ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আহ্বান ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের ১০২ সাবেক কূটনীতিকের
· Prothom Alo

ইসরায়েলের ওপর যৌথভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপে নিজ নিজ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের ১০২ জন সাবেক কূটনীতিক। তাঁরা সতর্ক করে বলেন, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা চিরতরে মুছে দিচ্ছে।
Visit palladian.co.za for more information.
গতকাল শনিবার ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মঁদ-এ প্রকাশিত এক খোলাচিঠিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
২০২৫ সালে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। সাবেক কূটনীতিকেরা বলছেন, সেই স্বীকৃতিকে এখন জরুরি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী কূটনীতিকদের মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জেরেমি গ্রিনস্টক ও এমির জোন্স প্যারি, ফ্রান্সের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক পরিচালক ইভ অবিন দে লা মেসুজিয়ের, ডেনিস বোচার্ড প্রমুখ। তাঁদের অনেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন।
চিঠিতে বলা হয়, ‘ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের পরোক্ষ মদদে উগ্র ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের চরম সহিংসতা জাতিগত নিধনের শামিল। বিশ্ব এখন ইসরায়েলকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখে না।’
ইরান, কাতার ও ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটনও চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের নতুন তোড়জোড় শুরু হওয়ায় এ চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল সরকার পশ্চিম তীরে এমনভাবে নতুন বসতি গড়ার পাঁয়তারা করছে, যা ভবিষ্যতে সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো সুযোগই রাখবে না।
নিকোলাস হপটন, ইরান কাতার ও ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের অবৈধ বসতি সম্প্রসারণের নতুন তোড়জোড় শুরু হওয়ায় এ চিঠি দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েল সরকার পশ্চিম তীরে এমনভাবে নতুন বসতি গড়ার পাঁয়তারা করছে, যা ভবিষ্যতে সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কোনো সুযোগই রাখবে না।গাজায় ইসরায়েলের দীর্ঘ সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে এ চিঠি সামনে এল। গত বছরের অক্টোবরে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা থামেনি। উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ওই যুদ্ধবিরতির পর থেকেও এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২৮৫ ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন বসতির কারণে ‘কবর’ হতে পারে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষার‘কথা নয়, এবার কাজ চাই’
লিবিয়ায় নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার মিলেট আল–জাজিরাকে বলেন, এই চিঠির মূল উদ্দেশ্য হলো শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপের দাবি জানানো।
পিটার মিলেট বলেন, ‘আমরা কথা নয়, কাজ দেখতে চাই। গত কয়েক মাস ও বছর ধরে আমাদের মন্ত্রীরা শুধু নিন্দা আর সমালোচনা করে বিবৃতিই দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন ইসরায়েলের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং গাজায় সাহায্য পাঠানোর ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।’
চিঠিতে ইসরায়েলি বসতিতে বাণিজ্য বন্ধ, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বিদেশিদের সম্পত্তি কেনায় নিষেধাজ্ঞা ও জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএসহ অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০২৫ সালে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সাবেক কূটনীতিকেরা বলেন, সেই স্বীকৃতিকে এখন জরুরি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী কূটনীতিকেরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এ অঞ্চলের বর্তমান সীমানা নির্ধারণে তাদের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে।
পশ্চিম তীরের শেষ খ্রিষ্টান শহরটিও এখন ইসরায়েলিদের নিশানায়গাজায় ইসরায়েলি সেনারাচিঠিতে আরও বলা হয়, ‘আমাদের দুই দেশই বিশ্বাস করে যে যারা যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।’
চিঠিতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে কয়েকটি পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যচুক্তি স্থগিত করা এবং ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক সহযোগিতা বন্ধ করা।
এ ছাড়া চিঠিতে ইসরায়েলি বসতিতে বাণিজ্য বন্ধ, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বিদেশিদের সম্পত্তি কেনায় নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএসহ অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। গাজায় সাংবাদিক, কূটনীতিক ও আইনপ্রণেতাদের নিরাপদে প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে চিঠিতে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আইন ভঙ্গের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে আইনের শাসন রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং সহিংসতাও বন্ধ হবে।
‘আমরা এভাবে চলতে দিতে পারি না’
মিলেট আরও কঠোর পদক্ষেপ চান। তিনি ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে তাঁর সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
আমরা কথা নয়, কাজ দেখতে চাই। গত কয়েক মাস ও বছর ধরে আমাদের মন্ত্রীরা শুধু নিন্দা আর সমালোচনা করে বিবৃতিই দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু এখন ইসরায়েলের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ এবং গাজায় সাহায্য পাঠানোর ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।মিলেটের অভিযোগ, ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের জর্ডান নদী পার হয়ে জর্ডানে চলে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এভাবে চলতে দিতে পারি না।’
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ আহ্বানে কান দেবেন কি না—এমন প্রশ্নে মিলেট সংশয় প্রকাশ করলেও বলেন, ‘চাপ সৃষ্টি করা জরুরি। বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা যদি ইসরায়েলের অর্থনীতিতে আঘাত হানে, তবে এক বড় প্রভাব সেখানে পড়তে বাধ্য।’
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর তাণ্ডব