মেটাবোলিক সিনড্রোম ওজন স্বাভাবিক হলেও নীরবে বাড়তে পারে বড় রোগের ঝুঁকি
· Prothom Alo

আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হতে পারে, সবকিছুই ঠিক আছে। ওজনও খুব বেশি নয়। তাই হয়তো ভাবছেন, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি আপনার নেই। কিন্তু শরীরের ভেতরের গল্পটা সব সময় আয়নায় ধরা পড়ে না।
Visit betsport24.es for more information.
অনেকেরই ওজন স্বাভাবিক থাকলেও শরীরে ধীরে ধীরে তৈরি হয় এমন একটি বিপাকজনিত সমস্যা, যা একসময় ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, ফ্যাটি লিভার কিংবা কিডনির জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই অবস্থার নাম মেটাবোলিক সিনড্রোম। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এটি নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে। শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তাই অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তারা ইতোমধ্যে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
আসলে কী এই মেটাবোলিক সিনড্রোম?
এটি কোনো একক রোগ নয়। বরং কয়েকটি স্বাস্থ্য সমস্যার সমন্বয়ে তৈরি একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। যখন শরীরে একসঙ্গে একাধিক বিপাকজনিত সমস্যা দেখা দেয়, তখন সেটিকে মেটাবোলিক সিনড্রোম বলা হয়। চিকিৎসকদের মতে, নিচের পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে অন্তত তিনটি থাকলে মেটাবোলিক সিনড্রোম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কোমরের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমা
উচ্চ রক্তচাপ
খালি পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকা
ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া
ভালো কোলেস্টেরল বা এইচডিএলের মাত্রা কমে যাওয়া
একটি সমস্যা হয়তো খুব বড় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু কয়েকটি সমস্যা একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে শরীরের ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি পড়ে।
কেন বাড়ছে এই সমস্যা?
আজকের জীবনযাত্রাই মেটাবোলিক সিনড্রোমের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি।
সকালে বের হয়ে দিনের বড় একটি সময় অফিসের ডেস্কে বসে কাটানো, হাঁটার সুযোগ কমে যাওয়া, লিফট ব্যবহারের অভ্যাস, বাইরে তৈরি খাবার, অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, অনিয়মিত ঘুম এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ শরীরের বিপাকক্রিয়াকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। এর পাশাপাশি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যায়। তখন রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শরীরকে বেশি ইনসুলিন তৈরি করতে হয়। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয় এবং সেখান থেকেই শুরু হতে পারে মেটাবোলিক সিনড্রোম।
যেসব লক্ষণকে অবহেলা করবেন না
মেটাবোলিক সিনড্রোমের শুরুতে সাধারণত তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে শরীর কিছু সংকেত দিতে শুরু করে।
কোমরের মাপ আগের তুলনায় বেড়ে যাওয়া
প্রায়ই ক্লান্ত লাগা
রক্তচাপ বারবার বেশি পাওয়া
স্বাস্থ্য পরীক্ষায় রক্তে শর্করা বা কোলেস্টেরলের মাত্রা অস্বাভাবিক আসা
চেষ্টা করেও সহজে ওজন কমাতে না পারা
এসব পরিবর্তনকে সাধারণ বিষয় ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
নারীদের ক্ষেত্রে কেন ঝুঁকি বেশি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু শারীরিক অবস্থার কারণে নারীদের মধ্যে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে যাদের পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) রয়েছে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়েছিল অথবা যারা মেনোপজের পরের সময়ে রয়েছেন, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি।
অবহেলা করলে কী হতে পারে?
মেটাবোলিক সিনড্রোমকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। সময়মতো নিয়ন্ত্রণে না আনলে এটি নানা জটিল রোগের পথ তৈরি করে। এর ফলে হতে পারে-
টাইপ–২ ডায়াবেটিস
হৃদরোগ
হার্ট অ্যাটাক
স্ট্রোক
ফ্যাটি লিভার
কিডনির জটিলতা
রক্তনালির ক্ষতি
এক কথায়, এটি এমন একটি অবস্থা যা শরীরের একাধিক অঙ্গকে একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে ফেলে দিতে পারে।
কীভাবে নিশ্চিত হবেন?
সুখবর হলো, মেটাবোলিক সিনড্রোম শনাক্ত করতে জটিল কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকেরা সাধারণত যেসব বিষয় পরীক্ষা করেন
কোমরের মাপ
ওজন ও বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই)
রক্তচাপ
খালি পেটে রক্তে শর্করা
লিপিড প্রোফাইল
বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে অনেক আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব।
ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে
মেটাবোলিক সিনড্রোম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটুন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করুন। প্রতিদিনের খাবারে রাখুন পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, আঁশ ও প্রোটিন। কমিয়ে দিন অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয় এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের দিকেও সমান গুরুত্ব দিন। যাদের রক্তচাপ, কোলেস্টেরল বা রক্তে শর্করা ইতোমধ্যে বেশি, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করা উচিত।
বিশেষজ্ঞের কথা
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, "মেটাবোলিক সিনড্রোম হঠাৎ তৈরি হয় না। বছরের পর বছর অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ফলেই এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।"
জানেন কি?
বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন মেটাবোলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত অথবা এর ঝুঁকিতে রয়েছেন।
পেটের চর্বি যত বাড়ে, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকিও তত বাড়ে।
প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সুস্থ থাকার মানে শুধু ওজন কমানো নয়। আপনার কোমরের মাপ, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল এবং প্রতিদিনের জীবনযাপন সবকিছু মিলেই নির্ধারণ করে আপনার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য। তাই ওজন মাপার পাশাপাশি শরীরের ভেতরের এই গুরুত্বপূর্ণ সংকেতগুলোর দিকেও নজর দিন। কারণ আজকের সামান্য সচেতনতাই আগামী দিনের বড় রোগ থেকে আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
তথ্য : হাভার্ড রিসার্চ সেন্টার
ছবি: পেকজেলসডটকম