রান্না শুধু খাবার নয়, বাংলাদেশের গল্প বলারও ভাষা: মাস্টারশেফ ইউকের সেমিফাইনালিস্ট সাবিনা খান
· Prothom Alo

মাস্টারশেফ ইউকের সেমিফাইনালিস্ট সাবিনা খান এখন বাংলাদেশে। শেকড়কে ভালোবেসে নিজের দেশের খাবারের স্বাদ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পীর সঙ্গে হাল ফ্যাশনের একান্ত আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তাঁর রান্নার দর্শন, বাংলাদেশি খাবার নিয়ে পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা। সাবিনা বলেন, ‘আমি চাই মানুষ বলুক, চল আজ বাংলাদেশি খাবার খেতে যাই।’
বাংলাদেশের মুড়ি-পেঁয়াজু যখন মাস্টারশেফ ইউকে–এর মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন রূপে হাজির হয়, তখন সেটি শুধু একটি খাবারের পরিবেশন থাকে না; হয়ে ওঠে শেকড়ের গল্প বলার এক অভিনব ভাষা। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রন্ধনশিল্পী সাবিনা খানের হাত ধরে সেই গল্পই পৌঁছে গেছে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের কাছে।
Visit mchezo.co.za for more information.
মাস্টারশেফ ইউকে–এর সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে সাবিনা খান হয়তো ট্রফি হাতে ফেরেননি, কিন্তু জয় করেছেন বহু মানুষের হৃদয়। তাঁর রান্নায় যেমন বাংলাদেশের মাটি, স্মৃতি ও স্বাদ আছে, তেমনি আছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের রান্নার সঙ্গে বাংলাদেশের খাবারকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সাহসী চেষ্টা।
মানিকগঞ্জের মেয়ে সাবিনা। ছোটবেলা থেকেই রান্নার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। মা ও দাদির হাতের রান্না দেখে বড় হয়েছেন। পেশাগত জীবনে কখনো কনসালট্যান্ট, কখনো গবেষক, আবার কখনো সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত থাকা এই নারী প্রায় ৫০ বছর বয়সে এসে আবিষ্কার করেছেন, তাঁর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা আসলে রান্না।
সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে হাল ফ্যাশনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি কথা বলেছেন রান্না, নিজের শেকড়ের প্রতি ভালোবাসা, বাংলাদেশের খাবারের আন্তর্জাতিক পরিচিতি, নারীদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ব্যায়াম, জীবনের নতুন করে শুরু করার সাহস এবং মাস্টারশেফ–এর অভিজ্ঞতা নিয়ে।
পাঠকদের জন্য তিনি বিশেষভাবে তৈরি করেছেন বাঙালি প্রন টোস্ট উইথ সালাদ, বাংলাদেশি রঙিন প্রন এবং গুয়াকামোলে উইথ পমগ্র্যানেট।
রান্নার প্রতি আপনার ভালোবাসার শুরুটা কোথা থেকে?
বাংলাদেশি স্টাইলের চিপসপুরোপুরি আমার মায়ের কাছ থেকে। আমার মা সাংঘাতিক ভালো রান্না করতেন। ছোটবেলা থেকে এখন পর্যন্ত এমন কোনো খাবার নেই, যেটা তিনি রান্না করতে পারেননি। শুধু বাঙালি খাবার নয়, পিৎজা, বার্গার, কাবাব, বিরিয়ানি, ডেনিশ, পেস্ট্রি, চকোলেট কেক, কুকিজ, ডোনাট—সবকিছুই তিনি বানাতেন।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, তখন তো ইন্টারনেট ছিল না, ইউটিউব ছিল না। এখনকার মতো এত রেসিপির বই বা ভিডিওও সহজে পাওয়া যেত না। কিন্তু মা কোথা থেকে যেন রেসিপি খুঁজে বের করে ফেলতেন এবং রান্না করতেন। ছোটবেলায় আমরা খুব একটা বাইরে খেতে যেতাম না। তাই আমাদের বাড়িটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় রেস্তোরাঁ।
মা আর দাদির রান্না দেখতে দেখতে আমি বুঝেছি, রান্না শুধু উপকরণ মেশানো নয়। প্রতিটি খাবারের মধ্যে ভালোবাসা, যত্ন আর স্মৃতি থাকে। স্কুল থেকে ফিরে পরিবারের সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার সেই স্মৃতিগুলোই আমার খাবারের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেছে।
এত বছর পর এসে রান্নাকেই নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার অনুভূতিটা কেমন?
অ্যাভাকাডো উইথ পোমোগ্রানেটমজার বিষয় হলো, আমি মনে করি আমি সব সময়ই আমার স্বপ্নের কাজ করে এসেছি, শুধু সেটা বুঝতে আমার প্রায় ৫০ বছর লেগেছে!
জীবনের অনেকটা সময় আমি অন্য পেশায় ছিলাম। কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছি, গবেষণা করেছি, দীর্ঘদিন সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু পাশাপাশি প্রায় ২০ বছর ধরে পরিবার ও বন্ধুদের জন্য রান্না করেছি। নতুন কিছু রান্না করতে ভালো লেগেছে, মানুষকে খাওয়াতে ভালো লেগেছে, মানুষকে একসঙ্গে বসাতে ভালো লেগেছে।
এখন বুঝি, আমার জীবনের বিভিন্ন কাজের মধ্যে রান্নাটা সব সময়ই ছিল। শুধু আমি সেটাকে ক্যারিয়ার হিসেবে দেখিনি।
আমি মনে করি, জীবনে কখনোই ভাবা উচিত নয় যে ১৬, ১৭, ২০ বা ৩০ বছর বয়সে আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটাই সারাজীবন আপনাকে অনুসরণ করতে হবে। জীবনের অনেক পরে গিয়েও ক্যারিয়ার বদলানো যায়। বরং নিজের প্যাশন খুঁজে পাওয়া গেলে সেই পরিবর্তন মানুষকে অনেক বেশি সুখী করতে পারে।
মাস্টারশেফ ইউকে আপনার সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় জায়গা। যাত্রাটা কেমন ছিল?
বাংলাদেশি প্রন টোস্টমাস্টারশেফ–এ প্রথম যখন গিয়েছিলাম, সত্যি বলতে নিজের ওপর খুব একটা বিশ্বাস ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, একটা অ্যাপ্রন পাব, তারপর হয়তো বের হয়ে যাব।
কিন্তু অ্যাপ্রন পাওয়ার পর যখন এক ধাপ, দুই ধাপ করে এগোতে শুরু করলাম, তখন বুঝলাম, আমার এত বছরের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো আসলে আমাকে এই জায়গার জন্যই প্রস্তুত করেছে।
গবেষণার অভিজ্ঞতা, যোগাযোগের অভিজ্ঞতা, চাপের মধ্যে কাজ করার অভিজ্ঞতা, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার অভিজ্ঞতা—সবকিছুই মাস্টারশেফ–এর রান্নাঘরে এসে কাজে লাগল।
একসময় মনে হলো, এটা শুধু রান্নার পরীক্ষা নয়, এটা আমার নিজেরও একটা পরীক্ষা। আমার ভেতরে যে আরও অনেক দূর যাওয়ার ক্ষুধা আছে, সেটা তখন বুঝতে পারলাম।
শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছি। শেষ পর্যায়ে গিয়ে একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমি ভাগ্যে বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি, কখনো কখনো জীবনের কোনো একটা জায়গা থেকে সরে আসাটাও আসলে সঠিক সময়ের অংশ।
আমার চেয়ে ভালো প্রার্থী ছিল, আমার চেয়ে হয়তো কম ভালো প্রার্থীও ছিল। কিন্তু সেটা তখন আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমি জানতাম, আমার যাওয়ার সময় হয়েছে। আর আমি খুব খুশি মনে বেরিয়ে এসেছি।
কারণ মাস্টারশেফ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। এক বছরের মধ্যে আমার জীবন, আমার কাজ, আমার চিন্তাভাবনা—সবকিছুর মধ্যে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা হয়তো এই সুযোগ না এলে কখনোই হতো না।
মাস্টারশেফ–এ আপনার মুড়ি-পেঁয়াজু নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। সাধারণ এই খাবারকে এত বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে কীভাবে দেখলেন?
মাস্টারশেফ ইউকেতে সতীর্থদের সঙ্গেআমি আসলে কখনো কোনো খাবারকে শুধু তার পরিচিত রূপে উপস্থাপন করতে চাইনি।
অনেকে বলেছেন, আমি ঝালমুড়ি পরিবেশন করেছি। কিন্তু আপনি যদি ভালো করে দেখেন, সেই ঝালমুড়ির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব ছিল। সেখানে ফালাফেল ছিল।
এর সসটাও ছিল এক ধরনের ফিউশন। রসুনকে কনফি করে পাঁচফোড়নের সঙ্গে মিশিয়েছি। তারপর ব্লেন্ড করে লেবু দিয়ে একটি সস তৈরি করেছি।
আমার উদ্দেশ্য ছিল দেখানো—বাংলাদেশি খাবারকে আমরা যদি আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে পৌঁছাতে চাই, তাহলে শুধু পরিচিত খাবারটি সামনে রেখে দিলেই হবে না। আমাদের ভাবতে হবে, কীভাবে তার স্বাদ, গল্প ও পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখে সেটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা যায়।
বাংলাদেশি খাবারকে একটি শব্দে প্রকাশ করতে হলে কোন শব্দটি ব্যবহার করবেন?
বাঙালি প্রণ টোস্ট উইথ স্যালাদআমার কাছে শব্দটা হবে ‘জটিল’—তবে ভালো অর্থে।
কারণ আমাদের খাবারের মধ্যে অসাধারণ বৈচিত্র্য আছে। একদিকে ভর্তা, অন্যদিকে পোলাও, মাছ, মাংস, মুরগি—একেকটি খাবারের স্বাদ, রান্নার পদ্ধতি, মসলা ও ইতিহাস একেক রকম।
ধরুন মুড়িঘণ্ট। একজন বিদেশিকে আমি কীভাবে মুড়িঘণ্ট বোঝাব? সেটাকে শুধু অনুবাদ করলে তো তার গল্পটা বোঝানো যাবে না।
আমার কাছে চ্যালেঞ্জটা এখানেই—বাংলাদেশের খাবারের আত্মাটা রেখে কীভাবে অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে সেটাকে পরিচিত ও আকর্ষণীয় করে তোলা যায়।
আমি চাই, মানুষ একদিন বলুক, ‘চল, আজ বাংলাদেশি খাবার খেতে যাই।’
আমরা খুব সহজেই শুনি, ‘চল, ইন্ডিয়ান কারি খেতে যাই।’ কিন্তু বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রে এমন কথা এখনো খুব বেশি শোনা যায় না। আমি চাই সেই জায়গাটা তৈরি হোক।
বাংলাদেশি খাবারকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী বলে মনে করেন?
বাংলাদশি রঙিন প্রনআমাদের নিজেদের খাবারের স্বাতন্ত্র্যটা আগে বুঝতে হবে এবং তারপর সেটাকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।
আমাদের পাঁচফোড়ন আছে। সরিষার তেলের নিজস্ব স্বাদ আছে। মাছের বিশাল বৈচিত্র্য আছে। এমন অনেক উপকরণ ও রান্নার পদ্ধতি আছে, যেগুলো আমাদের খাবারকে আলাদা করে।
কিন্তু শুধু একইভাবে রান্না করে অন্য দেশে পরিবেশন করলেই হবে না। আমাদের জানতে হবে, কীভাবে অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা যায়।
আমি এমন একটি রেস্তোরাঁর স্বপ্ন দেখি, যেখানে মানুষ শুধু ‘বাংলাদেশি খাবার’ খেতে যাবে না, বরং একটি বাংলাদেশি খাবারের অভিজ্ঞতা নিতে যাবে।
একই ভর্তা সবাইকে পরিবেশন করলে হবে না। একইভাবে মুড়িঘণ্ট দিলেও হবে না। আমি চাই, ধরুন একটি ইতালীয় পাস্তার ধারণা নিয়ে মুড়িঘণ্টকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হলো। খাবারটি খেলে আপনি যেন বাংলাদেশকে চিনতে পারেন, কিন্তু উপস্থাপনাটা আপনার কাছে নতুন হয়।
এই জায়গাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে।
ভবিষ্যতে বাংলাদেশি খাবার নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
এখনই রেস্তোরাঁ খোলার পরিকল্পনা নেই। কারণ আমি জানি, রেস্তোরাঁ শুরু করা এবং দীর্ঘদিন ধরে সেটি চালিয়ে যাওয়া কত কঠিন।
আমি এখন বিভিন্ন দেশে সাপার ক্লাব করছি। লন্ডনে করছি, জেনেভাতেও করার পরিকল্পনা আছে। আমি যত বেশি মানুষকে আমার হাতের রান্না খাওয়াতে পারব, তত বেশি মানুষ বাংলাদেশের খাবারকে নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে চিনতে পারবে।
আমি জানি কোন কোন খাবার মানুষ পছন্দ করতে পারে। তারা যদি সেই খাবার খেয়ে আনন্দ পায়, তাহলে হয়তো অন্য কাউকে বলবে। এভাবেই তো একটি সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে।
এর পাশাপাশি ক্যাটারিং নিয়েও কাজ করতে চাই। লেখালেখি করতে চাই। খাদ্য ইতিহাস নিয়ে আমার অনেক আগ্রহ।
আমি খাবার কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে গেছে, মানুষের চলাচল কীভাবে খাবারের স্বাদ বদলেছে—এসব জানতে খুব ভালোবাসি।
আমি প্রায় ১০ বছর একটি জার্নালের সম্পাদক ছিলাম। এখন দ্য ডেইলি স্টার–এর জন্যও কয়েকটি লেখা লিখেছি। একটি বিরিয়ানি নিয়ে, আরেকটি বার্মিজ খাবারের ইতিহাস ও বিবর্তন নিয়ে।
আমি নিজেকে কোনো একটি কাজের মধ্যে আটকে রাখতে চাই না। রান্না, ক্যাটারিং, সাপার ক্লাব, লেখালেখি—সবকিছুই এখন করছি। শেষ পর্যন্ত সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে পথে নিয়ে যাবেন, আমি সেই পথেই যাব।
বাংলাদেশি নারীদের নিয়ে কাজ করার কথাও বলেছেন। সেটি কীভাবে করতে চান?
এটা আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বপ্ন।
বাংলাদেশে অনেক নারী আছেন, যাঁরা অসাধারণ রান্না করেন। কিন্তু তাঁদের অনেকের নিজের ব্যবসা শুরু করার সাহস নেই। কেউ ক্যাটারিং করতে চান, কিন্তু জানেন না কীভাবে শুরু করবেন। কেউ হয়তো রান্না করেন খুব ভালো, কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাসটা নেই।
আমি চাই তাঁদের প্রশিক্ষণ দিতে। শুধু রান্না শেখানো নয়, কীভাবে নিজের কাজকে ব্যবসায় পরিণত করা যায়, কীভাবে ক্যাটারিং শুরু করা যায়, কীভাবে নিজের খাবারকে মানুষের সামনে তুলে ধরতে হয়—এসব নিয়েও কাজ করতে চাই।
কারণ একজন নারী যদি নিজের রান্নার দক্ষতা দিয়ে আয় করতে পারেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে সেটি শুধু তাঁর নিজের জীবনই বদলায় না, তাঁর পরিবারের জীবনও বদলে যায়।
আপনার রান্নার দর্শনের সঙ্গে ব্যায়াম ও ফিটনেসেরও একটা গভীর সম্পর্ক আছে।
অবশ্যই। ব্যায়াম আমার রান্নার মতোই আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমার স্বামী মজা করে প্রায়ই বলেন, আমার মেজাজ খারাপ থাকলে, ‘আজ কি তুমি ব্যায়াম করেছ?’
আমি তখন হেসে ফেলি। কারণ অনেক সময় সত্যিই দেখি, সেদিন ব্যায়াম করা হয়নি!
আমি ওজন কমানোর জন্য ব্যায়াম করি না। পাতলা হওয়ার জন্যও করি না। আমি ব্যায়াম করি মানসিক সুস্থতার জন্য।
আমি যখন পার্কে দৌড়াই বা ট্রেডমিলে দৌড়াই, তখন সেটা আমার নিজের সময়। আমি চিন্তা করি, শান্ত হই, নতুন আইডিয়া পাই। দৌড়ানোর সময় অনেক সময় রান্নার নতুন ধারণাও মাথায় আসে।
আমার কাছে ব্যায়াম আর রান্না পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। আমি যে খাবার রান্না করছি, সেটা যেন আমার শরীরের জন্য ভালো হয়। আবার শরীর ও মন ভালো রাখার জন্যও আমি ব্যায়াম করি।
এখানে একটা ভুল ধারণা আছে—কেউ বেশি ব্যায়াম করলে নাকি সে রান্না করতে পারে না! এর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। বরং আমার ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো।
আপনি এখন ৫০ বছর বয়সে এসেও যে জীবনযাপন করছেন, সেটি তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরকে শক্তিশালী রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আমি এখন ৫০ বছর বয়সী। আমার সন্তানরা যে ভারী জিনিস অনেক সময় তুলতে পারে না, আমি অনায়াসে তুলতে পারি। বাজারে গিয়ে বড় বড় ব্যাগ নিয়ে আসি।
এটাই ফাংশনাল ফিটনেস।
আপনাকে আমার মতো দৌড়াতে হবে না। হাঁটতে পারেন, সাইকেল চালাতে পারেন, সাঁতার কাটতে পারেন, ওজন নিয়ে ব্যায়াম করতে পারেন। কিন্তু কোনো না কোনোভাবে শরীরকে সচল রাখা খুব জরুরি।
কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী শরীর শুধু দেখতে ভালো লাগার বিষয় নয়, নিজের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকারও অংশ।
জীবনের এই পর্যায়ে এসে আপনার সবচেয়ে বড় উপলব্ধি কী?
নিজের প্যাশনকে কখনো ছোট করে দেখবেন না।
আমি সবাইকে বলব, জীবনে যতটা সম্ভব নতুন কিছু চেষ্টা করুন। সাঁতার জানেন না? শিখুন। গান ভালোবাসেন কিন্তু গাইতে পারেন না? গান গাওয়ার চেষ্টা করুন। রান্না করতে ভালো লাগে? রান্না করুন।
কারণ আমি আমার প্যাশন খুঁজে পেয়েছি।
আপনি চেষ্টা না করলে কীভাবে জানবেন কোনটা আপনার প্যাশন?
সব সময় একই কাজ করতে থাকলে হয়তো নিজের ভেতরের অন্য সম্ভাবনাগুলো কখনোই আবিষ্কার করতে পারবেন না।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—কখনো হাল ছাড়বেন না।
আপনি ১৬ বছর বয়সে যে কাজ করবেন, ২০ বছর বয়সে যে সিদ্ধান্ত নেবেন বা ৩০ বছর বয়সে যে ক্যারিয়ার বেছে নেবেন, সেটাই সারাজীবন করতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
আমার মতো জীবনের অনেকটা পরে গিয়েও আপনি নতুন করে শুরু করতে পারেন। আর সেই নতুন শুরু আপনাকে অসম্ভব সুখীও করতে পারে।
আমি সারাদিন কাজ করি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্না, লেখা, পরিকল্পনা, ক্যাটারিং, নানা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি। কিন্তু আমার ক্লান্ত লাগে না।
মাস্টারশেফ–এ যেতে চান এমন কারও জন্য আপনার বিশেষ পরামর্শ কী?
নিজেকে নিয়ে সন্দেহ করবেন না।
আপনি যদি মনে করেন, আপনি ভালো রান্না করেন, তাহলে চেষ্টা করুন। আবেদন করুন। কী হবে?
না হলে হয়তো কিছুই হবে না। কিন্তু চেষ্টা না করলে আপনি কখনোই জানতে পারবেন না কী হতে পারত।
আমি যখন মাস্টারশেফ–এ গিয়েছিলাম, তখনও ভাবিনি সেমিফাইনাল পর্যন্ত যাব। আমি তো ভেবেছিলাম প্রথম রাউন্ডেই হয়তো বের হয়ে যাব!
তাই আমি অনেক দূরের কথা ভাবিনি। ‘দুই হাজার মানুষ থেকে এতজন হবে, তারপর এতজন, তারপর আমি জিতব’—এসব কিছু ভাবিনি।
শুধু একটা একটা করে ধাপ পার করেছি।
অনুশীলন করেছি, গবেষণা করেছি, চেষ্টা করেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে থামিয়ে দেওয়া হয়নি, ততক্ষণ নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
তাই যারা যেতে চান, তাঁদের বলব—আবেদন করুন। নিজেকে একটা সুযোগ দিন। কারণ কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দরজাটা খুলে যায় শুধু আপনি সাহস করে দরজায় কড়া নাড়ার কারণে।