নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ের সঠিক উপায়

· Prothom Alo

মানুষ সাধারণত যা পায় না, তা নিয়েই বেশি চিন্তা করে। অপূর্ণতা, অভাব কিংবা অপ্রাপ্তিই যেন তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। অথচ জীবনের দিকে গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, মহান আল্লাহ অসংখ্য নেয়ামতে আমাদের ঘিরে রেখেছেন।

সুস্থতা, নিরাপত্তা, রিজিক, জ্ঞান এবং সর্বোপরি ইমান—এসব এমন অমূল্য সম্পদ, যার প্রকৃত মূল্য আমরা অনেক সময় উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হই।

Visit mchezo.co.za for more information.

ইসলাম আমাদের শেখায়, এসব নেয়ামত কেবল ভোগ করলে চলবে না; বরং এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও জড়িত। আর তা হলো শোকর বা কৃতজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতা ছাড়া নেয়ামতের প্রকৃত অর্থ পূর্ণতা পায় না এবং তা বরকতশূন্য হয়ে যেতে পারে।

কৃতজ্ঞতার প্রকৃত ধারণা

আমরা সাধারণত মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলাকেই পূর্ণ কৃতজ্ঞতা বলে ধরে নিই। অথচ ইসলামে কৃতজ্ঞতার ধারণা আরও ব্যাপক।

প্রকৃত কৃতজ্ঞতা হলো, আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা। জ্ঞান অর্জন করলে মানুষের কল্যাণে তা কাজে লাগানো, সম্পদ পেলে অভাবগ্রস্তদের সাহায্য করা, ক্ষমতা পেলে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং সুস্থতা পেলে ইবাদত ও সৎকর্মে সময় ব্যয় করা—এসবই কৃতজ্ঞতার বাস্তব প্রকাশ।

নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায়ে ৬টি লাভ

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.) এ বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা জিহ্বায় তাঁর প্রশংসা ও স্বীকৃতি, হৃদয়ে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও উপলব্ধি এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গে তাঁর আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।’ (তাহজিবু মাদারিজিস সালিকিন: পৃ. ৩৮৪)

নবীজি (সা.)-এর জীবনে কৃতজ্ঞতা

রাসুল (সা.) ছিলেন কৃতজ্ঞতার সর্বোত্তম উদাহরণ। তিনি রাতের দীর্ঘ সময় নামাজে কাটাতেন এবং ইবাদতে নিজেকে নিবেদিত রাখতেন।

একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহ তো আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের সব ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন, তবু আপনি এত ইবাদত করেন কেন? জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১১৩০)

এই সংক্ষিপ্ত উত্তরেই কৃতজ্ঞতার প্রকৃত তাৎপর্য ফুটে ওঠে। রাসুল (সা.) ইবাদতকে শুধু দায়িত্ব হিসেবে নয়; বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখতেন।

কৃতজ্ঞতা হৃদয়ে শান্তি আনে

যে ব্যক্তি সব সময় অভিযোগ ও অপ্রাপ্তির হিসাব করে, তার মনে অস্থিরতা ও হতাশা বাড়তে থাকে। বিপরীতে কৃতজ্ঞ মানুষ অল্পের মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পায়। কারণ, সে বিশ্বাস করে, প্রতিটি নিয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুগ্রহ।

কৃতজ্ঞতা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে ইতিবাচক করে তোলে। তখন সে সমস্যার মধ্যেও সম্ভাবনা দেখতে শেখে এবং সংকটের মধ্যেও আল্লাহর রহমতের আশা রাখে। এর ফলে তার হৃদয়ে প্রশান্তি সৃষ্টি হয় এবং মানসিক স্থিরতা আসে।

যে ১০ কারণে আত্মার মৃত্যু হয়

বিপদেও কৃতজ্ঞ থাকা

প্রকৃত মুমিন শুধু সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ই নয়; কঠিন সময়েও আল্লাহর ওপর আস্থা রাখেন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন, আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালার মধ্যেই কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের অবস্থা কতই না বিস্ময়কর! তার প্রতিটি বিষয়ই কল্যাণকর। সুখ পেলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়; আর দুঃখ-কষ্টে পতিত হলে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে তা–ও তার জন্য কল্যাণকর হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৯৯)

কৃতজ্ঞতার প্রতিদান

বান্দার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো তার রবের ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি লাভ করা। আর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা এই মহান অর্জনের অন্যতম পথ। পাশাপাশি এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও আরও বেশি নেয়ামত লাভেরও অনন্য মাধ্যম।

আল্লাহ-তায়ালা বলেন, ‘আমি অচিরেই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেব।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৪৫)

অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)

এ আয়াতে ‘বৃদ্ধি’ বলতে কেবল সম্পদ নয়; বরং তা হতে পারে বিপদ দূর হওয়া, অন্তরের প্রশান্তি, ইমানের দৃঢ়তা এবং নিয়ামতের বরকত ও স্থায়িত্ব।

  • রায়হান আল ইমরান : লেখক ও গবেষক

বিপদে মুমিনের প্রথম করণীয় কী

Read full story at source