নেতা সদা সত্য কথা বলেন

· Prothom Alo

চেয়ারম্যানের বাড়িতে একত্র হয়েছেন কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা ও স্থানীয় কর্মী। রাত এগারোটা বারো মিনিট, সবাই মুখ ভার করে বসে আছেন। ক্ষমতাবান লোকদের মাঝেমধ্যে এমন ভোঁতা মুখ করে বসে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু সেটা জনগণের সামনে নয়। জনগণ জানে, নেতারা সব সময় আনন্দে থাকেন। ক্ষমতা ও বিত্ত তাঁদের সব আনন্দের উৎস। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের এমপি, মন্ত্রী, নেতা ও প্রভাবশালী কর্মীদের জনগণ এ রকম বিষণ্ন মনে দেখতে পায় না বলেই তাদের এমন ধারণা। খুব ভুল ধারণা। নেতাদেরও মন খারাপ হয়, কখনো কখনো তাঁরাও দিশাহীন হন, অসহায় হয়ে পড়েন, ঘন কালো মেঘ নেমে আসে তাঁদের উৎফুল্ল আকাশে।

আজ চেয়ারম্যানের বাড়িতে সে রকমই একখণ্ড মেঘ নেমে এসেছে। কিন্তু যথারীতি বেশ রাত করে, এলাকার জনগণ এ সম্পর্কে কিছুই জানতে পারবে না। সকালে উঠে দেখবে, চেয়ারম্যানের বাড়িতে সূর্যের প্রথম আলোটা এসে পড়েছে। পুরো বাড়ি চকচক করছে মহামূল্যবান পাথরের মতো। তাদের বললে কেউ বিশ্বাসই করবে না, এই বাড়ির লোকজনও মাঝেমধ্যে নির্ঘুম রাত কাটাতে পারে। তা–ও সেটা নিজেদের সমস্যার কথা ভেবে নয়।

Visit casino-promo.biz for more information.

এটা সত্য, নেতাদের নিজেদের কোনো সমস্যা থাকে না। তাঁদের সব সমস্যা দেশ ও দেশের জনগণকে নিয়ে। আজ তেমনই এক সমস্যা নিয়ে রাত পার করে দিচ্ছেন চেয়ারম্যান। সঙ্গে তাঁর চেয়েও বড় নেতারা আছেন, ছোটরাও আছে।

‘নেতা তো ভুল বলতে পারে না। উপায় একটা বের করতে হবে, মতু ভাই।’ মতু চেয়ারম্যানকে বলেন এমপির ছোট ভাই। তিনিই এখন দলের বড় ভাই।

‘হবে হবে। সব হবে। দলের জন্য কাজ করা আমাদের ধর্ম। সেই ধর্মে অবহেলা করেছেন—এমন কথা শত্রুপক্ষও বলতে পারবে না। একটা উপায় বের করেন। ব্যাপার না, আমরা তো আছিই।’ মতু চেয়ারম্যানের খাসবান্দা আলেমুল্লাহ বলে।

তাঁর কথা শুনে চেয়ারম্যান সাহেব চেয়ার থেকে ওঠেন আর বসেন। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। চেয়ারম্যানের মেয়াদ আছে আর মাত্র চার মাস, পরের ইলেকশনেও তিনি পার্টির দোয়া নিয়ে লড়তে চান। কিন্তু চাইলে তো হবে না, দলের মধ্যেই দুজন প্রতিযোগী মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এমপির কাছে গোপনে মালপানি ঢেলেছে বলেও খবর আছে। মতু চেয়ারম্যান কপাল ভাঁজ করে বসে থাকেন। অন্যদের সমান টাকা তিনি পার্টিকে দিতে পারবেন না। টাকাপয়সা যে কম সরিয়েছেন বা হাত ছোট তা–ও নয়। বরং উল্টো, হাত বড়। শুধু পার্টিকে নয়, তিনি এলাকায় প্রচুর দানখয়রাত করেন। তাঁর ইউনিয়নের ১৫টা গ্রামে আদর্শ মসজিদ-মাদ্রাসা তৈরি করে দিয়েছেন। অসহায়–দুস্থ লোকদের ঘরবাড়ি মেরামতের কাজ তো লেগেই আছে। তাঁর মতো দরদি চেয়ারম্যান স্মরণকালেও এলাকায় আসেনি। নিজের নামে ব্যাংক–ব্যালান্স বলে কিছুই করেননি। বড় ছেলেটার শখ ছিল ঢাকায় একটা বাড়ি করার, বাবা হিসেবে সেটা করে দেওয়া কর্তব্য মনে করেছেন। কর্তব্য থেকেই ছোট ছেলেকে পাঁচটা ইটভাটা করে দিয়েছেন সদরে। মানুষের কত রকম শখ থাকে, ছেলেটার শখ ছিল ইটভাটার! জামাই-মেয়ে আমেরিকায় কিছু টাকা পাঠাতে বলেছে, বাড়ি কিনবে; পরের মেয়াদে পাঠাবে বলে ঠিক করেছেন। বাবা হিসেবে যা করার, তার বাইরে নিজের জন্য বলতে শুধু হজটা করেছেন। আর সবকিছু করেছেন এলাকার জনগণের জন্য। কিন্তু ভোটের হিসাব আলাদা। পার্টি না চাইলে তিনি চেয়ার পাবেন না। জনগণের চাওয়াতে কিছু হবে না। আগেরবারও হয়নি।

‘আরে, চিন্তা কোরো না। দলের নমিনেশন তুমিই পাবা। এমপির হয়ে এবার খালি কাজটা করে দাও।’ দলের সিনিয়র নেতা হাবিব মুল্লা বলেন।

‘কিন্তু ক্যামনে মিয়াভাই? ওই পাড়ার সব লোক আমার নিজের। আপনি তো সব জানেনই। আমারই জ্ঞাতিগোষ্ঠী, আত্মীয়স্বজন। কীভাবে হয়?’ চেয়ারম্যান আপনমনে বলে জানালার সামনে দাঁড়ান, অন্ধকার উঠোন থেকে টেনে টেনে অক্সিজেন নেওয়ার চেষ্টা করেন।

‘হবে হবে। সব হবে। দলের জন্য কাজ করা আমাদের ধর্ম। সেই ধর্মে অবহেলা করেছেন—এমন কথা শত্রুপক্ষও বলতে পারবে না। একটা উপায় বের করেন। ব্যাপার না, আমরা তো আছিই।’ মতু চেয়ারম্যানের খাসবান্দা আলেমুল্লাহ বলে।

‘একুশজনকে সাতজন করা আর আটজনকে উনিশজন করা তো এক কথা নয়, সবুজ?’ চেয়ারম্যান বলেন। তাঁকে বেশ বিচলিত দেখায়। ‘চাচা, কথা একই, কামডা আলাদা। কমাতে পারলে বাড়াইতেও পারুম।’ সবুজের ডানহাত হাবেল উজ্জীবিত হয়ে বলে।

‘আরে, এত ভাবাভাবির কী আছে? এই কাজ কি প্রথম করছি নাকি? গতবার গন্ডগোলে নেতা বলে ফেলেছিলেন সাতজন মানুষ মারা গেছে, কিন্তু মারা গিয়েছিল একুশজন। আমরা রাতারাতি চৌদ্দটা বডি গুম করে দিয়েছিলাম। সাংবাদিকেরা সাতটার বেশি লাশ বের করতে পারেনি। পারবে কেমন করে, পরিবারগুলোই তো জানে না তারা জীবিত না মৃত। এত দিনেও জানে কি না সন্দেহ।’ ছাত্রনেতা সবুজ বলে।

‘আরে, জানলেও কেউ কিছু বলতে আসছে নাকি? ওরা জানে আমরা মিথ্যা বলি, আমরাও জানি আমরা যে মিথ্যা বলছি, সেটা ওরা জানে। তারপরও আমরা মিথ্যা বলি, তারপরও ওরা আমাদের বিশ্বাস করে। সো, ব্যাপারটা সিম্পল। রাজনীতির সত্যমিথ্যা-ন্যায়নীতি তো আর বইয়ের সত্যমিথ্যা-ন্যায়নীতি নয়। এইটা জনসম্পৃক্ততার ব্যাপার।’ দলীয় বুদ্ধিজীবী মাস্টার ইব্রাহিম চেয়ারম্যানকে বুঝিয়ে বলেন।

‘ঠিকই, নেতা বলে দিয়েছিলেন সাত, আমরা সেটা করে দিয়েছি। নেতার কথা সত্য করার দায়িত্ব তো আমাদের। যেটা আমাদের মতো মাঠকর্মীদের হাতে, সেটা আমরা করব, যেটা মাস্টারদের মতো বুদ্ধিজীবীদের হাতে, সেটা তারা টক শো, আলোচনা সভায় যুক্তি–প্রমাণ দিয়ে করে দিবে। কাজ সেই একই। এ নিয়ে আমরা এত ভাবছি কেন বুঝলাম না।’ বলে সবুজ।

‘একুশজনকে সাতজন করা আর আটজনকে উনিশজন করা তো এক কথা নয়, সবুজ?’ চেয়ারম্যান বলেন। তাঁকে বেশ বিচলিত দেখায়।

‘চাচা, কথা একই, কামডা আলাদা। কমাতে পারলে বাড়াইতেও পারুম।’ সবুজের ডানহাত হাবেল উজ্জীবিত হয়ে বলে।

‘আমাদের জন্য কিছু ধরে নিলে হইতো না?’ আলেমুল্লাহ জিজ্ঞাসা করে। ‘ওই তো, এক লাখ করে বিলি করবি।’ ‘ও, তাইলে ঠিক আছে।’ বলে আলেমুল্লাহ পা বাড়ায়। ‘আর দেখিস যাতে কষ্ট কম হয়, সব আমার আত্মীয়স্বজন।’

‘কথা কিন্তু পরিষ্কার। নেতা মিডিয়ার সামনে বলে দিয়েছেন, বিরোধী দলের সন্ত্রাসী হামলায় আমাদের উনিশজন মারা গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ব্রেকিং নিউজ হয়ে গেছে ব্যাপারটা। সকাল হতে না হতেই সাংবাদিকেরা সরেজমিনে রিপোর্ট করতে আসবে। যদি দেখে সংখ্যাটা উনিশ নয়, মাত্র আট, তাহলে কি নেতার মুখ থাকবে? আমাদের নেতা কখনো মিথ্যা বলেছে? বলেনি তো! কেন বলেনি? কারণ, আমরা বলতে দেইনি। নেতা যা বলেন, সেইটাই সত্য। এত ভাবার কিছু নাই।’ এমপির ছোট ভাই খায়রুল কথাটা বলে চেয়ার থেকে উঠে পড়েন। তাঁর দাঁড়ানো দেখে আর তিনি বসবেন বলে মনে হয় না।

মতু চেয়ারম্যান চেয়ারে বসেন। খায়রুলের পর আর কেউ কথা বলে না। তা ছাড়া রাতও কম হলো না, সবার মধ্যে ঘরে ফেরার তাড়া। চেয়ারম্যান উঠে পেছনের দরজাটা খোলেন। আজ তাহাজ্জুদ পড়ে ঘুমাবেন। অজু করতে গিয়ে ফিরে আসেন। আলেমুল্লাহর কানে কানে বলেন, ‘যা করার হিসাব করে করিস। একটাও বেশি যাতে না হয়। সব আমার বাড়ির লোক। বলিস, পরিবারপ্রতি যেন দুলাখ করে দেয়।’

‘আমাদের জন্য কিছু ধরে নিলে হইতো না?’ আলেমুল্লাহ জিজ্ঞাসা করে।

‘ওই তো, এক লাখ করে বিলি করবি।’

‘ও, তাইলে ঠিক আছে।’ বলে আলেমুল্লাহ পা বাড়ায়।

‘আর দেখিস যাতে কষ্ট কম হয়, সব আমার আত্মীয়স্বজন।’

Read full story at source