শ্রীপুরের সাফারি পার্ক হারাচ্ছে শ্রী, বাড়াচ্ছে দর্শনার্থীদের বিরক্তি

· Prothom Alo

‘এইখানে এসে যা দেখলাম, তা দেখার জন্য কেন আসছি, তাই তো বুঝতে পারছি না’ বলতে বলতে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে বের হচ্ছিলেন তিনি। গরমে ঘেমে একাকার হয়েছিলেন। এই ব্যক্তির সঙ্গে ছিলেন তিন ছেলে ও স্ত্রী, তাদেরও একই অবস্থা।

গত ২৮ মার্চ গাজীপুর সাফারি পার্কে গেলে কথা হয় মধ্যবয়সী এই ব্যক্তির সঙ্গে। এই বিনোদনকেন্দ্র নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলেও নিজের নাম–পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

Visit betsport.cv for more information.

এই ব্যক্তির বিরক্তির কারণগুলো খুঁজে পাওয়া গেল সাফারি পার্ক ঘুরে আসার পর। বাঘ ও সিংহ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া–দাওয়া সারা যাবে, এমন যে দুটি রেস্তোরাঁ রয়েছে, দুটিই বন্ধ। বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সম্পর্কে দর্শনার্থীকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে যে প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্র, সেটিও বন্ধ। দর্শনার্থীদের জন্য বানানো দুটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, প্যাডেল বোটে ভ্রমণ, এগ ওয়ার্ল্ড, হাতি শো গ্যালারি, শিশুপার্ক সবই বন্ধ। পার্কের ভেতরে কোনো স্যুভেনির শপ নেই। দেশি–বিদেশি পর্যটকদের জন্য কোনো গাইড নেই। একটি হুইলচেয়ার ছাড়া প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই।

এত সব নেই নিয়ে চলছে ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার ভাওয়াল শালবনে অবস্থিত সাফারি পার্কটি। ৩ হাজার ৬৯০ একর এলাকজুড়ে গড়ে তোলা এই সাফারি পার্ক পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হয়।

আগে এটির নাম ছিল বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক। ২০২৪ সালের ২১ জুলাই থেকে ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত এটি বন্ধ ছিল। গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ওই বছরের ৫ আগস্ট দেশ ছাড়ার পর পার্কের মূল ফটক, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর করা হয়। এরপর এটির নতুন নাম পাল্টে করা হয় সাফারি পার্ক, গাজীপুর।

—এস এম হাবিব সরকার, দর্শনার্থীটিকিট কেটে পার্কে ঢোকার পর যা–ই দেখতে চাই, তাতেই আবার করে টিকিট লাগছে। পার্কে মনোরম পরিবেশ নেই, চারপাশে নোংরা। কোর সাফারির ভেতরের রাস্তাও খুব খারাপ।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজার থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে সাফারি পার্কটির অবস্থান। বাঘের বাজারের প্রবেশপথে বাঘের আদলসংবলিত একটি ফটক নির্মাণ করা হয়েছে। বেহাল ফটকটির সামনে গিয়ে মডেলটি যে বাঘের, তা বুঝতেই কষ্ট হয়।

এই পার্কের কোর সাফারিতে বাঘ, সিংহ, ভালুক, হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী বনের মধ্যে উন্মুক্ত অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়। দর্শনার্থীরা সুরক্ষিত গাড়িতে বসে ঘুরে দেখেন। আর সাফারি কিংডমে বন্য প্রাণীদের বড় বেষ্টনীতে আটকে রেখে প্রদর্শন করা হয়, অনেকটা চিড়িয়াখানার মতো।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজারে একটি ফটক নির্মাণ করা হয়েছে। তবে তাতে মডেলটি যে বাঘের, তা বোঝাই দায়

একসময় শীতকালে উৎসবের দিনে ৫০ হাজার দর্শকেরও সমাগম হয়েছে পার্কটিতে। তবে বর্তমানে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে দিনে গড়ে এক থেকে দেড় হাজারে নেমে এসেছে। প্রাণীর সংখ্যাও কমেছে।

কত প্রাণী বয়সের কারণে মৃত্যুর অপেক্ষায় আছে, বিদেশ থেকে কত প্রাণী কেনা হয়েছে, এ পর্যন্ত মোট কত প্রাণী মারা গেছে, এমন অনেক তথ্যই পার্ক কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। সাফারি পার্কের নিজস্ব কোনো ওয়েবসাইট নেই। বন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটেও কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই।

                            পার্কটিতে যেসব প্রাণী রয়েছে

বাঘ, সিংহ, চিতা বাঘ, জেব্রা, ব্লু ওয়াইল্ড বিস্ট, কমন ইল্যান্ড, নিয়ালা, জলহস্তী, ডি ব্রাজাস মাংকি, রেড ইয়ার্ড স্লাইডার কচ্ছপ, ইমু পাখি, উট পাখি, অস্ট্রেলিয়ান ঘুঘু, গ্রেট হোয়াইট পেলিক্যান, ব্লাক সোয়ান, গ্রে ক্রাউন ক্রেইন, রয়েল স্পুন বিল, ভারতীয় ময়ূর, সাদা ময়ূর, গ্রিন উইং ম্যাকাউ, ব্লু অ্যান্ড গোল্ড ম্যাকাউ, হারলে কুইন ম্যাকাউ, কাকাতুয়া, ককাটিল, আফ্রিকান গ্রে প্যারট, ভাসা প্যারট, ওয়েস্টার্ট প্লানটেইন ইটার, ইয়েলো হেডেড অ‍্যামাজন প্যারট, ফ্যাস্টিভ অ্যামাজন প্যারট, মিউটেশন রিং নেক প্যারট, রেড লরি, রেইনবো লরিক্যাট, লাভ বার্ড, বাজরিগার, জাভা চড়ুই, ব্যাটেলিয়ার ঈগল, গোল্ডেন কনিউর, সান কনিউর, বারউইং প্যারট, চিত্রা হরিণ, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, গয়াল, নীলগাই, এশিয়ান কালো ভালুক, এশিয়ান হাতি, হনুমান, খাটো লেজি বানর, গিনিপিগ, খরগোশ, মিঠাপানির কুমির, লোনা পানির কুমির, ঘড়িয়াল, ধুর কাছিম, সিন্ধি কাছিম, ধুম কাছিম, কালো কাইট্টা, ভারতীয় কালো কাছিম, সিলেটি কঢ়ি কাইট্টা, হলদে কাইট্টা, কঢ়ি কাইট্টা, বার্মিজ পাইথন, লাল মাথা টিয়া, চন্দনা টিয়া, মদনা টিয়া, সবুজ টিয়া, মদন টাক, পাহাড়ি ময়না, হিমালয়ি গৃথিনি, রাজ ধনেশ, কালিম পাখি এবং বিভিন্ন ধরনের মাছ।

দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য পার্কের ভেতরে কোনো পুলিশ ক্যাম্প নেই। পার্কের কর্মীদের পোশাক ছাড়া অন্য তেমন কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয় না। কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের কোনো ঝুঁকিভাতা নেই। বন্য প্রাণী নিয়ে নেই কোনো প্রশিক্ষণ।

দর্শনার্থীরা পলিথিন ব্যাগ ভরে চিপসসহ বিভিন্ন খাবার নিয়ে ঢুকছেন। শিশুরা কুমিরসহ বিভিন্ন প্রাণীর বেষ্টনীতে সেই খাবার দেওয়ার চেষ্টা করছে। খাওয়া শেষে যত্রতত্র ফেলা হচ্ছে খাবারের প্যাকেট। ফলে পার্কের নোংরা পরিবেশ নিয়েও দর্শনার্থীদের কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।

মারা গেল গাজীপুর সাফারি পার্কের শেষ জিরাফটিও, এক যুগে ১২ জিরাফের মৃত্যু

টিকিট ব্যবস্থাপনা আর পরিবেশ নিয়ে বিরক্তি

সাফারি পার্কটিতে সাপ্তাহিক ছুটি মঙ্গলবার। অন্য দিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা। কোনো দর্শনার্থী ব্যক্তিগত গাড়িতে পার্কে গেলে গাড়ি পার্কিংয়ে লাগবে ১০০ টাকা। পার্কে ঢুকতে লাগবে ৫০ টাকা। গাড়িতে চড়ে কোর সাফারি পরিদর্শনে ১৫০ টাকা লাগবে। তারপর যা দেখতে চাইবেন, তাতেই আলাদা টিকিট লাগবে। ম্যাকাউ ও প্যারট ৪০ টাকা, অ্যাকুয়ারিয়াম ২০ টাকা, ক্রাউন ফিজেন্ট ২০ টাকা, ধনেশ অ্যাভিয়ারি ২০ টাকা, নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম ২০ টাকা, প্রজাপতি কেন্দ্র ২০ টাকা, ঝুলন্ত সেতু ১০ টাকা, নাইন ডি মুভি (বিভিন্ন থিমে শর্ট থ্রিডি ভিডিও) দেখলে ১০০ টাকা লাগবে। পাবলিক টয়লেটে একবার গেলে লাগবে ১০ টাকা।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কে কত যে টিকিট কিনতে হয়, তা দেখান একজন দর্শনার্থী

অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি সাফারি পার্কের পুরোটা ঘুরে দেখতে চান তাহলে অন্তত সাড়ে পাঁচ শ টাকা গুনতে হবে। এর সঙ্গে খাবারের বাড়তি টাকা যোগ হবে।

শিশু ও শিক্ষার্থীরা কিছুটা ছাড় পাচ্ছে। ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো প্রবেশ ফি নেওয়া হয় না। ১২ বছরের কম অপ্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য পার্কে প্রবেশ ফি লাগবে ২০ টাকা, গাড়িতে কোর সাফারি পরিদর্শনে লাগবে ৫০ টাকা। অন্য কিছু দেখতে চাইলে বড়দের মতোই টিকিটের মূল্য দিতে হবে। শিক্ষার্থী হলে পার্কে প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা, কোর সাফারি পরিদর্শনে ৫০ টাকা লাগছে। আর বিদেশি পর্যটক হলে পার্কে প্রবেশমূল্য ১ হাজার টাকা।

সীমানাপ্রাচীরের নির্মাণসামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ কৃষক দল নেতার বিরুদ্ধে

পার্কে আসা ব্যক্তিদের বেশির ভাগই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। কেউ কেউ ছোট বড় মিলিয়ে ১০ জনও এসেছেন। ফলে বড় দল নিয়ে ঘুরতে আসা এক একটি পরিবারের টিকিটের পেছনেই প্রায় ৫ হাজারের বেশি টাকা লাগছে। ফলে পকেটের কথা চিন্তা করে পার্কের কোন কোন জায়গা দেখবেন, তা কাটছাঁট করছিলেন অনেকেই।

শ্রীপুর থেকে পার্কে আসা ব্যবসায়ী এস এম হাবিব সরকারের পরিবারের তিনটি শিশুসহ মোট ৯ জন ছিলেন। তিনি বললেন, ‘টিকিট কেটে পার্কে ঢোকার পর যা–ই দেখতে চাই, তাতেই আবার করে টিকিট লাগছে। পার্কে মনোরম পরিবেশ নেই, চারপাশে নোংরা। কোর সাফারির ভেতরের রাস্তাও খুব খারাপ।’

পার্ক কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত পার্কে মোট দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১২৭ জন। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক দর্শনার্থী ছিলেন ২ লাখ ৬০ হাজার ৫৫৯ জন। শিক্ষার্থী ছিল ৬২ হাজার ৫২৫ জন। বিদেশি পর্যটক ছিলেন মাত্র ৪৬৪ জন।

গভীর রাতে গাজীপুরের সাফারি পার্কে ঘোরাঘুরি করছিলেন, পরে আটক ১১

গত বছরের জুলাই মাস থেকে গত ২৬ মার্চ পর্যন্ত মোট দর্শনার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৬ হাজার ৮৪২ জন। এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক ২ লাখ ৩০ হাজার ৮৩৬ জন, অপ্রাপ্তবয়স্ক ২৬ হাজার ৫৮৩ জন, শিক্ষার্থী ৪৯ হাজার ৩৮ জন, আর বিদেশি ছিলেন ৩৭০ জন।

গত ২১ মার্চ ঈদুল ফিতরের দিন দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৩৬৬ জন। তবে ২৮ মার্চ দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৮৫ জনে। ২১ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত পার্কে প্রবেশ ফি বাবদ রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ৪২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কের নেচারাল হিস্ট্রি জাদুঘর

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ ২০১৬ সালের জুন মাসে সাফারি পার্ক প্রকল্পের (তৃতীয় সংশোধিত) একটি নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে পার্কে বিভিন্ন প্রজাতির দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৮১৩টি বন্য প্রাণী থাকার কথা বলা হয়। তবে বর্তমানে বিভিন্ন মাছ বাদ দিয়ে ৭টি বাঘ, ৫টি সিংহ, ২১টি ভালুক, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী আছে এক হাজারের মতো।

সাভার থেকে স্বামী ও সন্তান নিয়ে ঘুরতে আসা শারমীন সুলতানা জানালেন, এর আগে একবার এসেছিলেন, সেবার কোর সাফারিতে বাঘ ও সিংহের দেখা পাননি। তবে এবার পেয়েছেন।

এই নারী কোর সাফারিতে যাওয়ার বাসটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত না হওয়া নিয়ে বিরক্ত। কারণ, গরমে কাহিল হতে হয়েছে তাঁদের।

খবর নিয়ে জানা গেল, পার্কের দুটি জিপ নষ্ট। জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডে কেনা বাস একটি নষ্ট, সাতটি চালু আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র দুটিতে এসি কাজ করে। দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামাগার ও রিসোর্ট ছিল তিনটি। বর্তমানে মাত্র একটি চালু আছে।

প্রাণীর মৃত্যু, গড়ায় হাইকোর্ট পর্যন্ত

উগান্ডার জাতীয় পাখি গ্রে ক্রাউন্ড ক্রেনের ডিম ফুটে ছানা বের হয়েছে, দুটি নীলগাই দুটি শাবকের জন্ম দিয়েছে, জেব্রা শাবকের বা জলহস্তীর বাচ্চা হয়েছে—এমন খবরের চেয়ে পার্কটিতে প্রাণীর মৃত্যুর খবর আলোচনায় বেশি এসেছে।

২০১৬ সালে প্রকাশিত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে সাফারি পার্কে দেশি ও বিদেশি উভয় প্রকার বন্য প্রাণীর মৃত্যুর হারকে উদ্বেগজনক বলা হয়। তাতে বলা হয়েছিল, আমদানি করা সিংহ, বাঘের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সঠিক অনুপাত বজায় রাখা হয়নি। আদর্শ অনুপাত না থাকায় প্রাণীদের মধ্যে পারস্পরিক লড়াই বা অন্তর্বিরোধ ঘটে। বন্য প্রাণীদের আদি আবাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে না পারা বা অভিযোজনে ব্যর্থতা, অনিয়মিত টিকাদান, অপর্যাপ্ত ও দূষিত পানি সরবরাহ, দুর্বল পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় ওই প্রতিবেদনে।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কের দুটি সিংহ

২০১৩-১৫ সাল পর্যন্ত দুই ধাপে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মোট ২৫টি জেব্রা পার্কে আনা হয়েছিল। এসব জেব্রা নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারেনি। ২০২২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ১১টি জেব্রা ও একটি বাঘের মৃত্যুর ঘটনায় হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন হয়েছিল। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি, পার্কে কর্মরতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা, বদলি করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তারপর সব তৎপরতা থেমে যায়।

৭টি বাঘ, ৫টি সিংহ, ২১টি ভালুক, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী আছে এখন এক হাজারের মতো। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে মোট ২৫টি জেব্রা আনা হয়েছিল। একটিও এখন বেঁচে নেই। ১২টি জিরাফের সব কটি মারা গেছে। কয়েকটি ক্যাঙারু আনা হলেও ধারাবাহিকভাবে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা এখন শূন্যতে পৌঁছেছে।

২০২১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর একটি সাদা সিংহ মারা যায়। গরমে হিট স্ট্রোকই এই মৃত্যুর কারণ বলেছিল পার্ক কর্তৃপক্ষ।

গত বছরের ২৫ অক্টোবর প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, পার্কে বেঁচে থাকা একমাত্র জিরাফটিও টিউবারকিউলোসিস (টিবি) রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এই স্ত্রী জিরাফটি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা হয়েছিল। এটিকে নিয়ে গত এক যুগে সাফারি পার্কে ১২টি জিরাফের মৃত্যু হলো।

পেখম মেলেছে ময়ূর। গাজীপুর সাফারি পার্কে

পার্ক প্রতিষ্ঠার পর দর্শনার্থীদের জন্য বেশ কয়েকটি ক্যাঙারু বিদেশ থেকে আনা হলেও ধারাবাহিকভাবে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা এখন শূন্যতে পৌঁছেছে।

পার্কে প্রাণী দেখভালকারী কর্মীরা প্রাণীর খাবার পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য উন্নত ব্যবস্থা না থাকা, বিদেশি প্রাণীর বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ না থাকাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন।

পার্কের ভেতরেই বন্য প্রাণীদের জন্য খাদ্য (তৃণলতা, ফল ইত্যাদি) উৎপাদনের বাগান বা ফডার ফিল্ড তৈরি করার কথা ছিল। প্রাণীর খাদ্য উপযোগী ফলের গাছ লাগানো হয়েছে বলে পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে সরেজমিনে কোনো গাছেই ফল চোখে পড়েনি। কী কী গাছ আছে, তার তালিকাও পাওয়া যায়নি। একসময় পার্কে খাদ্য সংরক্ষণাগার ছিল, বর্তমানে সেটাও বন্ধ।

নাজুক নিরাপত্তাব্যবস্থা

পার্কটিতে সিসি ক্যামেরা আছে ৩২টি। পার্কের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজকে কেন্দ্র করে দুই রাজনৈতিক নেতার মধ্যে বিরোধের জেরে চাঁদা দাবি ও মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শ্রীপুর থানায় অভিযোগ দেন হাসিবুল হাসান সরকার হাশেম নামের এক ব্যক্তি। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পার্কের সংরক্ষিত এলাকা থেকে সন্দেহভাজন ১১ ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশে দেয় পার্ক কর্তৃপক্ষ।

২০১৮ সালে মাদাগাস্কার থেকে পাচারের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কিছু প্রাণী উদ্ধার করে। সেগুলোর মধ্যে চারটি লেমুর গাজীপুর সাফারি পার্কে হস্তান্তর করা হয়। গত বছর মার্চ মাসে গভীর রাতে পার্কের নিরাপত্তাবেষ্টনী কেটে তিনটি রিংটেইল লেমুর চুরি হয়। এগুলোর একটি উদ্ধার করা হলেও তা পরে মারা যায়। অন্য দুটির খোঁজ আর মেলেনি।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কে কোয়ারেন্টিনে থাকা একটি চিতাবাঘ

গত বছরের ১০ এপ্রিল প্রথম আলোর এক সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়, সীমানাপ্রাচীরের অন্তত পাঁচ অংশে ভাঙা ছিল। কিছু স্থানে দেয়াল একেবারে নিচু করে তৈরি করা, যা সহজেই টপকানো যায়। কিছু স্থানে ভাঙা দেয়াল বাঁশ দিয়ে আটকানো। ফলে বহিরাগতরা সহজেই ঢুকতে পারছেন পার্কে। এর আগেও কম উচ্চতার দেয়াল টপকে একটি পুরুষ নীলগাই পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।

২০২৪ সালে পার্কের ভেতর সাফারি কিংডমে লোহার জাল কেটে দুটি গ্রিন উইং ম্যাকাও পাখি চুরির ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে একটি পাখি উদ্ধার করা হয়।

তারেক রহমান, সহকারী বন সংরক্ষকশক্তিশালী সীমানাপ্রাচীর, নিরাপত্তা টাওয়ার, পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা, কিউরেটরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ না থাকার পাশাপাশি দক্ষ জনবল না থাকা, বাজেট স্বল্পতাটাই এখন পার্ক পরিচালনার বড় চ্যালেঞ্জ।গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী হাসপাতাল

হাসপাতাল ও ল্যাবও বেহাল

পার্কে একটি বন্য প্রাণী হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরি আছে। একমাত্র চিকিৎসক বা ভেটেরিনারি অফিসার হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইন প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালটিতে একসময় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ অস্ত্রোপচারকক্ষ ছিল। ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ায় এখন আর অস্ত্রোপচারকক্ষের অস্তিত্ব নেই। দক্ষ জনবলের অভাবে ল্যাবটিও প্রায় বন্ধের পথে।

সরেজমিনে দেখা গেল, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে ল্যাবের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। পাচারের শিকার প্রাণীদের এনে যেখানে রাখা হয়, সেই কোয়ারেন্টিন কক্ষটিও নোংরা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বন্য প্রাণী হাসপাতালে একটি আধুনিক ল্যাবরেটরি ও অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য পিসিআর মেশিন, থার্মাল সাইক্লার, মাইক্রোস্কোপ, অপারেশন টেবিল কেনা হলেও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার ও আধুনিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের সার্বিক অবস্থা মানসম্মত নয়। মৃত প্রাণীর ময়নাতদন্তের জন্য নির্ধারিত কোনো আধুনিক শেড বা ব্যবস্থা নেই। আহত ও উদ্ধারকৃত বন্য প্রাণীদের জন্য কোনো পৃথক বন্য প্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

সহকারী বন সংরক্ষক ও গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তারেক রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শক্তিশালী সীমানাপ্রাচীর, নিরাপত্তা টাওয়ার, পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা, কিউরেটরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ না থাকার পাশাপাশি দক্ষ জনবল না থাকা, বাজেট স্বল্পতাটাই এখন পার্ক পরিচালনার বড় চ্যালেঞ্জ।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কের বন্য প্রাণী হাসপাতালের ল্যাবরেটিরটি বন্ধের পথে

মহাপরিকল্পনা কেবল কাগজে-কলমে

সাফারি পার্ক প্রকল্পটি ২০১০ সালের ১১ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৪ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয় এটি।

পার্কটি তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল, শালবনের বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা। দেশের বিরল ও বিলুপ্ত বন্য প্রাণীকে নিজ আবাসস্থলে এবং আবাসস্থলের বাইরে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা। ইকো-ট্যুরিজমের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যটনশিল্পের বিকাশ, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।

২০২৩ সাল পর্যন্ত পার্কটি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে চলত। ২০২৪ সাল থেকে রাজস্ব বাজেটের আওতায় আসে। তবে এখনো সরকারি কোষাগার থেকে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কে দর্শনার্থীদের ময়ূর দর্শন

বর্তমানে ৪৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে সাফারি পার্কের অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থাপনা সহায়তা প্রকল্পটি চলমান। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত চলা এ প্রকল্পের আওতায় পার্কের কিছু সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। ৩১ জন রাজস্ব খাতের ও ৫৬ জন আউটসোর্সিং কর্মী দিয়ে চলছে পার্কের কার্যক্রম। কিউরেটর, মাইক্রো বায়োলজিস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদ নেই এই সাফারি পার্কে। দেড় মাস আগে একজন পুষ্টিবিদ নিয়োগ পেয়েছেন।

তপন কুমার দে, প্রথম প্রকল্প পরিচালক, সাফারি পার্কপার্কটির শুরুর দিকে অনেক কিছুই করা হয়েছিল। অনেক কিছুই এখন নেই। গুরুত্বপূর্ণ পার্কটি রক্ষায় সরকারের নজর বাড়ানো জরুরি।

২০১৯ সালে পার্কের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদে মূলত বিদ্যমান অবকাঠামো সংস্কার ও পার্কের মৌলিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

মহাপরিকল্পনার এ মেয়াদে ‘মাল্টিপারপাস মেগা হল’–এ একই ছাদের নিচে টিকিট কাউন্টার, ভিজিটর সেন্টার, জাদুঘর, স্যুভেনিরের দোকান, ফুড কোর্ট ও বিশ্রামাগার বানানোর কথা ছিল। জরুরি প্রয়োজনে বিদ্যমান বেষ্টনী বা খাঁচাগুলোর সংস্কার করার কথা ছিল।

সরেজমিনে কুমির পার্কের নাজুক বেষ্টনী চোখে পড়ল। শিশুরা বেষ্টনীর একদম কাছে চলে যাচ্ছে, কুমিরকে বিভিন্ন খাবার দিতেও দেখা যায়। ফলে যেকোনো সময়ই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে পার্কের কর্মীরাই বলছিলেন।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কে কুমিরের বেষ্টনি বেশ নড়বড়ে, তাতে যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা

পরিকল্পনার এ মেয়াদে রিভার সাফারি প্রতিষ্ঠা করে পর্যটকদের জন্য সচল করার কথা ছিল। হাতি ও পাখির শো গ্যালারিগুলোকে আধুনিকায়ন, কোর সাফারি ট্রেইলকে আরও দীর্ঘ, আকর্ষণীয় এবং দৃশ্যমানভাবে চিত্তাকর্ষক করা, প্রকৃতি বীক্ষণ কেন্দ্রকে সচল করা, কুমির, শকুন ও ধনেশ পাখির প্রজনন কার্যক্রমকে আরও বৈজ্ঞানিক এবং কার্যকর করা, হাসপাতাল ও ল্যাবের উন্নয়ন, বন্য প্রাণীদের বেষ্টনীর ভেতরে প্রাকৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা, জলাভূমি খনন করা, সৌরশক্তিচালিত নাইট সিকিউরিটি, আধুনিক অস্ত্রসহ টহল ব্যবস্থা করা, পার্কের সীমানায় আধুনিক বৈদ্যুতিক বেষ্টনী ও বায়ো-ফেন্সিং নিশ্চিত করা, একটি আধুনিক ওয়েবসাইট তৈরি করা, শিক্ষা ও সচেতনতা তৈরির কার্যক্রম পরিচালনা করার কথা ছিল। পর্যটকদের জন্য আধুনিক বিশ্রামাগার, ফার্স্ট এইড কর্নার, মাতৃত্বকালীন কর্নার ও প্রতিবন্ধী পর্যটকদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা ছিল এই সময়কালে।

গাজীপুরের শ্রীপুরের সাফারি পার্কের দেখা মিলবে মুক্ত পরিবেশে বিচরণরত জেব্রার

মহাপরিকল্পনার দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৫ সাল থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর মেয়াদে পার্কটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক পর্যটন ও গবেষণাকেন্দ্রে রূপান্তর করার কথা। রিভার সাফারি, জঙ্গল সাফারি, জলাভূমি সাফারি, অরিয়েন্টাল সাফারি তৈরির কথা এই সময়কালে। পর্যটকদের জন্য অরণ্য পথ নির্মাণ, ইকো-ট্যুরিজম জোনে নাইট সাফারি চালুর কথা আছে।

বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী সাফারি পার্কের সার্বিক দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পার্কটিকে আন্তর্জাতিক মানের করতে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কম করে হলেও ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। বর্তমানে পার্কটি জোড়াতালি নয়, বলা যায় বিভিন্নভাবে সমন্বয় করে পরিচালনা করতে হচ্ছে। সাফারি পার্কের অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থাপনা সহায়ক প্রকল্পের মাধ্যমে পার্কটিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রকল্প পরিচালক তপন কুমার দে প্রথম আলোকে বলেন, পার্কটির শুরুর দিকে অনেক কিছুই করা হয়েছিল। অনেক কিছুই এখন নেই। গুরুত্বপূর্ণ পার্কটি রক্ষায় সরকারের নজর বাড়ানো জরুরি।

Read full story at source