কবিতার মেরিলিন মনরো
· Prothom Alo

মেরিলিন মনরোকে মনে করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে, হাওয়ায় উড়ছে এক উর্বশীর স্কার্ট। হাজার পুরুষের স্বপ্নরমণী এই মার্কিন নায়িকা ব্যক্তিজীবনে ছিলেন বিষাদগ্রস্ত। বিষণ্নতাই কি তাঁকে কবি করে তুলেছিল? তাঁর জীবন ও কবিতা অনুসরণ করলে পাওয়া যায় এক কবির অবয়ব। আজ ৪ আগস্ট, ৬৪তম মৃত্যুদিনে সেই নামী নায়িকার ভেতরের কবির অবয়ব সন্ধান করা যাক।
তাঁর নাম বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাওয়ায় উড়ছে স্কার্ট। গাঢ় লাল রঙের লিপস্টিকের কথাও মনে হতে পারে অনেকের। কারণ, তিনি ঠোঁটে দিতেন লাল রঙের পাঁচটি শেড। আর তাঁর দিকে তাকাতে হয় কামনার দৃষ্টিতে, এমন ভাবনাও থাকতে পারে কারও কারও। কারণ, মেরিলিন মনরো পঞ্চাশের দশকে হয়ে ওঠেন পপ–সংস্কৃতির আইকন ও যৌনতার প্রতীক। গোটা বিশ্ব তাঁর সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে থাকত। তাঁর সংস্পর্শ পেতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে কত পুরুষের মন যে উতলা হয়েছিল! মেরিলিন মনরো সেই পুরুষদের কাছে শেষ না হওয়া এক উপন্যাসের নাম। কিন্তু যতটা আলো এসে পড়েছিল তাঁর ওপরে, ততটাই নিঃসঙ্গ হয়েছিলেন তিনি। ব্যক্তিগত বিষাদ ও বিষণ্নতায় হয়েছিলেন আচ্ছন্ন। এদিকে ঝলমলে আলোর ভেতর নির্জনে মাটি-জল-হাওয়া পেয়ে বেড়ে উঠেছিল তাঁর অন্য আরেকটি জীবন—মেরিলিন মনরোর কবিসত্তা। কবিতা লিখে ব্যক্তিগত বিষণ্নতার উপশম খুঁজেছিলেন এই তারকা।
Visit tr-sport.click for more information.
মেরিলিন মনরো জীবনের নানা ঘাত–প্রতিঘাত লিখে গেছেন কবিতার পঙ্ক্তিতে। প্রাসঙ্গিক কারণেই কবিতার মেরিলিন মনরোকে খুঁজতে আমাদের তাকাতে হয় তাঁর জীবনের সেই সব বাঁকের দিকে, যা ছিল অমসৃণ এবং যেগুলোই কবি করে তুলেছিল তাঁকে।
কবিতার পাশাপাশি জীবন নিয়ে বিচিত্র ভাবনাও লিখে রাখতেন মেরিলিন। ওই সব লেখা থেকে জীবন-জগৎ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। নোটবুক ও দিনপঞ্জিতে ছোট ছোট কবিতা লিখতেন তিনি। খোলা কাগজে, এমনকি কখনো হোটেলের টিস্যু পেপারেও লিখেছেন। প্রাচীন গ্রিক কবিদের মতো ছোট ছোট কবিতায় সহজ ভাষায় সরাসরি বলেছেন সত্য কথাটি। তাঁর এই কবিতা ও জীবনভাবনাগুলো সংগ্রহ করে ২০১০ সালে নিউইয়র্ক থেকে ‘ফ্র্যাগমেন্টস: পোয়েমস, ইনটিমেট নোটস, লেটারস বাই মেরিলিন মনরো’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় একটি বই। স্ট্যানলি বুচথাল ও বার্নার্ড কমেন্ট সম্পাদিত এ বইয়ে মেরিলিনের শিরোনামহীন ১৫টি কবিতাসহ একটি গান, বন্ধুদেরকে লেখা চিঠিসহ মোট ৩০টি কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলোর সব কটিই কাটাকুটিতে ভরা। বইটিতে মেরিলিনের হাতে লেখা কবিতা ও জীবনভাবনাও সংযুক্ত করা হয়েছে।
এক সাক্ষাৎকারে মেরিলিন মনরো জানিয়েছিলেন, অবসর সময়ে তিনি কবিতা পড়েন। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না করলেও কবিতাসহ সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক ছিলেন তিনি। ফিওদর দস্তয়েভস্কি, স্যামুয়েল বেকেট, আলবেয়ার কাম্যু, আন্তন চেখভ, এমিলি ডিকিনসন, সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কাহলিল জিবরান, জেমস জয়েসসহ অনেকের বই ছিল তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী।
ছোটবেলা থেকেই মেরিলিন ছিলেন ভালোবাসার কাঙাল। খ্যাতির শিখরে পৌঁছেও চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছিলেন। তাঁর আসল নাম ছিল নরমা জিন মোর্টেনসোন। কিন্তু তারকা হওয়ার পর এই নাম হারিয়ে যায়, ঠিক যেমন করে হারিয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবনের স্থিতিও।
মা–বাবার বিয়ে হয়নি, তাই জন্মের দুই সপ্তাহ পরই অন্য এক পরিবারে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল মেরিলিনকে। ৭ বছর বয়স পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। এরপর মা এসে তাঁকে নিয়ে যান। কিন্তু সে সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে একজনকে ছুরি নিয়ে তাড়া করায় তাঁর মাকে রাখা হয় মানসিক হাসপাতালে। মেরিলিনের ঠিকানা হয় এতিমখানায়, আবার কখনো কখনো কয়েকটি পরিবারে। ১২ বছর বয়সেই প্রথমবার সৎবাবা আর দ্বিতীয়বার চাচাতো ভাইয়ের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। সেখান থেকেই এই তারকার মনে পুরুষ সম্পর্কে ঘৃণা ও অবিশ্বাস জন্মে। জীবনের প্রতি চরম বিতৃষ্ণা নিয়ে মাত্র ১৯ বছর বয়সে দুবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালান মেরিলিন।
অল্প বয়সে যৌন নিপীড়ন ও আত্মহত্যার চেষ্টার কথা ধরা আছে তাঁর কবিতায়—
‘ফ্র্যাগমেন্টস: পোয়েমস, ইনটিমেট নোটস, লেটারস বাই মেরিলিন মনরো’ বইয়ের প্রচ্ছদকবিতায় বারবার তিনি বলে গেছেন নিজের কথা। না, সেভাবে কোনো রূপক-প্রতীকের ধার তিনি ধারেননি, কবি হওয়ার বাসনাও হয়তো তাঁর ছিল না। তিনি বরং শব্দের কাছে সমর্পিত হয়েছেন নিজস্ব পীড়ন থেকে বাঁচার জন্য।
যদি মরে যেতে পারতাম
—একেবারে অস্তিত্বহীন—
এখানে, কোনোখানে থাকব না আর...
কিন্তু এটা কীভাবে করব?
কোথাও না কোথাও তো থেকে যাওয়া থাকে...।
আবার মেরিলিন যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন, শৈল্পিকভাবে তা-ও তিনি বলে গেছেন পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে—
ঝলমলে আলোয় ফুটে উঠছে আমার নাম
বললাম, ‘ঈশ্বর,
কেউ এটা ভুল করে রেখেছে।’
এরপরও আলোকচ্ছটায় ভাসছিল সেই নাম
দাঁড়িয়ে পড়লাম আর বললাম, ‘মনে রেখো, তুমি তো অতটা তারকা নও।’
তবু রইল ওই নাম—উজ্জ্বল আলোয় ভাসমান।
খ্যাতির শীর্ষে থাকলেও নিজেকে কখনো আলোঝলমলে দুনিয়ার তারকার মতো অনুভব করতে পারেননি এই মার্কিন সেলিব্রিটি। তিনি মনে করতেন, ‘বাস্তবে’ তারকা বলে কিছু নেই। আমরা যাকে ‘খ্যাতি’ বলি, তা নিছক বিভ্রম—মেরিলিনের কবিতাটি অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়।
কবিতায় বারবার তিনি বলে গেছেন নিজের কথা। না, সেভাবে কোনো রূপক-প্রতীকের ধার তিনি ধারেননি, কবি হওয়ার বাসনাও হয়তো তাঁর ছিল না। তিনি বরং শব্দের কাছে সমর্পিত হয়েছেন নিজস্ব পীড়ন থেকে বাঁচার জন্য। তবে নিজের লেখা কোথাও প্রকাশ না করলেও ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে দেখাতেন মেরিলিন, তাঁদের মতামত নিতেন। জনপ্রিয় আলোকচিত্রী ও প্রযোজক মিল্টন গ্রিন, মার্কিন কবি কার্ল স্যান্ডবার্গ ও নরম্যান রোস্টেনকে তাঁর কবিতা পড়তে দিতেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে নরম্যান রোস্টেন বলেছিলেন, ‘তিনি প্রায় সময় আমাকে কাগজে ছোট ছোট লেখা পড়তে দিতেন। বলতেন, “আপনি কি মনে করেন এটি কবিতা?” আবার অনেক সময় সমালোচনার জন্য ডাকযোগে লেখা পাঠাতেন। তাঁকে সব সময় উৎসাহ দিতাম আমি। তাঁর ভেতরে গোপনে একজন কবির বাস ছিল।’
মেরিলিনের প্রথম বিয়ে হয় ১৯৪২ সালে, ১৬ বছর বয়সে। সে সময় যে বাড়িতে তিনি দত্তক ছিলেন, তারা ওই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু মেরিলিন তাদের সঙ্গে যাক, তারা তা চাইছিল না। তারা তাঁকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। আর এতিমখানায় যেন যেতে না হয়, এ জন্য বিয়েতে রাজি হন মেরিলিন। বিয়ের পর স্কুলের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় তাঁর। চলে যান স্বামী জিম ডগার্টির বাড়ি। বিয়ের এক বছর পরই যুদ্ধে চলে যান জিম। মেরিলিন কাজ নেন বিমানবাহিনীর কারখানায়।
মার্কিন মেয়েরা নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন করতে একদিন ওই বিমানবাহিনীর কারখানায় এলেন পরিচালক আর আলোকচিত্রীর দল। মেরিলিনকে তাঁরা মডেল করে ছবি তুলতে চাইলেন। এ কাজ করলে যেহেতু কিছু টাকাকড়ি মিলবে, তাই রাজি হলেন মেরিলিন। এর কিছুদিনের মধ্যেই মডেল হিসেবে কাজ শুরু করে মেরিলিন ছেড়ে দিলেন কারখানার কাজ। এরই মধ্যে যুদ্ধ থেকে ফিরলেন জিম। মেরিলিন মডেলিং করছেন, এটা তাঁর পছন্দ হলো না। তিনি শর্ত দিলেন—হয় ক্যারিয়ার, নয় পরিবার। এদিকে সে সময় প্রযোজকেরাও খুঁজছিলেন একজন ‘সিঙ্গেল’ মেয়ে। অগত্যা ক্যারিয়ারই বেছে নিলেন মেরিলিন।
‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’ ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্যতাঁর জীবনের ট্র্যাজেডিই ছিল একার সন্ন্যাস। বারবার সংসার ভেঙে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। আর এ হতাশা শব্দে শব্দে প্রস্ফুটিত হয়েছে মেরিলিনের কবিতায়ও
১৯৪৬ সালের আগস্টে তিনি যোগ দিলেন ‘টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স’ স্টুডিওতে। এখানেই তাঁকে সিনেমার জন্য নিজের নাম বেছে নিতে বলা হয়। অনেক নামের পর শেষ পর্যন্ত নাম ঠিক হয় মেরিলিন মনরো। আর এ নামের আড়ালে চিরকালের মতো হারিয়ে যায় তাঁর নরমা জিন মোর্টেনসন নামটি।
১৯৫৪ সালের জানুয়ারিতে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসেন মেরিলিন। এবারের স্বামী বেসবল খেলোয়াড় জো ডিম্যাজিও। এ বিয়েও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র আট মাসের মাথায় ভেঙে যায়। এ বিয়ের পরপরই টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স থেকে ‘দেয়ারস নো বিজনেস লাইক শো বিজনেস’ ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পান তিনি। এ চলচ্চিত্রের শুটিং নিয়ে কী হয় না হয়, তা নিয়ে ঈর্ষান্বিত ছিলেন জো। এসব দেখাতে মেরিলিন একদিন জোকে নিয়ে যান স্টুডিওতে। সেদিন ছিল ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’ ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্যের অভিনয়—বাতাসে উড়ছে মেরিলিনের স্কার্ট। এ দৃশ্য দেখেই বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন জো। তবে বিচ্ছেদ হয়ে গেলেও তাঁরা দুজন ভালো বন্ধু হয়েছিলেন। এই বন্ধুত্বের উপলব্ধি থেকেই কি মেরিলিন লিখেছিলেন—
প্রায়ই কোনো একজনের সঙ্গে থাকাটাই যথেষ্ট।
দরকার নেই তাকে স্পর্শ করার
এমনকি কথা বলারও
দুজনের মাঝে একটি অনুভূতি ছড়িয়ে পড়বে
জেনো, তুমি একা নও।
কিন্তু তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডিই ছিল একার সন্ন্যাস। বারবার সংসার ভেঙে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। আর এ হতাশা শব্দে শব্দে প্রস্ফুটিত হয়েছে মেরিলিনের কবিতায়ও—
সত্যিই কোনো একজনের
স্ত্রী হওয়ার বিষয়ে
থেকেছি সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত!
এমন ধারণাই রেখেছি মনে,
জেনেছি এ জীবন ছেনে ছেনে—
প্রকৃত অর্থে একজন
কখনোই ভালোবাসতে পারে না
আরেকজনকে...
আবার প্রেম ও প্রেমিক সম্পর্কে নিজের উপলব্ধিও মনরো ধারণ করেছেন কাব্যগন্ধে—
তোমাকে ভালোবাসতে পারতাম
এমনকি সে কথা বলতেও পারতাম
কিন্তু তুমি চলে গেছ;
ফিরে এসেছ যখন
দেরি হয়ে গেছে ঢের
তত দিনে প্রেম শুধু বিস্মৃত শব্দ হয়ে গেছে
মনে পড়ে তোমার?
শান্তিকামী—সে যদি দৈত্যও হয়, তাকেই চেয়েছিলেন মেরিলিন। আর চেয়েছিলেন সন্তান। জো ও আর্থারের সঙ্গে বিবাহিত জীবনে তিনি বারবার মা হতে চেয়েছেন। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ আর মদ্যপানের জন্য তা পারেননি। আর্থার মিলারের সঙ্গে বিয়ের পর একবার সন্তানসম্ভবা হয়েছিলেন, কিন্তু গর্ভপাত ঘটে যায়। এরপর আরও বেশি বিষণ্নতা গ্রাস করে তাঁকে।
কবিতায় যেভাবে ভালোবাসার জন্য হাহাকার করেছেন, ব্যক্তিজীবনেও তেমনি অসংখ্যবার অনেককেই মেরিলিন বলতে চেয়েছেন, ‘ভালোবাসা দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?’ প্রথম দেখার ছয় বছর পর ১৯৫৬ সালে মার্কিন নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক আর্থার মিলারের সঙ্গে বিয়ে হয় মেরিলিনের। অন্য দুই বিয়ের চেয়ে এ বিয়ের আয়ু বেশি হলেও এখানেও সুখের দেখা মেলেনি। ‘এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না...’—মেরিলিনের ভালোবাসার গল্পটা আদতে রবীন্দ্রনাথের গানের মতোই। ফলে ১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে এ ঘরও ভেঙে গেল। এর আগে আর্থার মিলারের একটি দিনপঞ্জি খুঁজে পান মেরিলিন। মিলার সেখানে লিখেছিলেন, মেরিলিনের জন্য প্রায়ই তিনি বিব্রত হন। তাঁর কারণে তিনি হতাশ।
প্রিয়জনের এ লেখা দেখে খুব কষ্ট পান মেরিলিন। ঝগড়া শুরু হয় দুজনের। মেরিলিনের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটল। তীব্র বিষণ্নতা কাটানোর জন্য এ সময় ওষুধ খাওয়া শুরু করেন উড়ন্ত স্কাটের এই মার্কিন নায়িকা। তবে শুধু কি ঘুমের ওষুধ, কবিতাও এ সময় তাঁর দাওয়াই হয়েছিল—
পিচকালো পর্দায় আসে
হয় আবির্ভূত—
দানবীয় সব অবয়ব
আমার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী তারা...
পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে,
ওহ শান্তি, এখন তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন,
এমনকি তুমি শান্তিকামী দৈত্য হলেও।
শান্তিকামী—সে যদি দৈত্যও হয়, তাকেই চেয়েছিলেন মেরিলিন। আর চেয়েছিলেন সন্তান। জো ও আর্থারের সঙ্গে বিবাহিত জীবনে তিনি বারবার মা হতে চেয়েছেন। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ওষুধ আর মদ্যপানের জন্য তা পারেননি। আর্থার মিলারের সঙ্গে বিয়ের পর একবার সন্তানসম্ভবা হয়েছিলেন, কিন্তু গর্ভপাত ঘটে যায়। এরপর আরও বেশি বিষণ্নতা গ্রাস করে তাঁকে। আরও বেশি মদ্যপান, আরও বেশি ওষুধ খাওয়া শুরু করেন। বেড়ে যায় কবিতা লেখাও।
১৯৫১ সালে মেরিলিনের পরিচয় ঘটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির সঙ্গে। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর প্রেমের খবরও চাউর হয়। আরও বলা হয়, কেনেডির ভাই রবার্ট কেনেডির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। এ নিয়ে জটিলতা চলছিল তাঁদের ভেতরে। তবে এর সপক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ মেলেনি। এ সময় মাদকের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মেরিলিন। তাঁকে এ জীবন থেকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন মেরিলিনের দ্বিতীয় স্বামী জো ডিম্যাজিও। এ পর্যায়ে তাঁরা ঠিক করেছিলেন, ১৯৬২ সালের ৮ আগস্ট আবার দুজনে ঘর বাঁধবেন। কিন্তু তার আগে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ৪ আগস্ট ঘরে হাতে টেলিফোনের রিসিভারসহ নগ্ন অবস্থায় পাওয়া যায় মেরিলিনের দেহ। সেদিন নিদারুণ বিষণ্ন হাওয়ায় ভেসে ভেসে যেন পাখি হয়ে গেছেন সেই নামী নায়িকা, যার ভেতরে ছিল অনামী এক কবির প্রাণ এবং যিনি মরে গিয়েও কবিতায় বলতে পেরেছিলেন জীবনের শাশ্বত কথা—
মেরিলিন মনরোর হাতে লেখা কবিতাছবিতে ফোঁটা ফোঁটা রশ্মিরযে রং দেখেছি—ওহ জীবন!ওরা তোমাকে ফাঁকি দিয়েছে।
জীবন,
তোমার দুই দিকেই টিকে আছি
হিম হওয়া হাওয়ার ভেতর
মাকড়সার জালের মতো
ঝুলে আছি নিচের দিকে
এভাবেই রয়ে গেছি
ছবিতে ফোঁটা ফোঁটা রশ্মির
যে রং দেখেছি—
ওহ জীবন!
ওরা তোমাকে ফাঁকি দিয়েছে।
সূত্র: ফ্র্যাগমেন্টস: পোয়েমস, ইনটিমেট নোটস, লেটারস বাই মেরিলিন মনরো; বিবিসি; দ্য প্যারিস রিভিউ ও দ্য হাইপারটেক্সট