নবাগত পানিজুঁই ফুল 

· Prothom Alo

পরপর তিন বছর তিনটি এপ্রিলেই দেখা পেলাম পানিজুঁই ফুলের, এর আগে কখনো দেখিনি। তাতে মনে হলো, এ ফুল এ দেশে সম্প্রতি এসেছে। বইপত্রে ও দেশের উদ্ভিদের তালিকাতেও এর নাম এখনো যুক্ত হয়নি। কিন্তু অনেক দেশেই ফুলটি বাগানপ্রেমীদের বেশ নজর কেড়েছে। এ দেশেও মনে হচ্ছে গাছটি ছড়িয়েছে।

প্রথম দেখি একে ২০২৪ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার টোকে। সেখান থেকে প্রবীণ ভেষজ চিকিৎসক ও প্রকৃতিবন্ধু সুধান দাশ খবর দিয়েছিলেন তাঁর বাড়ির বাগানে বেশ কিছু নতুন গাছ আছে, যেগুলো নাকি আমি অন্য কোথাও সহজে পাব না। সেগুলোর মধ্যে ফ্রায়েড এগ ট্রি, স্বর্ণজুঁই, পার্সিয়ান জুঁই ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ফুলগুলো বৈশাখেই ফোটে। তাই এপ্রিলের এক সকালেই রওনা দিলাম সে বাড়ির উদ্দেশে।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

সুধান দাদার বাড়িটা আসলেই যেন এক কবিরাজি গাছের বাগান, নানা রকম ঔষধি গাছের আখড়া। এগুলোর মধ্যে কিছু আলংকারিক ও ফুলের গাছও আছে। আছে বিশাল দুটি নাগলিঙ্গমগাছ। তাতে মনে হলো, তিনি অনেক দিন ধরেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে গাছপালা সংগ্রহ করে বিশাল বাড়ির বাগানে লাগাচ্ছেন। সত্যিই সেই পার্সিয়ান জুঁই ফুলগাছের রূপে ও গন্ধে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার চেয়ে বেশি উচ্চতায় ডাল ভরে ফুটেছে অজস্র ফুল, নোলকের মতো ডাল থেকে ফুলগুলো থোকা ধরে ঝুলে রয়েছে। জুঁই ফুলের মতোই সাদা, ছোট ও তীব্র ঘ্রাণযুক্ত।

পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের এপ্রিলে একই গাছ দেখলাম মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামে। উদ্ভিদ সংগ্রাহক তানভীর আহম্মেদ বলেছিলেন, বছর দুয়েক আগে তিনি প্রবেশপথের ধারে এ গাছটি লাগিয়েছিলেন। এর মধ্যেই মাথার ওপর ছাতার মতো ডালপালা মেলে ছেয়ে গেছে। কচি পাতা আর ফুলে যেন মাখামাখি চলছে। 

এর পরের বছর এপ্রিলে এ ফুলের দেখা পেলাম রমনা উদ্যানের নার্সারির মধ্যে একটি গাছে। সেটি চারার মতো ছোট গাছ, অল্প কয়েকটা ফুল ফুটেছে। ফুলটা ভালো লেগেছিল, কিন্তু ওই পার্সিয়ান জুঁই নাম ভেবেই বসে ছিলাম। 

অবশেষে এ বছর রমনা উদ্যানের ফুল দেখে মনে পড়ল, এ ফুল নিয়ে তো ঘেঁটে দেখিনি, লেখাও হয়নি। তথ্য ঘাঁটতে গিয়ে ওর পার্সিয়ান জুঁই নামটা পেলাম না, পেলাম তার ইংরেজি নাম ওয়াটার জেসমিন। প্রকৃতিবন্ধু আরিফুল হক বোধ হয় এই ইংরেজি নামটা দেখেই তাঁর ছাদবাগানে ফোটা এ ফুলের নামটা জলজুঁই নামে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন। জলজুঁই বা পানিজুঁই—যেটাই হোক, মনে হয় নামটিকে আমরা বাংলা নাম হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।

পানিজুঁই পালাম ফুলের গণ ও একই গোত্রের গাছ, প্রজাতিগত নাম Wrightia religiosa, গোত্র অ্যাপোসাইনেসি। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ রিলিজিওসা এসেছে এর ধর্মীয় গুরুত্ব থেকে। কেননা চীন ও ভিয়েতনামে এ গাছটি বৌদ্ধ উপাসনালয়ে লাগিয়ে ছেঁটে প্যাগোডার মতো আকৃতি দেওয়া হয়, বনসাই করে রাখা হয়।

 পানিজুঁই বহুবর্ষজীবী গুল্ম প্রকৃতির গাছ। না ছেঁটে বাড়তে দিলে গাছ ৬ থেকে ৭ মিটার লম্বা হয়। বাকল মসৃণ ও ধূসর, শিকড় মাটিতে ভেসে ভেসে ছড়ায়। শীতকালে গাছের বেশ পাতা ঝরে। এ জন্য একে আধা পত্রঝরা প্রকৃতির গাছ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বসন্তে নতুন পাতায় গাছ ভরে যায় ও গ্রীষ্মের শুরু থেকে ফুল ফোটে। বসন্তে পাতা গজানোর আগে অর্থাৎ শীতের শেষ দিকে গাছ ছাঁটা যায়। বিশেষ করে আমাদের দেশের আবহাওয়ায় বনসাই করতে হলে বছরে কয়েকবার ছেঁটে দেওয়া যায়। এ গাছের বনসাই ও সুন্দর শাখা-প্রশাখা তৈরির জন্য ডালে কয়েক জোড়া পাতা গজানোর পর ডালপালাকে ছেঁটে ছেঁটে এক জোড়া পাতা পর্যন্ত ছোট করে দেওয়া যায়। প্রতিটি ডালে তৃতীয় পাতা জোড়া গজানোর পর সাধারণ কুঁড়ি আসে ও ফুল ফোটা শুরু হয়। কচি ডালপালাকে সুন্দর গড়ন দেওয়ার জন্য সেগুলো জিআই তার দিয়ে বেঁধে দেওয়া যায়। তবে ডালের বাকল শক্ত হওয়ার আগেই ও ডালের আকৃতি ঠিক হয়ে যাওয়ার পরই তারগুলো সরিয়ে ফেলতে হয়। পানিজুঁইয়ের আদিনিবাস চীন, ইন্দোচীন ও মালয়েশিয়া।

Read full story at source