শিল্পকারখানায় আবার গ্যাসের তীব্র সংকট

· Prothom Alo

নরসিংদীর গ্যাস-সংকট পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অনেক শিল্পকারখানা এখনো উৎপাদনে ফিরতে পারেনি। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট আবার তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাতে পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

একাধিক শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা জানালেন, হবিগঞ্জ ও ভোলা ছাড়া অন্য সব এলাকার বেশির ভাগ গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা কমবেশি গ্যাস-সংকটে ভুগছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শ্রমিকের বেতন ও ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারবেন না তাঁরা।

Visit bettingx.club for more information.

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের একটি টার্মিনাল দুর্ঘটনার কারণে প্রায় এক মাস ধরে দেশের শিল্পকারখানা তীব্র গ্যাস-সংকটে ভুগছে। গত শনিবার গ্যাস সরবরাহ বাড়লে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে শুরু করে। এলএনজি সরবরাহের টার্মিনাল সামিট পুরোদমে ও এক্সিলারেট এনার্জি আংশিক চালু হয়। তবে সংকট পুরোপুরি কাটার আগেই আবার পরিস্থিতি খারাপ হয়। তিন দিন ধরে সরবরাহ কমার পর গতকাল বুধবার বেলা তিনটায় কার্গো সংকটের কারণে এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সংকট আরও বাড়তে পারে।

গ্যাস-সংকটের কারণে কারখানার চাকা ঘুরছে না। এ কারণে শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য নেই। উৎপাদন বন্ধ থাকা একটি বস্ত্রকলের ভেতরে একজন নারী শ্রমিক হেঁটে যাচ্ছেন। গতকাল নরসিংদীর ঘোড়াদিয়া এলাকায়

জানতে চাইলে সিরামিক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিসিএমইএর সভাপতি মঈনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, হবিগঞ্জ ও ভোলা ছাড়া অন্য এলাকার কারখানা চলছে না। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চুপচাপ বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। এভাবে চলতে থাকলে মালিকেরা শ্রমিকের বেতন দিতে পারবে না। তাতে সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হবে।

সরেজমিন নরসিংদী

গতকাল নরসিংদী সদর ও মাধবদী এলাকার ১০টি গ্যাসনির্ভর শিল্পকারখানা ঘুরে দেখা গেছে, গ্যাসনির্ভর অধিকাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ। কয়েকটি কারখানায় গেটের ভেতর শ্রমিক-কর্মচারীদের অলস সময় পার করতে দেখা যায়।

নরসিংদী শহরের তাসফিয়া ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং মিলস কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকেরা ভেতরেই অবস্থান করছেন। মেঝেতে শত শত শাড়িকাপড় পড়ে রয়েছে। মেশিনের ভেতরেও ভেজা কাপড়।

গ্যাস-সংকটের কারণে কারখানার চাকা ঘুরছে না। এ কারণে শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য নেই। উৎপাদন বন্ধ থাকা একটি বস্ত্রকলের ভেতরে একজন নারী শ্রমিক হেঁটে যাচ্ছেন। গতকাল নরসিংদীর ঘোড়াদিয়া এলাকায়

কারখানার প্রিন্টিং মাস্টার আশুতোষ বৈষ্ণব বলেন, ‘পাঁচ দিন আগে এক দিনের জন্য গ্যাস পেয়েছিলাম। সেদিন প্রসেসের জন্য কাপড়গুলো ভেজানো হয়। তখন আবার গ্যাস চলে গেলে প্রসেস শেষ করা যায়নি। সে জন্য পাঁচ দিনেও কাপড়গুলো মেশিন থেকে নামানো সম্ভব হয়নি। কাপড়গুলো পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’

এদিকে নরসিংদীর পলাশ উপজেলার প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের শিল্পপার্কে উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাসের চাপ না থাকলেও সেদিন দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘নরসিংদী ও গাজীপুরে আমাদের ৫টি শিল্পপার্ক রয়েছে। এগুলোতে গ্যাসের চাপ বর্তমানে সন্তোষজনক পর্যায়ে আছে। উৎপাদন পুরোদমে চলছে।’

মঈনুল ইসলাম, সভাপতি, বিসিএমইএহবিগঞ্জ ও ভোলা ছাড়া অন্য এলাকার কারখানা চলছে না। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। চুপচাপ বসে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছু করার নেই। এভাবে চলতে থাকলে মালিকেরা শ্রমিকের বেতন দিতে পারবে না

জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের নরসিংদী আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক এস এম ফজলুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘নরসিংদীর শিল্পকারখানায় যতটুকু গ্যাস লাগে, তার চেয়েও বেশি লাগে ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায়। এ ছাড়া আছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। এখন সরকারের অগ্রাধিকার হচ্ছে সার ও বিদ্যুতের উৎপাদন। সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের পর যেটুকু গ্যাস অবশিষ্ট থাকছে, সেটুকু শিল্পকারখানায় দিচ্ছি।’

নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও সংকট

গাজীপুরের মাওনা এলাকায় আর্টিসান সিরামিকসের কারখানায় গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। দিনে ২২ হাজার পিস তৈজসপত্র উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে তাদের। তবে গতকাল উৎপাদন হয়েছে ৬ হাজার পিস তৈজসপত্র।

আর্টিসান সিরামিকসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম মামুনূর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, গত তিন দিনে গ্যাসের সংকট আরও বেড়েছে। আগে রাতে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও এখন সেটিও পাওয়া যাচ্ছে না। উচ্চ চাপে যেসব তৈজসপত্র পোড়াতে হয়, সেগুলো বর্তমানে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে অনেক ক্রয়াদেশ স্থগিত হয়ে গেছে।

গ্যাস-সংকটের কারণে কারখানার চাকা ঘুরছে না। এ কারণে শ্রমিকদের কর্মচাঞ্চল্য নেই। উৎপাদন বন্ধ থাকা একটি বস্ত্রকলের ভেতরে একজন নারী শ্রমিক হেঁটে যাচ্ছেন। গতকাল নরসিংদীর ঘোড়াদিয়া এলাকায়

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, দেশে দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। ৩০০ কোটি ঘনফুট হলেও মোটামুটি সব খাতে সরবরাহ ধরে রাখা যায়। যদিও স্বাভাবিক সময়ে ২৭০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করে রেশনিংয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। গত শুক্রবার বিকেলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছিল। তারপর শনিবার সন্ধ্যায় তা বেড়ে ২৪৪ কোটি ঘনফুটে পৌঁছায়। গতকাল আবার গ্যাসের সরবরাহ কমে ২১৮ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

নারায়ণগঞ্জ বিসিক শিল্প এলাকায় গ্যাসের চাপ গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে কম। এতে কাপড় ডাইং ও ফিনিংশ কারখানা চলছে না। ফলে তৈরি পোশাক কারখানার কাঁচামাল সরবরাহে ঘাটতির শঙ্কা প্রকাশ করছেন উদ্যোক্তারা।

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই দিন গ্যাসের ভালো চাপ পেয়েছিলাম আমরা। গত মঙ্গলবার দুপুর থেকে আবার গ্যাস নেই। ডাইং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ। এভাবে চললে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

Read full story at source