স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্ক কতটা ঝুঁকিতে

· Prothom Alo

কল্পনা করুন, ১৩ বছরের এক কিশোর ফোন হাতে বসে আছে। একটি নোটিফিকেশন এল, কেউ তার পোস্টে লাইক দিয়েছে। কিশোরটি ফোন খুলে দেখল। একটু ভালো লাগল। তারপর আবার ফোন রেখে দিল। কিন্তু কয়েক মিনিট পরই আবার হাত চলে গেল ফোনের দিকে, পরের নোটিফিকেশনের অপেক্ষায়। এই প্যাটার্ন আমাদের সবার কাছেই বেশ পরিচিত।

প্রশ্ন হলো, কিশোর-কিশোরীদের এখনো বেড়ে ওঠা মস্তিষ্কের জন্য এই ছকের মূল্য আসলে কতটা? আর বিজ্ঞান এই প্রশ্নের কতটুকু উত্তর দিতে পেরেছে?

Visit michezonews.co.za for more information.

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের গবেষক জে জিড ১৯৯১ সাল থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চালিয়ে আসছেন। সেখানে হাজার হাজার এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দেখা হয়েছে—মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক কীভাবে বেড়ে ওঠে। ১৯৯৯ সালে নেচার নিউরোসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত তাঁর একটি মূল গবেষণায় ১৪৫ জন সুস্থ অংশগ্রহণকারীর ২৪৩টি এমআরআই স্ক্যান বিশ্লেষণ করা হয়।

এতে দেখা যায়, মস্তিষ্কের ধূসর পদার্থ বা গ্রে ম্যাটার সর্বোচ্চ পরিমাণে পৌঁছায় বয়ঃসন্ধির ঠিক আগের পর্যায়ে বা প্রি-অ্যাডোলেসেন্স ধাপে। এরপর সিন্যাপটিক প্রুনিং নামে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা কমতে শুরু করে। অর্থাৎ কম ব্যবহৃত স্নায়ু সংযোগগুলো ছাঁটাই করে ফেলা হয়। ঠিক যেমন একটি গাছের অপ্রয়োজনীয় ডাল কেটে ফেললে বাকি ডালগুলো শক্তিশালী হয়।

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভবিষ্যৎ চিন্তা করা আর তাৎক্ষণিক লোভ সামলানোর দায়িত্ব নেয়। এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে দেরিতে পরিণত হওয়া অংশগুলোর একটি হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এর পূর্ণাঙ্গ পরিণতি আসতে সময় লাগে প্রায় মধ্য-বিশের কোঠায়।

নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার প্রভাব ফেলতে পারে শিশুর বিকাশে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক ও নোটিফিকেশন একটি পরিবর্তনশীল পুরস্কার পদ্ধতিতে কাজ করে, ঠিক যেমন একটি স্লট মেশিন কাজ করে।

মনোবিজ্ঞানী লরেন্স স্টাইনবার্গ ২০০৮ সালে এই পুরো পরিস্থিতিকে একটি নাম দেন—ম্যাচুরিটি গ্যাপ। কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের পুরস্কার-সন্ধানী অংশ, বিশেষ করে লিম্বিক সিস্টেমের নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেনস অঞ্চল পূর্ণ উদ্যমে সক্রিয় থাকে। সেটা নতুন উত্তেজনা আর সামাজিক স্বীকৃতির প্রতি প্রবলভাবে টানে। কিন্তু প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স, যার কাজ সেই টানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, তা তখনো নির্মাণাধীন থাকে।

এই দুই অংশের বিকাশের গতির পার্থক্যটাই তৈরি করে সেই ম্যাচুরিটি গ্যাপ। সেখানে কিশোর-কিশোরীরা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে তাৎক্ষণিক পুরস্কারের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল থাকে। অথচ সেই সংবেদনশীলতাকে সামলানোর ক্ষমতা তাদের তখনো অসম্পূর্ণ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক ও নোটিফিকেশন কাজ করে একটি পরিবর্তনশীল পুরস্কার পদ্ধতিতে। ঠিক একইভাবে কাজ করে একটি স্লট মেশিনও। আপনি জানেনও না পরের বার ফোন খুললে কতগুলো লাইক পাবেন। আর এই অনিশ্চয়তাটাই মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থাকে বারবার টেনে নিয়ে যায় ফোনের দিকে। একটি পরিণত প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স এই টানকে তুলনামূলক ভালোভাবে সামলাতে পারে। কিন্তু নির্মাণাধীন প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের জন্য কাজটি বেশ কঠিন।

শিশুর ওপর অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের প্রভাব
কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের পুরস্কার-সন্ধানী অংশ, বিশেষ করে লিম্বিক সিস্টেমের নিউক্লিয়াস অ্যাকুম্বেনস অঞ্চল পূর্ণ উদ্যমে সক্রিয় থাকে, যা নতুন উত্তেজনা আর সামাজিক স্বীকৃতির প্রতি প্রবলভাবে টানে।

২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তারিত সতর্কবার্তা প্রকাশ করেন। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের প্রায় ৯৫ শতাংশ কোনো না কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। তাদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নিজেরাই স্বীকার করে যে তারা প্রায় সবসময় এসব প্ল্যাটফর্মে থাকে।

২০২১ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গড়ে দিনে সাড়ে তিন ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটায়। ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৬ হাজার ৫৯৫ জন কিশোর-কিশোরীর ওপর করা একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটায়, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের লক্ষণ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।

শুধু সহসম্পর্ক বা কো-রিলেশন নয়, এখানে একটি প্রকৃত পরীক্ষাও রয়েছে। অর্থনীতিবিদ লুকা ব্রাগিয়েরি, রো'ই লেভি আর আলেক্সেই মাকারিন ২০২২ সালে আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউ সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁরা একটি চমৎকার সুযোগ নেন। ফেসবুক যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একযোগে চালু হয়নি, বরং ধাপে ধাপে বিভিন্ন সময়ে চালু হয়েছিল। গবেষকেরা দেখান, যে ক্যাম্পাসে ফেসবুক আগে চালু হয়েছিল, সেখানকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষণ্নতার লক্ষণ প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছিল; তুলনামূলকভাবে যেসব ক্যাম্পাসে তখনো ফেসবুক পৌঁছায়নি, তাদের চেয়ে।

মোবাইল ব্যবহার কি কিশোরদের জন্য সত্যিই ক্ষতিকর
২০২১ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা গড়ে দিনে সাড়ে তিন ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটায়।

একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিন্নমত

বিজ্ঞানে সৎ থাকতে হলে বিপরীত প্রমাণও দেখাতে হয়। ২০১৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যামি অরবেন ও অ্যান্ড্রু প্রজিবিলস্কি নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার সাময়িকীতে একটি ভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। তাঁরা তিনটি বড় ডেটাসেট থেকে মোট ৩ লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৮ জনের তথ্য নিয়ে একটি কৌশল ব্যবহার করেন। একে বলে স্পেসিফিকেশন কার্ভ অ্যানালাইসিস। এখানে একটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার শত শত সম্ভাব্য পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি একসঙ্গে চালিয়ে দেখা হয়, ফলাফল কতটা স্থিতিশীল।

তাঁদের ফলাফল ছিল, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার ও কিশোর-কিশোরীদের সুস্থতার মধ্যে সম্পর্কটা নেতিবাচক ঠিকই, কিন্তু তা এতই কম যে এটি সুস্থতার তারতম্যের সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক চার শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পারে। গবেষকদের নিজস্ব ভাষায়, এই প্রভাব নীতিগত পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট বড় নয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বট বাহিনী কী, কীভাবে কাজ করে
মনোবিজ্ঞানী জনাথন হাইটের আলোচিত বই দ্য অ্যাংজাইয়াস জেনারেশন-এ বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে স্মার্টফোনের বিস্তার কিশোর-কিশোরীদের শৈশবকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে।

এই দুটি গবেষণা একে অপরের বিপরীত মনে হলেও বিজ্ঞানের স্বাভাবিক অবস্থাটাই দেখাচ্ছে। ব্রাগিয়েরি-লেভি-মাকারিনের পরীক্ষা নির্দিষ্ট একটি পরিস্থিতিতে একটি প্রকৃত কার্যকারণ সম্পর্ক দেখিয়েছে। অরবেন-প্রজিবিলস্কির বিশ্লেষণ বলছে, সাধারণভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিমাণ দিয়ে কিশোর-কিশোরীদের সামগ্রিক সুস্থতার খুব সামান্য অংশই ব্যাখ্যা করা যায়। দুটিই সত্য হতে পারে। সমস্যাটা হয়তো ব্যবহারের পরিমাণে নয়, বরং ব্যবহারের ধরনে, প্রসঙ্গে আর কোন বয়সে সেই ব্যবহার শুরু হচ্ছে—তার মধ্যে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত মনোবিজ্ঞানী জনাথন হাইটের আলোচিত বই দ্য অ্যাংজাইয়াস জেনারেশন এই জটিল চিত্রকে একটি সরল ও শক্তিশালী গল্পে পরিণত করেছে। বইটিতে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে স্মার্টফোনের বিস্তার কিশোর-কিশোরীদের শৈশবকে নতুনভাবে গড়ে দিয়েছে। জনাথন হাইটের বইটি বেশ প্রভাবশালী, কিন্তু অরবেন-প্রজিবিলস্কির মতো গবেষকেরা মনে করেন তাঁর উপস্থাপিত গ্রাফগুলো সহসম্পর্ককে কার্যকারণ হিসেবে দেখানোর ঝুঁকি নিয়েছে। এই বিতর্কটি এখনো চলমান। আর সেটি স্বীকার করাই বৈজ্ঞানিক সততা।

স্মার্টফোন যেভাবে আপনার সব তথ্য হাতিয়ে নেয়
অরবেন-প্রজিবিলস্কির গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলতে পারছে না ঠিক কতটুকু ক্ষতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে করছে, আর কতটুকু অন্য কারণে হচ্ছে।

বিশ্ব যেভাবে সাড়া দিচ্ছে

এই উদ্বেগ শুধু গবেষণার কাগজেই সীমাবদ্ধ নেই। অস্ট্রেলিয়ার সরকার ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউবে অ্যাকাউন্ট রাখা আইনত নিষিদ্ধ করেছে। আইন কার্যকর হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায় ৪৭ লাখ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। তবে আইনটি মসৃণভাবে চলছে না।

ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের প্রায় ৮৫ শতাংশ এখনো নানাভাবে এসব প্ল্যাটফর্মে ঢুকে পড়ছে। এই ফাঁক দেখেই ২০২৬ সালের জুনে অস্ট্রেলিয়া সরকার আইন লঙ্ঘনকারী প্ল্যাটফর্মের জরিমানা দ্বিগুণ করে, যা ৪৯.৫ মিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ৯৯ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার করা হয়। ডেনমার্ক ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য একই ধরনের বিধিনিষেধ আনার ব্যাপারে সর্বদলীয় ঐকমত্যে পৌঁছেছে, যা হয়তো শিগগিরই আইনে পরিণত হবে। মালয়েশিয়াও নিজস্ব ১৬ বছর বয়সসীমার নিয়ম নিয়ে এগোচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার আইন প্রয়োগে যে ঘাটতি দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে শুধু আইন করলেই সমস্যা মিটে যায় না। আর অরবেন-প্রজিবিলস্কির গবেষণা মনে করিয়ে দেয়, বিজ্ঞান এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলতে পারছে না—ঠিক কতটুকু ক্ষতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিজে করছে, আর কতটুকু অন্য কারণে হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপ্লব
অস্ট্রেলিয়ার সরকার ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট ও ইউটিউবে অ্যাকাউন্ট রাখা আইনত নিষিদ্ধ করেছে।

তবে জে জিড আর লরেন্স স্টাইনবার্গের গবেষণা একটা বিষয় নিশ্চিতভাবে দেখায়। সেটা হলো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আর লিম্বিক সিস্টেমের বিকাশের গতিতে একটি প্রকৃত ও পরিমাপযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। যে মস্তিষ্ক এখনও নিজেকে সামলাতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে শেখেনি, তার জন্য একটি বিশেষ সমস্যা রয়েছে। প্রতিদিন সাড়ে তিন ঘণ্টা এমন একটি যন্ত্র ব্যবহার করা কি ঠিক, যা কেবল সেই লোভকে বা আসক্তিকে উসকে দেওয়ার জন্যই তৈরি?

তাই পুরো প্রভাবটির আকার নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক থাকলেও এই প্রশ্নটি এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

লেখক: গবেষক ও মেশিন লার্নিং বিজ্ঞানী, ট্রাস্টওয়ার্দি এআইসূত্র: নেচার নিউরোসায়েন্স জার্নাল, আমেরিকান ইকোনমিক রিভিউ ও নেচার হিউম্যান বিহেভিয়ার জার্নালসোশ্যাল মিডিয়ায় সবার জীবন এত রঙিন, আপনার বোরিং কেন

Read full story at source