ডালাস মঞ্চে জ্বীন কফিল নিয়ে হাজির হচ্ছেন মিসির আলী

· Prothom Alo

হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন একজন স্বপ্ন কারিগর। একজন দক্ষ জাদুকর।

গল্পবুননের জাদুতে মুগ্ধ করার মাধ্যমে তিনি নিজের স্বপ্নটা তাঁর পাঠকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন।

Visit newssport.cv for more information.

শৈশবে হুমায়ূন পড়ার দশা এই হলো যে একটা সময়ে নিজেকেও সৃষ্টিশীল ভাবতে শুরু করলাম।

লেখালেখি, অভিনয়, নাটক—কিছু না কিছুর সঙ্গে যুক্ত না থাকতে পারলে কেমন দম বন্ধ দম বন্ধ বোধ হয়। নেশাগ্রস্ত মানুষ যেমন নেশাদ্রব্য না পেলে অস্থির থাকে, আমারও একই হাল হলো।

সেই তাড়না থেকেই সৃষ্টি হলো রঙ্গমঞ্চের।

আমাদের নিজস্ব থিয়েটার।

আমাদের মতো করে দেখা স্বপ্নগুলো দর্শকের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস।

এর আগেও আমরা মঞ্চনাটক করতাম। বড় বড় নাট্যকারের লেখা স্ক্রিপ্টে বড় বড় নির্দেশকের দেওয়া নির্দেশনায় কাগজে লেখা চরিত্রগুলোকে প্রাণ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেগুলো ছিল অন্যের স্বপ্ন, অন্যের পরিকল্পনা। এবার থাকবে আমাদের একান্ত স্বাধীনতা।

রঙ্গমঞ্চের প্রথম পরিবেশনা কী হতে পারে?

মন থেকে আওয়াজ এলো হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট কিছুই হওয়া উচিত।

যে ব্যক্তিটি আমাদের স্বপ্ন দেখার কৌশল শিখিয়েছেন, তাঁকে গুরুদক্ষিণা প্রদান।

গুরুকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিয়েই হোক আমাদের যাত্রা শুরু।

এরপর যাকে নিয়ে যা খুশি করি করা যাবে, কিন্তু শুরুটা হোক হুমায়ূন আহমেদকে দিয়েই।

তারপরে প্রশ্ন এলো, তাঁর কোন সৃষ্টিকে নিয়ে নাড়াচাড়া করব? শ খানেক টিভি নাটক আছে, দুই শতাধিক গল্প উপন্যাস আছে, তাঁর নিজের লেখা একাধিক মঞ্চনাটকও আছে। একটি নাটক তো আমরাই করেছিলাম, ‘১৯৭১’—দারুণ দর্শকসমাদৃত হয়েছিল। নাটক শেষে পুরো দর্শকসারি উঠে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিল। হাততালি আর চোখের পানি থামছিল না। সেটাই কি আবার মঞ্চে আনা হবে? আবারও একই জাদু তৈরি করা সম্ভব হবে?

এক রাতে হঠাৎ মাথায় এলো—কেন না ‘জ্বিন কফিল’কেই নাট্যরূপ দেওয়া যাক।

ব্যক্তিগতভাবে হুমায়ূন সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে মিসির আলী আমার সবচেয়ে প্রিয়তম চরিত্র। বাচ্চাদের সুপারহিরো হয় ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, আয়রনম্যান—আমার সুপারহিরো ছিলেন এবং আছেন মিসির আলী। তা ছাড়া তাঁকে নিয়ে তেমন কাজ হয়নি কোথাও। আমরাই নাহয় শুরুটা করি।

‘জ্বিন কফিল’ গল্পটাকে বেছে নিলাম।

কেন নিলাম, সেই গল্প অন্য দিন বলা যাবে।

রাত দশটায় নাট্যরূপ দিতে বসলাম।

রাত বাড়ে, আমার হাতের গতিও বাড়ে। চোখের সামনে চরিত্রগুলো দেখতে পারছি, ওরা হারিয়ে যাওয়ার আগেই লেখা শেষ করতে হবে। নাহলে হয়তো আর কোনোদিনই শেষ হবে না।

একরাতেই স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ হলো।

ডালাস প্রবাসী নাট্য-পরিচালক ও রঙ্গমঞ্চ থিয়েটারের প্রধান ব্যক্তি ফরহাদ হোসেন ভাইকে ফাইল পাঠিয়ে বললাম ‘কেমন হবে?’

তিনি অভিজ্ঞ মানুষ। বললেন, মঞ্চে এই নাটক করা টেকনিক্যালি অনেক ডিফিকাল্ট।

তারপরেও আমরা সাহস করলাম।

গ্রুপের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে রিডিং সেশন হলো। গল্প প্রত্যেকেরই দুর্দান্ত লেগেছে। মূল চ্যালেঞ্জ ছিল একে মঞ্চস্থ করা। সবাই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। কারণ, গল্পটা যে সবাইকে জানাতে হবে।

রিহার্সেলের পাশাপাশি স্ক্রিপ্ট ঘষামাজা চলতে লাগল।

এই পথচলায় আমাদের সঙ্গে অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব যুক্ত হতে শুরু করলেন।

আমাদের নাট্যজগতের মহিরুহ শ্রদ্ধেয় মামুনুর রশিদ এক রিহার্সেল দেখে লতিফা চরিত্রের অভিনেত্রীকে ডেকে এনে বললেন, ‘এমন চরিত্র once in a life time কোনো অভিনেত্রীর ভাগ্যে জোটে। এর ওপর সুবিচার করতে হবে। এইটা মনে রাখবা।’

মেহের আফরোজ শাওন গল্পের নাম শুনেই বলেন, ‘লতিফার গল্পটা? এটা তো অনেক কঠিন গল্প! আপনাদের সাহসের তারিফ করতে হয়!’

ফরহাদ ভাই উনার প্রিয় বন্ধু চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলেন এই প্রজেক্ট কেমন? চ্যাটজিপিটি জবাব দিল ‘অতি বিপজ্জনক!’

আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। ‘সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কি ভয়?’

আমাদের যাত্রায় যুক্ত হলেন হুমায়ূন আহমেদের দীর্ঘদিনের ডান হাত, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জুয়েল রানা। তিনি এতটাই মুগ্ধ যে বারবার বলছেন ‘আপনারা আমেরিকায় থেকে এমন জটিল নাটক করতে যাচ্ছেন শুধু স্যারের জন্য?’

আবহসংগীতে চলে এলেন হুমায়ূন আহমেদের প্রিয়তম সংগীত পরিচালক, যার সুরের জাদুতে মুগ্ধ হতেন আমাদের গল্পের জাদুকর স্বয়ং, মকসুদ জামিল মিন্টু।

আমাদের সবার প্রয়াস একটিই—আগামী জুন মাসের ২০ এবং ২১ তারিখে, ডালাসের চিলড্রেন্স থিয়েটার মঞ্চে, আমরা হুমায়ূন ভক্ত হিসেবে তাঁর ভক্তদের জন্য মিসির আলীর জাদু পরিবেশন করব।

যতদূর জানি, বিশ্বে কেউ কখনো কোনোদিন মিসির আলীকে মঞ্চে উপস্থাপন করেনি। আমরাই প্রথম হতে যাচ্ছি।

অনুষ্ঠানটি আমাদের জন্য বিশেষভাবে আবেগময়।

আমরা চাই আমাদের দর্শকরাও সেই আবেগের সঙ্গী হন।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source