করানো হয়েছে। তবে অবস্থা এখন স্থিতিশীল। স্মিথের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কর্মকর্তারা। তাঁর স্ত্রী, দুই সন্তান দুবাইয়ে থাকেন বলেও জানা গেছে।
ইসরায়েলগামী উড়োজাহাজে ছুরিকাহত পাইলট ভারতীয়, ধন্যবাদ জানালেন নেতানিয়াহুহামলাকারী পাইলট এখন সৌদি আরবে গ্রেপ্তার আছেন। তাঁকে সৌদি কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে জানান নেতানিয়াহু। আর উড়োজাহাজটির যাত্রীদের ইসরায়েলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ফ্লাইদুবাইয়ের যাত্রীদের ফেরাতে সামরিক উড়োজাহাজ পাঠাতে চেয়েছিল ইসরায়েল, মানেনি সৌদি আরব