সাহাবিদের বক্তব্য কেন মানতে হবে

· Prothom Alo

ইসলামি শরিয়তের মূল উৎস কোরআন ও সুন্নাহ। তবে এই দুই উৎসের সঠিক মর্ম অনুধাবনে সাহাবিদের বক্তব্য বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। সাহাবিরা সরাসরি ওহির অবতরণ প্রত্যক্ষ করেছেন, রাসুল (সা.)-এর পবিত্র সংস্পর্শে থেকে প্রতিটি হুকুমের প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্য হৃদয়ঙ্গম করেছেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ফলে ইসলামের টেক্সটের মর্ম উদ্ধারে তাঁরাই ছিলেন সবচেয়ে যোগ্য এবং বিশুদ্ধ চিন্তার অধিকারী।

বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষিত অনেকে সরাসরি হাদিসের শাব্দিক অনুবাদ দেখে নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করান। এতে মূল বিধানের ক্ষেত্রে লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

সাহাবিদের বিশেষত্ব হলো, তাঁরা ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো প্রাচীন বা সমকালীন সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না। তাঁদের জ্ঞানের একমাত্র উৎস ছিল মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা।

তাই সুন্নাহর ব্যাখ্যায় তাঁদের বক্তব্য ও কর্মকে অগ্রাধিকার দেওয়া কেবল আবেগ নয়, বরং একটি যৌক্তিক ও তাত্ত্বিক প্রয়োজন।

সাহাবিদের কথা মানার যৌক্তিক কারণ

সাহাবিদের বক্তব্যকে কেন আমরা প্রাধান্য দেব, তার পেছনে ইমাম শাতোবি (রহ.) আল-মুওয়াফাকাত গ্রন্থে দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন:

১. ভাষাগত দক্ষতা: সাহাবিরা ছিলেন বিশুদ্ধ আরবি ভাষার অধিকারী। তাঁদের ভাষা ও অলঙ্কার জ্ঞান ছিল সর্বোচ্চ স্তরের। ফলে কোরআন ও সুন্নাহর শব্দগত ও গূঢ় অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে তাঁরা পরবর্তী যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।

২. ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী: তাঁরা ওহি অবতরণের শানে নজুল বা প্রেক্ষাপট সরাসরি দেখেছেন। কোনো একটি নির্দেশ কেন দেওয়া হয়েছিল এবং সেটি কোন বিশেষ পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত ছিল, তা একজন প্রত্যক্ষদর্শী যেভাবে বুঝবেন, পরবর্তী সময়ে কেবল বর্ণনা পড়ে তা বোঝা সম্ভব নয়।

সাহাবিদের বক্তব্যের কথা যখন বলা হয়, তখন মূলত তাঁদের ‘ইজমা’ বা সম্মিলিত ঐক্যমত্যকে বোঝানো হয়। যদি কোনো বিষয়ে সাহাবিরা একমত হন, তবে সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।
খোদা–আসক্তি বাস্তব জীবনকে বর্জন করে না

ইমাম শাতোবি বলেন, “সাক্ষী যা দেখেন, অনুপস্থিত ব্যক্তি তা দেখেন না।” (ইমাম শাতোবি, আল-মুওয়াফাকাত, ৪/১২৮, দার ইবনে আফফান, ১৯৯৭)

ইমাম আহমদ বিন হাম্বলও এ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতেন। তাঁর মতে, সাহাবিরাই আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বক্তব্যের প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার জন্য সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। (সালেহ বিন আহমদ, কিতাবুল ইলাল ওয়া মারিফাতুর রিজাল, ২/৬৫)

সাহাবিদের ঐকমত্যের গুরুত্ব

সাহাবিদের বক্তব্যের কথা যখন বলা হয়, তখন মূলত তাঁদের ‘ইজমা’ বা সম্মিলিত ঐক্যমত্যকে বোঝানো হয়। যদি কোনো বিষয়ে সাহাবিরা একমত হন, তবে সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যে কেউ রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে তার কাছে হেদায়েত স্পষ্ট হওয়ার পর এবং মুমিনদের পথ ছেড়ে অন্য পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সেদিকেই ফিরিয়ে দেব যেদিকে সে ফিরতে চায় এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১১৫)

এখানে ‘মুমিনদের পথ’ বলতে প্রথমত সাহাবিদের পথকেই বোঝানো হয়েছে।

তবে কোনো একজন সাহাবির ব্যক্তিগত ইজতিহাদ বা গবেষণালব্ধ মতের ক্ষেত্রে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে সেই ব্যক্তিগত মতটিও যদি তৎকালীন সময়ে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে এবং কেউ তার বিরোধিতা না করেন, তবে অধিকাংশ আলেমের মতে সেটিও দলিল হিসেবে গণ্য হবে।

ইমাম আবু হানিফা, মালিক ও আহমদের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী সাহাবির সেই বক্তব্যও প্রামাণ্য। (আবু ইয়ালা, আল-উদ্দাহ ফি উসুলিল ফিকহ, ৪/১১৮৪)

নবীযুগে সাহাবিদের ইজতিহাদ
কোনো মাসআলায় যদি সাহাবিরা ভিন্ন ভিন্ন মত দেন, তবে তা একটি ইজতিহাদি বিষয় হিসেবে গণ্য হবে এবং তখন দলিলে যা শক্তিশালী, তা গ্রহণ করতে হবে।

ইবনে তাইমিয়ার পর্যবেক্ষণ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) যখন খারিজিদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন, তখন তিনি তাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, “আমি তোমাদের কাছে এসেছি মুহাজির ও আনসার তথা আল্লাহর নবীর সাহাবিদের পক্ষ থেকে। তাঁদের উপস্থিতিতেই কোরআন নাজিল হয়েছে এবং তাঁরা এর ব্যাখ্যা তোমাদের চেয়ে ভালো জানেন।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৮৫২২)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)–ও এ বিষয়ে কঠোর ছিলেন। তিনি মনে করতেন, কিতাব ও সুন্নাহর পর সালাফ তথা সাহাবিদের ঐক্যবদ্ধ পথ ছেড়ে অন্য পথ অবলম্বন করা কারো জন্যই জায়েজ নয়। (ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ১১, পৃষ্ঠা: ৪৯০)।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাহাবিদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ এই নয় যে তাঁদের প্রতিটি ব্যক্তিগত ইজতিহাদ নির্ভুল বা নিষ্পাপ। বরং সাহাবিদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। কোনো মাসআলায় যদি সাহাবিরা ভিন্ন ভিন্ন মত দেন, তবে তা একটি ইজতিহাদি বিষয় হিসেবে গণ্য হবে এবং তখন দলিলে যা শক্তিশালী, তা গ্রহণ করতে হবে।

এমনকি ইমাম আহমদ বিন হাম্বলও অনেক ক্ষেত্রে সাহাবির ব্যক্তিগত মতের বিপরীতে দলিলে যা শক্তিশালী তা গ্রহণ করেছেন। (আবু ইয়ালা, আল-উদ্দাহ, ৪/১১৮১)

বিশ্বস্ত সাহাবি সেনাপতি আবু উবাইদা

Read full story at source