স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার কি শরীরের গড়ন বদলে দিচ্ছে

· Prothom Alo

দৈনন্দিন জীবনের বড় একটি অংশ এখন কাটছে স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের পর্দার সামনে। কাজ, যোগাযোগ, কেনাকাটা থেকে বিনোদন প্রায় সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। তবে এর প্রভাব কেবল মানসিক স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে শরীরেও নানা পরিবর্তন ঘটছে। এর মধ্যে রয়েছে ঘাড় ও মেরুদণ্ডের গঠনে পরিবর্তন, দৃষ্টিশক্তির অবনতি, হাতের শক্তি কমে যাওয়া এবং হাত-চোখের সমন্বয় দক্ষতার অবনতি।

Visit syntagm.co.za for more information.

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের কিছু দীর্ঘ মেয়াদে আরও জটিল শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে জীবনযাপনে কয়েকটি ছোট পরিবর্তন আনলে এ ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

টেক নেকের ঝুঁকি

স্মার্টফোন ব্যবহারের সময় বেশির ভাগ মানুষই মাথা নিচু করে দীর্ঘক্ষণ পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ ভঙ্গিকে বলা হয় ‘ফরোয়ার্ড হেড পোশ্চার’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে থাকলে ঘাড়ের ওপর প্রায় ২৭ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন এ অভ্যাস বজায় থাকলে মেরুদণ্ডের ডিস্ক, পেশি ও অস্থিসন্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি ফুসফুসের কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে। এ সমস্যাকে অনেকেই ‘টেক নেক’ নামে চেনেন।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বছরের পর বছর একই ভঙ্গিতে স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক গঠনেও স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে ফোন বা কম্পিউটারের পর্দা যতটা সম্ভব চোখের সমতলে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর স্ক্রিন থেকে বিরতি নেওয়াও জরুরি।

ঘাড়ে বলিরেখা, ত্বকেও সমস্যা

‘টেক নেক’ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি আলোচনা সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘাড়ে বলিরেখা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ বিষয়ে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। একই ধরনের ভাঁজ বা চাপ দীর্ঘদিন ধরে পড়লে ত্বকে বলিরেখা তৈরি হতে পারে, তবে স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় স্মার্ট ওয়াচ পরে থাকলেও ত্বকে সমস্যা দেখা দিতে পারে। ঘড়ির নিচের অংশে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সেখানে চুলকানি, ত্বকের প্রদাহ বা একজিমার ঝুঁকি বাড়ে। তাই নিয়মিত স্মার্ট ওয়াচ খুলে ত্বক পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাড়ছে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা

বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে মায়োপিয়া বা দূরের বস্তু ঝাপসা দেখার সমস্যা। অনেকেই এর জন্য স্মার্টফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল যন্ত্রের অতিরিক্ত ব্যবহারকে দায়ী করেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কাছের কোনো বস্তুর দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার সঙ্গে মায়োপিয়ার সরাসরি সম্পর্ক খুব স্পষ্ট নয়। যাঁরা নিয়মিত বাইরে সময় কাটান, তাঁদের মধ্যে এ সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক কম। গবেষকদের ধারণা, প্রাকৃতিক আলোর প্রভাবে চোখের বিকাশে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে, যা দৃষ্টিশক্তি সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন মানুষকে ঘরের ভেতরে আরও বেশি সময় কাটাতে অভ্যস্ত করে তুলছে। আর এ কারণেই পরোক্ষভাবে দৃষ্টিশক্তির সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই প্রতিদিন কিছু সময় খোলা পরিবেশে কাটানোর পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা। তবে বাইরে বের হলে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থাও নিতে হবে।

কমছে হাতের শক্তি

গবেষকদের মতে, হাতের মুঠির শক্তি মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, হাতের শক্তি কমে যাওয়া ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। উদ্বেগের বিষয় হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে হাতের মুঠির শক্তি কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপনের কারণে মানুষের সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতা কমছে, যার প্রভাব পড়ছে হাতের শক্তির ওপরও। তাই নিয়মিত শরীরচর্চা, হাত ও কবজির ব্যায়াম এবং সক্রিয় জীবনযাপনের ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা।

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মোটর স্কিল

অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে মানুষের মোটর স্কিল বা সূক্ষ্ম নড়াচড়ার দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে বেশি স্ক্রিন ব্যবহারের সঙ্গে মোটর স্কিল কমে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এ দক্ষতার সঙ্গে শিশুদের জ্ঞানীয় ও শিক্ষাগত বিকাশেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। দৈনন্দিন জীবনে হাতে-কলমে কাজের পরিমাণ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রান্না করা, ছবি আঁকা, বাদ্যযন্ত্র শেখা, হাতে লেখা কিংবা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে অংশ নেওয়া হাতের দক্ষতা ও সমন্বয় ক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

Read full story at source