নুহাশপল্লীতে হুমায়ূন আহমেদকে খুঁজতে গিয়ে যাঁদের পেলাম
· Prothom Alo

একদিন হঠাৎ করেই ইচ্ছা হলো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো এক উপন্যাসের চরিত্র হয়ে যাই। কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস চলছিল। ক্লাসের মাঝখানে স্যারকে জরুরি কাজের কথা বলে বেরিয়ে পড়লাম নুহাশপল্লীর উদ্দেশে।
বেলা একটার দিকে রওনা দিই। বাইরে প্রচণ্ড রোদ। কিন্তু কিছু দূর যেতেই আকাশ যেন তার সমস্ত জমিয়ে রাখা কান্না একসঙ্গে নামিয়ে দিল। শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি। সঙ্গে ছাতাও ছিল না। ঢাকা থেকে নুহাশপল্লী যেতে কয়েকবার যানবাহন বদলাতে হয়। তার ওপর রাস্তাজুড়ে অসহনীয় যানজট। বিকেল গড়িয়ে গেল, তবু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলাম না।
বাসে দুজন নারীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হোতাপাড়া কোথায়?’ তাঁরা বললেন, তাঁরাও সেখানেই নামবেন, চাইলে তাঁদের সঙ্গে নামতে পারি। পরে জানতে চাইলেন, কোথায় যাব। বললাম, ‘নুহাশপল্লী।’ একজন মৃদু হেসে বললেন, ‘আমাদের বাড়ি নুহাশপল্লীর কাছেই।’
Visit afsport.lat for more information.
বাস থেকে নেমে তাঁদের সঙ্গেই হাঁটতে শুরু করলাম। তখনো অবিরাম বৃষ্টি। সারা দিন ধরে আকাশ যেন থামতেই চাইছিল না। পথ চলতে চলতে ওই নারীরা আমার জন্য ভীষণ দুশ্চিন্তা করতে লাগলেন। কখন নুহাশপল্লী ঘুরে দেখব, কখন আবার ঢাকায় ফিরব—অনেক রাত হয়ে যাবে। দেশের পরিস্থিতিও ভালো নয়, তার ওপর একা মেয়ে।
একজন খুব মমতা নিয়ে বললেন, ‘দেখো মা, আমাদেরও তো একটা মেয়ে আছে। আজ যদি ও এমন বিপদে পড়ত? তুমি আজ রাতটা আমাদের বাড়িতে থেকে যাও।’
সন্ধ্যার একটু আগে নুহাশপল্লীতে পৌঁছালাম। গিয়ে দেখি সংস্কারের কাজ চলছে। কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। পরিচিত একজন লেখকের মাধ্যমে মেহের আফরোজ শাওনকে ফোন করেও কোনো লাভ হলো না। শেষ পর্যন্ত ম্যানেজারকে ডেকে নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিলেন।
অনেকক্ষণ একা বসেছিলাম লীলাবতী দিঘির পাড়ে। চারপাশে বৃষ্টির শব্দ। হুমায়ূন আহমেদের সমাধির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি যাওয়ার আগের দিনই ছিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। সমাধির ওপর তখনো শুকিয়ে না যাওয়া ফুলগুলো পড়ে ছিল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একের পর এক সেই সমাধির ওপর পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, যিনি বৃষ্টিকে এত ভালোবাসতেন, তিনি যেন এখনো বৃষ্টিবিলাস করে চলেছেন।
ঠিক তখনই পানিতে ভেসে এল একটি ছেঁড়া, ভেজা কাগজ। কৌতূহলবশত তুলে দেখি, তাতে লেখা ‘বাবাকে, নিষাদ’।
আহা!
এক টুকরা ভেজা কাগজও কখনো কখনো কত গল্প বলে যেতে পারে!
এমন সময় সেই নারীর ফোন এল। বারবার বললেন, যেন অবশ্যই তাঁদের বাড়িতে যাই। আসার সময় তিনিই আমাকে নুহাশপল্লীর রাস্তা চিনিয়ে দিয়েছিলেন, বাড়িটাও দেখিয়ে রেখেছিলেন। সত্যি বলতে, তখনো চাইলে হয়তো ঢাকায় ফিরে আসতে পারতাম। কিন্তু তাঁর আন্তরিকতা আর মায়াভরা অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলাম না। তার ওপর তিনি যেভাবে পথঘাটের অনিরাপদ পরিস্থিতির কথা বলছিলেন, মনে হলো—থাক, আজকের রাতটা এখানেই কাটাই।
সন্ধ্যায় গেলাম তাঁদের বাড়িতে। পরিচয় হলো তাঁর মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটির নাম বৃষ্টি। কী অদ্ভুত মিল! সারা দিন যে বৃষ্টি আমাকে সঙ্গ দিয়েছে, সন্ধ্যায় এসে পরিচয় হলো আরেক বৃষ্টির সঙ্গে।
বাড়িতে থাকে মা, ছেলে আর মেয়ে। বহু বছর পর আবার একটি মাটির ঘরে ঢুকলাম। সেই মাটির গন্ধ মুহূর্তেই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল শৈশবের দিনগুলোয়। মনে পড়ল নানাবাড়ির কথা। একসময় এই মাটির সঙ্গে কত গভীর সম্পর্ক ছিল! কত বছর হয়ে গেল নানির বাড়ি যাওয়া হয় না।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বৃষ্টি আপুর সঙ্গে বের হলাম গ্রামের পথে। কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে বুঝলাম, গ্রামে বড় হলেও চিন্তাভাবনায় মেয়েটি কতটা আধুনিক, মুক্তমনা আর প্রগতিশীল। মানুষকে তার ঠিকানা দিয়ে বিচার করা যায় না, সেদিন আবারও উপলব্ধি করলাম।
রাত পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে গল্পে মেতে রইলাম। কী আশ্চর্য! পৃথিবীতে এখনো এমন আন্তরিক, সরল আর নিঃস্বার্থ মানুষ বেঁচে আছে! যাদের সঙ্গে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই, অথচ মুহূর্তেই আপন করে নিতে জানে।
রাতে মাটির ঘরের বারান্দায় বসে জোনাকির আলোর খেলা আর ঝিঁঝি পোকার শব্দ আর ব্যাঙের ডাক শুনতে শুনতে চোখে পানি এসে গেল। মনে হলো, বইয়ে পড়া গল্পগুলোর কাহিনিই যেন আজ আমার জীবনের সঙ্গে ঘটছে। যেই আমি আজকে সকালেও বাংলাদেশ ছাড়ার জন্য পাগল, সেই আমার ভেতরেই প্রকৃতির জন্য এই আকুল হাহাকার। যদি মেয়ে না হতাম, তাহলে কী সুন্দর এ দেশে বসবাস করতে পারতাম! কিন্তু দেশটা এখন মেয়েদের জন্য বিষাক্ত হয়ে গেছে।
পরদিন ভোরে বের হলাম পাশের বিল দেখতে। যত দূর চোখ যায়, সবুজ আর জল। পানির ওপর ভেসে আছে শাপলা। প্রকৃতির দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করছিল। বেশিক্ষণ থাকলাম না। প্রকৃতির খুব কাছে গেলে মানুষ নিজের ভেতরের একাকিত্বটাকেও যেন আরও স্পষ্ট করে অনুভব করে।
ফিরে এসে বৃষ্টি আপু আমাকে নিয়ে গেলেন পাশের একটি বাড়িতে। সেখানে থাকেন একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও তাঁর স্ত্রী। তাঁদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প হলো। জানলাম, হুমায়ূন আহমেদ বহুবার তাঁদের বাড়িতে শুটিং করেছেন। নানা সময়ে তাঁদের উপহারও দিয়েছেন। স্মৃতিগুলো বলতে বলতে বৃদ্ধ দম্পতির চোখেমুখে একধরনের উজ্জ্বলতা ফুটে উঠছিল।
বৃষ্টির দিনে নুহাশপল্লীচিঠিটা খুলে বসলাম জ্বলন্ত লাল আগুনের আভায়এই দুই দিনে যাঁর সঙ্গেই কথা বলেছি, প্রায় সবার মুখেই হুমায়ূন আহমেদের গল্প শুনেছি। বুঝলাম, তিনি শুধু নুহাশপল্লীর মালিক ছিলেন না, তিনি এই গ্রামের মানুষদেরও আপন ছিলেন।
একজন বললেন, ‘হুমায়ূন আহমেদ আসলে কী ছিলেন, সেটা পিরুজালীর মানুষ বুঝেছে যেদিন তিনি মারা গেলেন। সেদিন পুরো উপজেলা লাখ লাখ মানুষে ভরে গিয়েছিল।’
বৃদ্ধ শিক্ষকটি অনেকক্ষণ ধরে গল্প করলেন। ওনাদের কলেজজীবনের গল্প। টাঙ্গাইলে ওনার বাবার বাড়ি। টাঙ্গাইলের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের প্রসঙ্গে বলেন, ‘দেশভাগ যদি আরও দশটা বছর আগে হতো, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার আরও উন্নতি হতো। এই বাংলার জন্য যদি কেউ কিছু করে গিয়ে থাকে, সেটা সবচেয়ে বেশি করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান।’
মুজিব সাহেবের আরও অনেক গল্প করল। মোনেম খান, ইয়াহিয়া খানের কথাও বলল। আমি অবাক, এমন অজপাড়াগাঁয়ের বৃদ্ধ লোকটির দেশের প্রতি, শেখ মুজিবের প্রতি, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি এত শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দেখে।
ইতিহাস বইয়ের পাতা থেকে মুছে গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে কখনোই মুছে যায় না। আগেরকার যুগের শিক্ষিত মানুষেরা সত্যিকারের শিক্ষিত ছিল, সেটা গ্রামবাংলার অল্প কয়েকজন সুশিক্ষিত বৃদ্ধের সঙ্গে কথা বলেই বোঝা যায়। আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যান। কিন্তু এই সরল মানুষগুলো বদলান না, তাঁদের আদর্শের জায়গা থেকে।
ফেরার সময় মনটা অদ্ভুত ভারী হয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, এই দুই দিনে নুহাশপল্লী থেকে শুধু একটি জায়গার স্মৃতি নিয়ে ফিরছি না, ফিরছি কিছু মানুষের অশেষ মমতা, অকৃত্রিম আতিথেয়তা আর ভালোবাসা নিয়ে।
ভালো থাকুক সেই মানুষগুলো। ভালো থাকুক তাঁদের সরলতা, তাঁদের মমতা, আর এই বাংলার গ্রামগুলো, যেখানে এখনো গল্পের মানুষদের খুঁজে পাওয়া যায়।
নুহাশপল্লীতে গিয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদকে খুঁজতে। কিন্তু ফিরে এসেছিলাম তাঁর গল্পের মতো কিছু মানুষ, কিছু বৃষ্টি আর একরাশ অপ্রত্যাশিত মমতা নিয়ে। মনে হয়েছিল, হুমায়ূন আহমেদের চরিত্ররা শুধু তাঁর বইয়েই বাস করে না, তারা এখনো এই দেশের পথঘাটে, মানুষের হৃদয়ে, নিঃস্বার্থ আতিথেয়তায় নীরবে বেঁচে আছে।
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়