ব্রিটিশ-বাংলাদেশি শেফ নাদিয়া হোসেন কেন ও কীভাবে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন

· Prothom Alo

প্রথাগত চিন্তার বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস সহজে দেখান না মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা। সেখানে কাজ ও টাকা কম পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শেফ নাদিয়া হোসেন। ১১ বছরের পেশাজীবনের নানা নেতিবাচক দিক নিয়ে তিনি কথা বলেছেন ‘গার্ডিয়ান’–এর সঙ্গে। সেখান থেকেই কিছু অংশ তুলে ধরা হলো এখানে।

খাবার হতে হবে মজার

ওজন কমানোর জন্য চলতি ধারা হিসেবে এখন বেশ জনপ্রিয় আমিষকেন্দ্রিক ডায়েট, ওজন কমানোর ইনজেকশন আর শত্রু হিসেবে চিনিকে আখ্যায়িত করা। ‘নাদিয়াস কুইক কমর্ফোটস’ বইটি এ কারণেই নজর কাড়ে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

দুনিয়াজুড়ে এখন খাবারের যে চলতি ধারা, সেখানে এই বই উল্টো স্রোতের গল্প বলে। রেসিপিতে পাওয়া যাবে সোনালি সিরাপ দেওয়া ডাম্পলিংসের মিষ্টি স্বাদ। তেলে ডোবানো মচমচে ভাজা খাবার নিয়ে আছে পুরো একটি অধ্যায়। চিজ বল থেকে শুরু করে অভিনব ডিপ-ফ্রায়েড ক্যানেলোনি পর্যন্ত আছে।

সহজভাবে বললে, এই বই চলতি ধারার বাইরে গিয়ে আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খাবার শুধু স্বাস্থ্য বা সংখ্যার একটা হিসাব নয়, বরং আনন্দ, স্বাদ আর আরামের বিষয়।

নাদিয়া মনে করেন খাবার হতে হবে মজার

‘আমি যদি শুধু ডিপ ফ্রাই নিয়েই একটা পুরো বই লিখতে পারতাম, নিশ্চয়ই লিখতাম!’ হাসতে হাসতে বলেন নাদিয়া হোসেন, ‘এভাবেই আমি রান্না করি, এভাবেই খাই আর এভাবেই আমার পরিবারের প্রতি ভালোবাসা দেখাই। বইয়ে যত রেসিপি আছে, সবই আমার সন্তানদের অসম্ভব পছন্দ।’

তবে নাদিয়া এটাও স্পষ্ট করে দিলেন, সবকিছুতেই দরকার ভারসাম্য। তাই একদিকে যেমন মজাদার ডিপ ফ্রায়েড খাবার আছে, তেমনই আছে হালকা স্বস্তির উদ্ভিদভিত্তিক বা প্ল্যান্ট–বেজড ডাল আর টেস্টি নুডলস।

নাদিয়ার ভাষায়, ‘কোনো কিছুই যখন নিজের চরম রূপে পৌঁছে যায়, তখন সেটা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।’

মাত্র ১৫ বছরেই পিএইচডি করা বেলজিয়ামের লরাঁকে বলা হচ্ছে ‘লিটল আইনস্টাইন’

‘গার্ডিয়ান’কে খাবার আর নিজের কাজ নিয়ে এমন অনেক তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক শেফ নাদিয়া হোসেন। ভক্তদের সামনে নাদিয়া হোসেনের বড় হয়ে ওঠাটা বেশ ছন্দময় ছিল।

২০১৫ সালের ‘দ্য গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’ শুরু করার সময় তিনি ছিলেন একটু নার্ভাস, শান্ত স্বভাবের এক নারী; সেখান থেকেই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সেই সিজনের চ্যাম্পিয়ন।

একজন মুসলিম নারী হিসেবে নাদিয়া সব সময় তিনি যথেষ্ট সমর্থন পাননি, কিংবা নিজের পূর্ণ সম্ভাবনা প্রকাশের সুযোগও সব সময় পাননি

পরবর্তী দশকে নাদিয়া শুধু একজন বেকার (শেফ) নন, বরং অনেকের কাছে প্রিয় এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও হয়ে ওঠেন। যেকোনো জায়গায় তাঁর স্বভাবসুলভ উষ্ণতা আর প্রাণবন্ত উপস্থিতি মানুষের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। গত ১১ বছরে প্রকাশ করেছেন রান্নার বই। শিশুদের জন্য বই লিখেছেন, টিভি শো করেছেন। সামনে আরও অনেক কিছু করার সম্ভাবনাও ছিল।

কিন্তু গত বছর গ্রীষ্মে নাদিয়া যেন হঠাৎই নিজের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন। প্রচলিত নিয়ম বা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের সীমাবদ্ধতা না মেনে নিজের অবস্থান জানান ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে। ইনস্টাগ্রামে একটি ভিডিও পোস্ট করে জানান, বিবিসি তাঁকে নিয়ে আর নতুন কোনো কুকিং শো বানানোর পরিকল্পনা করছে না।

ঝামেলার শুরু যেভাবে

২০২৫ সালে ‘রুজা: আ জার্নি থ্রু ইসলামিক কুজিন ইন্সপায়ার্ড বাই রামাদান অ্যান্ড ঈদ’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন নাদিয়া। ইসলামিক বিশ্বের নানা খাবার, বিশেষ করে রমজান ও ঈদকে ঘিরে অনুপ্রাণিত এই বইয়ের সঙ্গে কোনো টিভি সিরিজ যুক্ত হচ্ছে না, সেটি তিনি ২০২৪ সাল থেকেই জানতেন।

পরে জানা যায়, ‘নাদিয়াস কুইক কমফোর্টস’ বইটি ঘিরেও বিবিসি কোনো সিরিজ তৈরি করবে না। এই প্রেক্ষাপটে ইনস্টাগ্রামে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাদিয়া নানা প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।

সরাসরি কাউকে দোষ না দিয়েও পুরো ইন্ডাস্ট্রিতেই তাঁকে নিয়ে করা গ্যাসলাইটিংয়ের (কারও মনে এমন সন্দেহ তৈরি করা, ‘আমি কি ভুল ভাবছি?’) বিষয়টি সামনে আনেন।

২০২৫ সালে ‘রুজা: আ জার্নি থ্রু ইসলামিক কুজিন ইন্সপায়ার্ড বাই রামাদান অ্যান্ড ঈদ’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন নাদিয়া

তাঁর কথায়, একজন মুসলিম নারী হিসেবে সব সময় তিনি যথেষ্ট সমর্থন পাননি, কিংবা নিজের পূর্ণ সম্ভাবনা প্রকাশের সুযোগও সব সময় পাননি। মিডিয়ায় যাঁরা সফল, সাধারণত এ ধরনের পোস্ট করেন না। এর মাধ্যমে মনে হয়েছে, নাদিয়া এমন এক নারী, যাঁর আর হারানোর কিছু নেই। আর সেই নির্ভীক, খোলামেলা অবস্থানটাই ছিল দারুণ রোমাঞ্চকর।

গত বছরটা নাদিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও পালাবদলের ছিল। সাক্ষাৎকারে নাদিয়া জানান, এ সময়ে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ পান এবং বুঝতে পারেন, নিজের মতো করে পথ তৈরি করতে চান। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ায় নিজেকে এখন কিছুটা স্বাধীনও মনে করছেন। আগে কাজ করতে গিয়ে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতেন। মনে করতেন, সবার জন্য ‘সহজে গ্রহণযোগ্য’ এক সংস্করণ হয়ে যাচ্ছেন।

বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, শব্দের এত শক্তি

টিভি ও প্রকাশনার দুনিয়ায় একজন ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ হিসেবে পেশাগতভাবে একাকিত্বের স্বাদও পেয়ে গেছেন নাদিয়া। এই ইন্ডাস্ট্রি সব সময় সঠিক নয় এবং সেটা তিনি বদলাতেও পারবেন না, এটা তিনি মেনে নিয়েছেন।

পাশাপাশি, ধর্ম ও সংস্কৃতি তাঁর পরিচয়ের বড় অংশ হলেও সেটাই অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর নতুন বই ‘রুজা’ করার পর তিনি লক্ষ করেন, আগের মতো কাজ বা ব্র্যান্ড সহযোগিতা পাচ্ছেন না। তিনি অবশ্য তাঁর করা এই কাজ নিয়ে বেশ গর্বিত।

নাদিয়া তাঁর প্রকাশিত রান্নার বই হাতে

নাদিয়া হোসেন বলেন, টিভি ও প্রকাশনা ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে দিয়েছিল, যেখানে তিনি পুরোপুরি নিজের মতো থাকতে পারছিলেন না। মানিয়ে নিতে গিয়ে তিনি নিজের কিছু বিষয় বদলেছেন, এমনকি হেডস্কার্ফ পরার ধরনও।

এখন তিনি বুঝতে পারেন, এভাবে মানিয়ে নেওয়ার কারণে তিনি নিজের সত্যিকারের রূপ বা মতামত অনেক সময় প্রকাশ করতে পারেননি। তাই এখন তিনি নিজের মতো করেই থাকতে চান।

বইয়ে যত রেসিপি আছে, সবই নাদিয়া’র সন্তানদের অসম্ভব পছন্দ

অতীতে নানা বৈষম্য বা খারাপ আচরণের মুখোমুখি হলেও এড়িয়ে গেছেন, অন্যদের পরামর্শে। বিষয়টি নিয়ে বেশ আফসোসও করেন। সব সময় মনে করতেন, অভিযোগ করলে তাঁকে ‘ঝামেলাপূর্ণ’ মনে করবে সবাই। পরে বুঝতে পারেন, এটা ঠিক হয়নি।
গায়ের রং নিয়েও ভুগেছেন নাদিয়া।

সব সময় ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করতে হতো কাজ পাওয়ার জন্য। তাঁর প্রায় সব কাজেই সমালোচনা এসেছে, এমনকি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করলেও অনেকে তাঁকে ‘অকৃতজ্ঞ’ বলেছে।

‘কী শুনাইলেন কিবরিয়া ভাই’ থেকে লাক্স সুপারস্টার

নাদিয়া মনে করেন, এখন মানুষ বেশি সাহসী হয়ে যেকোনো মন্তব্য করে, বিশেষ করে বর্ণবাদী মন্তব্য বেড়েছে। তবু তিনি বিশ্বাস করেন, এত নেতিবাচক কণ্ঠস্বরের মধ্যে ইতিবাচক কণ্ঠ থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া নাদিয়া বলেন, একই কাজ করলেও তিনি শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পেয়েছেন।

জীবন বদলেছিলেন যেভাবে

পরিবারে ছয় ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় সন্তান হিসেবে বড় হওয়া নাদিয়া দেখেছেন, আগের প্রজন্মের নারীরা গৃহিণী ছিলেন। জীবন নিয়ে তাঁদের খুব সন্তুষ্ট মনে হয়নি। তিনি চেয়েছিলেন ভিন্ন কিছু করতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সমাজকর্মী হবেন। কিন্তু পরিবার তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।

শেষ পর্যন্ত বিয়ে তাঁর জন্য একধরনের পথ তৈরি করে দেয়। সেখানেও নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছেন। তাঁর লেখা বই ‘ফাইন্ডিং মাই ভয়েস’ থেকে বোঝা যায়, তিনি কখনোই অন্যের নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাননি।

নাদিয়া পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে ডিগ্রি অর্জন করেন

পরবর্তী সময়ে নাদিয়া পড়াশোনা করেন এবং পরিবারের প্রথম নারী হিসেবে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর স্বামী তাঁকে রান্নার অনুষ্ঠান ‘বেক অফ’–এ আবেদন করতে উৎসাহ দেন। সেখান থেকেই তাঁর জীবন পুরোপুরি বদলে যায়।

নাদিয়া প্রকাশ্যে সব সময় বর্ণবাদ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। তাঁর আত্মজীবনীতে শৈশবে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতনের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তাঁর পরিবার এই অংশটি নিয়ে কখনোই কথা বলেনি; কারণ, তাঁদের সংস্কৃতিতে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় না।

নাদিয়া মনে করেন, এই নীরবতা মূলত লজ্জা, পারিবারিক সম্মান ও ‘নাম রক্ষা’ করার সংস্কৃতি থেকেই এসেছে। তাঁর ভাষায়, সমাজ ও পরিবারে অনেক সময় পুরুষদের বেশি সুরক্ষা দেওয়া হয়। এ কারণে অনেক কিছু থেকে যায় আড়ালে। নাদিয়া প্রশ্ন করতে চান এসব বিষয় নিয়ে, আনতে চান পরিবর্তন।

এআই দিয়ে তৈরি এই মডেলের মাসিক আয় ১ কোটি টাকা

কী করবেন সামনে

৪১ বছর বয়সী নাদিয়ার সন্তানদের একজন ইতিমধ্যে নিজের মতো করে থাকছেন, আরেক ছেলে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন আর আছে ১৫ বছর বয়সী মেয়ে। সন্তানেরা বাড়িতে এলেই তাঁদের পছন্দের রান্না চাপিয়ে দেন চুলায়।

সন্তানদের সামনে সব সময়ই উদাহরণ তৈরি করতে চান। তাই নিজের জীবনে পরিবর্তন এনেছেন। সাহস করে কথাও বলছেন। তাঁর মতে, ‘সন্তানদের দেখা দরকার যে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।’

নাদিয়া এখন জানেন না, ভবিষ্যতে তাঁর ক্যারিয়ার কেমন হবে

নাদিয়া আরও বলেন, গত বছর তিনি শিখেছেন সব সময় নিজের সত্যটা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু নাদিয়া এখন জানেন না, ভবিষ্যতে তাঁর ক্যারিয়ার কেমন হবে। কিছুদিন প্রাইমারি স্কুলে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন, কিন্তু স্বাস্থ্যগত কারণে তা চালিয়ে যেতে পারেননি। ভবিষ্যতে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। পাশাপাশি আরও টিভি শো করতে চান, যেখানে গুরুত্ব পাবে খাবার।

নাদিয়ার মতে, আগে কাজগুলোয় খাবারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো বাহ্যিক বিষয়—যেমন সেট, সাজসজ্জা বা লুক; এমনকি অনেক সময় তিনি নিজেই রেসিপি নিয়ে পুরোপুরি যুক্ত থাকতে পারতেন না।

তাই নাদিয়া এখন চান এমন কাজ করতে, যেখানে খাবারই মূল কেন্দ্রে থাকবে। পাশাপাশি আরও বই লিখতে চান, বিশেষ করে শিশুদের জন্য। আবারও যদি ছোট পরিসরেই শুরু করতে হয়, তাতে তাঁর আপত্তি নেই। তাঁর ভাষায়, ‘আমি এমন একটা জায়গা তৈরি করতে চাই, যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব। থাকব নিজের শর্তে, নিজের মতো করে।’

সূত্র: গার্ডিয়ান

যে কারণে নারী পেইন্টারদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে এখন

Read full story at source