ধূসর এক বিষাদ-স্মৃতি

· Prothom Alo

যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে চুপি চুপি একটি বেফাঁস কথা বলি। ছোটবেলায় কোরবানির ঈদকে আমার রোজার ঈদের মতো মনে হতো না। কারণ ত্রিবিধ। এক. রোজার ঈদের মতো কোরবানির ঈদের আগের সন্ধ্যায় ‘চাঁদরাত’ নেই, নেই চাঁদ দেখার উত্তেজনা এবং সেই অমর গান, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ।’ দুই. অন্য পরিবারের কথা জানি না, আমাদের পরিবারে রোজার ঈদের মতো কোরবানির ঈদে নতুন জামাকাপড় জুটত না। ফলে রোজার ঈদের মতো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে নতুন কাপড় প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা থাকত না। তিন. প্রতিবছর কোরবানির ঈদের জন্য যে অবলা প্রাণীটি আমাদের বাড়িতে আসত, তার জন্য দুঃখ আর কষ্টের একটা জলধারা আমার চোখে এবং মনে বয়ে যেত।

Visit sportnewz.click for more information.

কোরবানির ঈদ নিয়ে আমাদের ছোটবেলায় সবচেয়ে বড় উত্তেজনা ছিল কোরবানির পশু ক্রয়ের মধ্যে। ঈদের দুই সপ্তাহ আগেই বাবাকে জ্বালিয়ে মারতাম, কবে আমরা গরু কিনতে হাটে যাব। বাবা হেসে বলতেন, হাট আগে বসুক তো। বাবার এই বিলম্বের কারণ তখন বুঝতে পারিনি, এখন বুঝি। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে বাবাকে অপেক্ষা করতে হতো ঈদের বাড়তি বেতনের জন্য। এরপর যেদিন যাওয়া হতো, সেদিন আমার উত্তেজনা দেখে কে! বাড়ির জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে আমার যেন অধিকার ছিল গরু কেনার ব্যাপারে বাবার সঙ্গী হওয়ার। বাবাকে সাহায্য করতে আমাদের সঙ্গে যেতেন বাবার কলেজের সহকারী কাঞ্চন ভাই। যত আগ্রহ নিয়ে গরু কিনতে যেতাম, হাটে গিয়ে কিন্তু অত ভালো লাগত না। চারদিকে ভিড়, চিৎকার, ঠেলাঠেলি, পশুদের আর্ত-ডাক, কাদা-জল, উৎকট গন্ধ। কিন্তু তার চেয়েও খারাপ লাগত পশুগুলোর দিকে তাকিয়ে। কেন যেন ওদের আয়ত গভীর কালো চোখে আমি দুঃখের ছবি দেখতাম, ভীতির ছায়া দেখতাম, বিচ্ছেদের কষ্ট দেখতাম।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
এরপর পশুটি থিতু হতো তার জন্য নির্ধারিত জায়গায়। আর আমাদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতেন কাঞ্চন ভাই—আসতে আসতে গরুটি দুষ্টুমি করেছে কি না, দাঁড়িয়ে পড়েছিল কি না, তাঁকে গুঁতোবার চেষ্টা করেছে কি না, গলার দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কি না ইত্যাদি।

একবার মনে আছে, বিক্রি হয়ে যাওয়া একটি গরু কিছুতেই তার ক্রেতার সঙ্গে যাবে না। সে গোঁ ধরেই দাঁড়িয়ে থাকল। সকলে মিলে টানাহেঁচড়া, রশি পর্যন্ত ছিঁড়ে গেল। কিন্তু তাকে নড়ানো গেল না। তখন বিক্রেতা বৃদ্ধ চাষিটি বললেন, গরুটিকে তিনি বাছুর থেকে বড় করেছেন। পশুটি তাঁর বড় ন্যাওটা। অভাবের জন্য ওটাকে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। বলতে বলতে তাঁর চোখ জলে ভরে এল। তিনি কান্নাভেজা স্বরে ক্রেতাকে বললেন, ‘আমি এখানে থাকলে ও আপনার সঙ্গে যাবে না। আমাকে যতক্ষণ দেখবে, ততক্ষণ সে নড়বে না। আমি একটু চোখের আড়ালে চলে যাই, তখন ওকে আপনি নিয়ে যেতে পারবেন।’

এরপর কী হয়েছিল, মনে নেই, কিন্তু বৃদ্ধ চাষিটির চোখের জল, গরুটির আর্তচিৎকার এখনো আমার মনে আছে। সে কথা এখন ভাবলে শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’–এর কথা মনে পড়ে যায়।

গরু কেনা শেষে বাবা আর আমি রিকশা করে বাড়ি ফিরতাম। কাঞ্চন ভাই আমাদের গরুটিকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসতেন। বাবা বাড়িতে নেমেই বাড়ির পেছনের উঠানে গরুটির থাকার ব্যবস্থা করতেন ঘাস-পানি দিয়ে। আমি কাঁঠালগাছের ডাল ভেঙে নিয়ে আসতাম গরুকে খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু বাবা হেসে বলতেন, কাঁঠালের পাতা ছাগলে খায়, গরু খায় না। এরপর আমরা ভাইবোনেরা গরুটিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য অভ্যর্থনা কমিটির সদস্যদের মতো বাড়ির সামনের ফটকে দাঁড়িয়ে থাকতাম। একসময় গরুসহ কাঞ্চন ভাইকে দেখা যেত, পশুটিকে হাঁটিয়ে ফিরছেন তিনি। মাঝেমধ্যে ছড়ি দিয়ে আঘাত করছেন পশুটিকে দ্রুত হাঁটানোর জন্য। তাঁর নির্দয়তায় বুক ভেঙে যেত আমাদের।

এরপর পশুটি থিতু হতো তার জন্য নির্ধারিত জায়গায়। আর আমাদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতেন কাঞ্চন ভাই—আসতে আসতে গরুটি দুষ্টুমি করেছে কি না, দাঁড়িয়ে পড়েছিল কি না, তাঁকে গুঁতোবার চেষ্টা করেছে কি না, গলার দড়ি ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে কি না ইত্যাদি। স্বল্পভাষী কাঞ্চন ভাই অত কথার জবাব দিতেন না, শুধু বলতেন যে পথে পথে বহু মানুষ গরুটির দাম জিজ্ঞেস করেছে এবং তিনি প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, কারণ কোরবানির গরুর দাম জিজ্ঞেস করলে তার জবাব দিতে হয়, যেহেতু সেটা সওয়াবের কাজ।

টাকার অঙ্ক শুনে আমি হাঁ হয়ে যেতাম। নওশাদ আড়চোখে আমার মুখের ভাব দেখত আর একটা বিশেষ হাসি খেলে যেত ওর চোখে। অসমতা আর বৈষম্যের আমার প্রথম একটি পাঠ ওই কোরবানির ঈদেই। সে কথা মনে হলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার ওই লাইনটির কথা ভাবি, ‘বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও…।’

সবকিছু শান্ত হলে মা আসতেন গরু দেখতে। তিনি এসে গরুটির পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন, ওর গলকম্বলে আদর করতেন। গরুটি আয়তচোখে মায়ের দিকে তাকাত, চোখ বুজে জাবর কাটতে কাটতে সে আদর নিত। মা কাঞ্চন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলতেন, ‘খুব ভালো কিনেছ তোমরা, কাঞ্চন।’ বাবার দিকে আমার চোখ যেত। তাঁর সারা মুখে একটি পরিতৃপ্তি খেলা করত। মনে হতো, মায়ের মুখ থেকে এ কথাটুকু  শোনার জন্যই এতক্ষণ তিনি অপেক্ষা করছিলেন। গরুটির একটি নাম রাখতে আমার ছোট ভাই আবদার করত, কিন্তু মা শান্ত কণ্ঠে বলতেন, ‘না, মায়া পড়ে যাবে। মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই।’

সেদিন মাকে বড় নির্মম মনে হয়েছিল, কিন্তু আজ বুঝি, কতটা সংবেদনশীল ছিলেন তিনি।

এর মধ্যেই আমার বন্ধু পাশের বাড়ির নওশাদ এসে যেত আমাদের গরু দেখতে। ওর প্রথম কথাই হতো, ‘তোদের গরু তো খুব ছোট রে। চল্, আমাদেরটা দেখাই। তোদেরটার চেয়ে অনেক বড়।’

ওর কথায় খুব দুঃখ পেতাম, মনটা ছোট হয়ে যেত। আমার মলিন মুখের তোয়াক্কা না করে নওশাদ আমাকে টানতে টানতে নিয়ে যেত ওদের বাড়ির প্রাঙ্গণে। ওদের গরু দেখে অবাক হয়ে যেতাম আমি—বিশাল এক প্রাণী।

‘বলেছিলাম না, আমাদের গরু তোদের চেয়ে কত বড়? কত টাকায় কিনেছি জানিস?’

টাকার অঙ্ক শুনে আমি হাঁ হয়ে যেতাম। নওশাদ আড়চোখে আমার মুখের ভাব দেখত আর একটা বিশেষ হাসি খেলে যেত ওর চোখে। অসমতা আর বৈষম্যের আমার প্রথম একটি পাঠ ওই কোরবানির ঈদেই। সে কথা মনে হলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতার ওই লাইনটির কথা ভাবি, ‘বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও…।’

এরপর আসত ঈদের আগের দিনের সন্ধ্যা। সন্ধ্যার ধূসর এক ছায়ায় প্রাণীটির সামনে দাঁড়াতাম। তাকাতে পারতাম না ওর দিকে। একটা অজানা কষ্টে এবং অপরাধবোধে ভরে যেত মন। আমার ছোট মনে ভাবনা জাগত, আচ্ছা, ও কি জানে, আজই ওর জীবনের শেষ রাত্রি? কী ভাবছে প্রাণীটি এই মুহূর্তে? আমার দুচোখ জলে ভরে যেত।

পরের কদিন আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে যেত কে কতটা ক্রীত প্রাণীটির যত্ন নিতে পারে। আমাদের সব যত্ন ছিল গরুটিকে খাওয়ানো নিয়ে। কাঞ্চন ভাই ওটিকে নিয়মিত খাবার দিতেন। তবু আমরা প্রত্যেকে আলাদাভাবে চুরি করে গরুটিকে খাবার দিতাম। ফলে কিছু সময়ের মধ্যেই ওর সামনে অতিরিক্ত খাবার জমে যেত। কাঞ্চন ভাই সহজেই আমাদের অপকর্ম ধরে ফেলতে পারতেন। বকা খেতাম আমরা এবং সেই সঙ্গে তিনি ভয় দেখাতেন যে বেশি খেলে গরু অসুস্থ হয়ে পড়বে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? আমাদের দুষ্কর্ম চলতেই থাকত।

এরপর আসত ঈদের আগের দিনের সন্ধ্যা। সন্ধ্যার ধূসর এক ছায়ায় প্রাণীটির সামনে দাঁড়াতাম। তাকাতে পারতাম না ওর দিকে। একটা অজানা কষ্টে এবং অপরাধবোধে ভরে যেত মন। আমার ছোট মনে ভাবনা জাগত, আচ্ছা, ও কি জানে, আজই ওর জীবনের শেষ রাত্রি? কী ভাবছে প্রাণীটি এই মুহূর্তে? আমার দুচোখ জলে ভরে যেত। সন্ধ্যা একটু ঘন হয়ে এলে মা এসে দাঁড়াতেন। নিজের হাতে খাওয়াতেন পশুটিকে। কোনো কোনো সময়ে মনে হতো, তাঁর চোখেও জল চিক চিক করত। এত বছর পরেও মায়ের সেই সজল চোখ আমি ভুলতে পারিনি।

Read full story at source