বিশ্বে ১০ জনে একজন রোগী ক্ষতির শিকার
· Prothom Alo

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বে ১০ জন রোগী চিকিৎসা নিলে অন্তত একজন রোগী ‘ক্ষতি’র মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশে এই ধরনের কোনো হিসাব নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে বলা হয়েছে, দেশে ৩৮ শতাংশ রোগী চিকিৎসা নিতে গিয়ে অযত্ন বা অবহেলার শিকার হয়।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
গতকাল শনিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সেমিনারে এই তথ্য দেওয়া হয়। ‘বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস ২০২৬: অসংক্রামক রোগের জন্য নিরাপদ সেবা’ শীর্ষক এই সেমিনার যৌথভাবে আয়োজন করে ব্র্যাক, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং নাগরিক সংগঠন ইউএইচসি ফোরাম। বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। প্রতিবছর ১৭ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালন করা হয়। এ বছর অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিরাপদ সেবার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, দেশে বছরে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশের কারণ অসংক্রামক রোগ। এর মধ্যে আছে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ। এসব রোগে একবার আক্রান্ত হলে রোগীকে বারবার হাসপাতালে যেতে হয়, অনেক দিন ধরে ওষুধ খেতে হয়। সেই কারণে ক্ষতির ঝুঁকিও থাকে দীর্ঘদিন। তবে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব, যদি নিরাপদ চিকিৎসাসেবার চর্চা করা হয়, যদি হাসপাতালে, সমাজে ও পরিবারে নিরাপদ সেবার সংস্কৃতি গড়ে তোলা যায়।
পরিস্থিতি কী
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সময় রাস্তায়, হাসপাতালে ঢোকার সময়, রোগ শনাক্তের সময়, অস্ত্রোপচারের সময়, ওষুধ সেবনের কারণে বা আইসিইউতে থাকার সময় রোগী আঘাত পেতে পারে, ভুল ওষুধ খেতে পারে, ওষুধের ডোজে ভুল হতে পারে। এতে রোগীর ক্ষতি হয়। উপস্থাপনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে উদ্ধৃত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, বৈশ্বিকভাবে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ১০ জনের মধ্যে একজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসাজনিত ক্ষতির কারণে প্রতিবছর সারা বিশ্বে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। কিন্তু এর অর্ধেক মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য।
অনলাইনে যুক্ত হয়ে ভারতের কনসোর্টিয়াম অব অ্যাক্রিডিটেড হেলথকেয়ার অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট লুলা যোসেফ বলেন, রোগীর অধিকার, প্রতিরোধ সেবা নিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন কাজ করছেন। কিন্তু ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কী হারে মানুষ ক্ষতির মুখে পড়ে, জাতীয়ভাবে সেই পরিসংখ্যান নেই। তবে তাদের অনুমান প্রতি ১০ জন রোগীর মধ্যে ৩–৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মুক্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, বাংলাদেশে চিকিৎসাজনিত ক্ষতির পরিসংখ্যানের ঘাটতি আছে। তবে বিবিএসের ২০২৫ সালের একটি জরিপ বলছে, ৩৮ শতাংশ রোগী হাসপাতালে অযত্ন ও অবহেলার শিকার হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা ওই জরিপে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে সেবা নিতে গিয়ে ৩৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসায় অবহেলা, অযত্ন বা অপচিকিৎসার শিকার হন বলে জরিপকারীদের জানিয়েছেন। গ্রামের মানুষের মধ্যে এই হার ৩৫ দশমিক ৫ এবং শহরের মানুষের মধ্যে এই হার ৪৪। পুরুষ (৩৮ দশমিক ৫) ও নারীর (৩৭ দশমিক ৯) ক্ষেত্রে এই হার প্রায় সমান। বিভাগওয়ারি তথ্যে দেখা যায়, সিলেট বিভাগের মানুষ সবচেয়ে বেশি অবহেলা, অযত্ন বা অপচিকিৎসার মুখে পড়ে, ৪৫ শতাংশ। এই হার সবচেয়ে কম খুলনা বিভাগে, ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যান্য বিভাগে এই হার ময়মনসিংহে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ, বরিশাল বিভাগে ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ, চট্টগ্রাম ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ, ঢাকা ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ, রংপুর ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
অসংক্রামক রোগে কী হয়
ভারতের কনসোর্টিয়াম অব অ্যাক্রিডিটেড হেলথকেয়ার অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট লুলা যোসেফ বলেন, নিরাপদ চিকিৎসাসেবার বিষয়টি এতকাল হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন বিষয়টি হাসপাতালের গণ্ডির বাইরে চলে এসেছে। এখন বলা হচ্ছে, নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব চিকিৎসক ও হাসপাতাল ছাড়াও আরও অনেকের। এর মধ্যে রয়েছে সমাজ ও পরিবার।
আন্তর্জাতিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব হেলথকেয়ার ইমপ্রুভমেন্টের (আইএইচআই) ইউরোপ অঞ্চলের পরিচালক মিনারা চৌধুরী বলেন, অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিনের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। সুতরাং রোগীর ক্ষতি কমাতে হলে, সেবার মান বাড়াতে হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।
ক্ষতি প্রতিরোধে করণীয়
অনুষ্ঠানে বলা হয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণে রোগীর ক্ষতি হয়। ক্ষতির জন্য দোষারোপের সংস্কৃতি চালু আছে। হাসপাতাল বা চিকিৎসকেরা বলেন রোগীর নিজের ভুলে ক্ষতি হয়েছে। আবার রোগী বলেন, হাসপাতালে বা চিকিৎসকের ভুলে রোগীর ক্ষতি হয়েছে। একাধিক আলোচক বলেন, দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বের হওয়া জরুরি।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের অগ্রগতি এখন বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত। এশিয়ান সোসাইটি ফর কোয়ালিটি ইন হেলথকেয়ারের প্রেসিডেন্ট পিয়াওন লিম্পানিয়ালার্ট থাইল্যান্ডের হাসপাতালগুলোর সেবার মান কীভাবে বেড়েছে এবং রোগীর ক্ষতি কতটা কমছে, তার বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে শুরু করতে হবে। রিপোর্ট করতে হবে শেখার জন্য, দোষারোপ করার জন্য নয়। পূর্ণাঙ্গ তথ্য–উপাত্তের জন্য বিলম্ব করা যাবে না। তথ্য–উপাত্ত ব্যবহার করতে হবে বাস্তব পরিবর্তনের জন্য। মনে রাখতে হবে রোগীরা শুধু সেবা গ্রহণকারী নন, তাঁরা নিরাপদ সেবার অংশীদার।
শুরুর উপস্থাপনায় কোয়ালিটি কেয়ার নেটওয়ার্কের মহাসচিব মো. আমিনুল হাসান বলেন, একজন অসংক্রামক রোগীর ক্ষতির ঝুঁকির সম্ভাব্য ক্ষেত্র পাঁচটি—রোগ শনাক্ত (বিলম্বে শনাক্ত, ভুল ব্যাখ্যা), ওষুধ গ্রহণ (ভুল ওষুধ, ভুল ডোজ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া), যোগাযোগ (অসম্পূর্ণ তথ্য, ভুল যোগাযোগ), দীর্ঘায়িত সেবা (ফলোআপ না করা, ব্যর্থ রেফারেল, দুর্বল ছুটির ব্যবস্থা) এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা (টুকরা টুকরা সেবা, দুর্বল সমন্বয়, অপর্যাপ্ত সম্পদ)।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের সিনিয়র ডিরেক্টর মো. আকরামুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এ ফয়েজ, আইএইচআই বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. রফিকুল ইসলাম এবং এসিআই বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. জাকিরুল করিম।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল প্রশ্ন, মতামত ও মুক্ত আলোচনা। এই পর্বের সভাপতিত্ব করেন ও সমাপনী বক্তব্য দেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।