চেরনোবিলে বন্যপ্রাণীরা যেভাবে বদলে গেছে

· Prothom Alo

চেরনোবিল দুর্ঘটনার প্রায় ৪০ বছর পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় পরে দেখা গেছে, জায়গাটি এক অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ধারণা করা হয়েছিল, এই অঞ্চল বহু বছর ধরে প্রাণহীন পড়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সেই অনুমানকে ভুল। ২০১৬ সালের মধ্যেই বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পরিত্যক্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের পুকুরে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভার।

পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি বিকিরণযুক্ত এলাকাকে বলা হয় ‘এক্সক্লুশন জোন’। ইউক্রেন অংশে এই অঞ্চল প্রায় ২,৬০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত। বেলারুশের অংশ মিলিয়ে যা সাড়ে চার হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। এত বড় একটি এলাকা এত বছর ধরে মানবশূন্য হয়ে আছে। মানুষের অনুপস্থিতির কারণে প্রকৃতি এখানে নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে।

Visit moryak.biz for more information.

রেড ফরেস্ট

প্রথমদিকে অবশ্য চিত্রটা ছিল ভয়াবহ। রিঅ্যাক্টরের কাছের পাইন বন বিকিরণ শোষণ করে মারা যায়। গাছের সবুজ পাতা লালচে-কমলা হয়ে যায়। যা ‘রেড ফরেস্ট’ নামে পরিচিত। ছোট প্রাণী ও পোকামাকড়ও অনেক জায়গা থেকে হারিয়ে যেতে থাকে।

কুমিরের মুখোমুখি হলে কী করবেন
ইউক্রেন অংশে এই চেরনোবিল অঞ্চল প্রায় ২,৬০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত। বেলারুশের অংশ মিলিয়ে যা সাড়ে চার হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। এত বড় এলাকা এত বছর ধরে মানবশূন্য হয়ে আছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে দৃশ্যপট বদলে গেছে। ৩০ বছর পর দেখা গেল, রিঅ্যাক্টরের পাশে তৈরি কুলিং পুকুর বিভারদের দখলে। আকাশে উড়ছে ঈগল ও ওসপ্রে, পানির ধারে বক শিকার করছে মাছ। একসময়কার ধ্বংসস্তূপ এখন প্রাণীতে ভরপুর বাস্তুতন্ত্রে পরিণত হয়েছে।

মানুষের কল্পনায় চেরনোবিল মানেই বিকৃত প্রাণীর রাজ্য। দুই মাথার মাছ, নীল রঙের কুকুর বা অদ্ভুত মিউটেশন। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু খুব কমই দেখা যায়। প্রকৃতি নিজের মতো করে এখানে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার করেছে। তবে একেবারে আগের মতো না, বরং নতুন এক রূপে। প্রায় চার দশক পর চেরনোবিল দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে অস্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রগুলোর একটি হিসেবে। যেখানে বিকিরণ আছে, মানুষ নেই।

বাদুড়ের দেহে কি কুকুর বা বিড়ালের চেয়ে বেশি রোগজীবাণু আছে
মানুষের কল্পনায় চেরনোবিল মানেই বিকৃত প্রাণীর রাজ্য। দুই মাথার মাছ, নীল রঙের কুকুর বা অদ্ভুত মিউটেশন। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু খুব কমই দেখা যায়।

১. বড় প্রাণীরা ফিরেছে

সাধারণত পরিবেশগত বিপর্যয়ের পর বড় প্রাণীরাই সবচেয়ে আগে হারিয়ে যায়। কিন্তু চেরনোবিলে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। এখানে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে নেকড়ে, ভালুক, বাইসন, হরিণ, বন্য শূকর। এমনকি মঙ্গোলিয়ার বন্য ঘোড়াও আছে। নদী ও খালে ফিরে এসেছে বিভার। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এদের মধ্যে বড় ধরনের বিকৃতি খুব একটা দেখা যায় না। কারণ যেসব প্রাণীর শরীরে গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়, তারা সাধারণত বেঁচে থাকতে পারে না। বিজ্ঞানীদের মতে, এই পুনরুত্থানের আসল কারণ বিকিরণ না, মানুষের অনুপস্থিতি। শিকার করার কেউ নেই, কৃষিকাজ নেই, মানুষের চাপ নেই। ফলে প্রাণীরা নিজেদের মতো করে বেড়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে।

২. কালো হয়ে যাওয়া ব্যাঙ

চেরনোবিলের ইস্টার্ন ট্রি ফ্রগকে দেখলে একটা পরিবর্তন টের পাওয়া যায়। আগে এরা ছিল উজ্জ্বল সবুজ রঙের। এখন এদের অনেকেই গাঢ় কালচে রঙের। গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যাঙ আগের তুলনায় বেশি কালো। এর কারণ, এদের শরীরে মেলানিনের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

চেরনোবিলের ইস্টার্ন ট্রি ফ্রগ আগে ছিল উজ্জ্বল সবুজ রঙের। এখন এদের অনেকেই গাঢ় কালচে রঙের

মেলানিন বিকিরণ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। এটি কোনো নতুন বৈশিষ্ট্য না। আগে থেকেই কিছু ব্যাঙ স্বাভাবিকের তুলনায় গাঢ় কালো রঙের ছিল। কঠিন পরিবেশে তারাই বেশি টিকে গেছে এবং বংশবিস্তার করেছে। ফলে ধীরে ধীরে পুরো জনগোষ্ঠীর চেহারা বদলে গেছে।

ব্যাঙ নিয়ে যত কল্পকথা
চেরনোবিলের ইস্টার্ন ট্রি ফ্রগ আগে ছিল উজ্জ্বল সবুজ রঙের। এখন এদের অনেকেই গাঢ় কালচে রঙের। এর কারণ, এদের শরীরে মেলানিনের পরিমাণ বেড়ে গেছে।

৩. বিকিরণেও বেঁচে থাকা ছত্রাক

চেরনোবিলের সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারগুলোর একটি হলো কালো মেলানিনসমৃদ্ধ ছত্রাক। এই ছত্রাকগুলো ভেঙে পড়া রিঅ্যাক্টরের ভেতরেও জন্মায়, যেখানে অন্য কোনো প্রাণ টিকে থাকতে পারে না। অদ্ভুত বিষয় হলো, কিছু ছত্রাক বিকিরণের মধ্যে আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এদের মেলানিন শুধু সুরক্ষা দেয় না, বরং বিকিরণকে কোনোভাবে কাজে লাগাতেও সাহায্য করতে পারে। যদিও এই রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

৪. কুকুরদের জিনে বদল

দুর্ঘটনার সময় অনেক মানুষ তাদের পোষা কুকুর ফেলে রেখে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সেই কুকুরগুলোর বংশধররাই এখন চেরনোবিলে বসবাস করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কুকুরগুলো ইউক্রেনের অন্য অঞ্চলের কুকুরদের থেকে জেনেটিকভাবে আলাদা হয়ে গেছে।

চেরনোবিলের দুর্ঘটনার সময় বসবাসরত কুকুরগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন

অনেকে মনে করেন, বিকিরণের কারণে এদের মধ্যে দ্রুত মিউটেশন হয়েছে। কিন্তু আসল কারণ হলো এরা দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন। এদের ছোট জনসংখ্যা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং ইনব্রিডিং এদেরকে আলাদা করেছে।

কুকুর কি রং দেখতে পায়
গবেষণায় দেখা গেছে, চেরনোবিলের দুর্ঘটনার সময় বসবাসরত কুকুরগুলো ইউক্রেনের অন্য অঞ্চলের কুকুরদের থেকে জেনেটিকভাবে আলাদা হয়ে গেছে।

৫. বন আর নীরব নেই

বিস্ফোরণের পর চেরনোবিলের অনেক বন ছিল অদ্ভুতভাবে নীরব। গাছপালা থাকলেও পাখির ডাক বা পোকামাকড়ের শব্দ শোনা যেত না। একে বলা হতো ‘খালি বন’। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই নীরবতা ভেঙে গেছে। এখন বসন্তকালে অনেক জায়গা ভরে ওঠে পাখির ডাকে। এই বন ভরে উঠেছে ওয়ার্বলার, কোকিল, নাইটিঙ্গেলের সুরেলা ডাকে। তবে পরিবর্তন সবখানে সমানভাবে ঘটেনি। কিছু এলাকায় এখনও পোকামাকড় কম, ফলে পাখির সংখ্যাও ওঠানামা করে।

চেরনোবিলের অনেক বনে এখন পাখি ওড়ে

চেরনোবিল প্রমাণ করে না যে বিকিরণ নিরাপদ। আবার এটাও দেখা যায় না যে মানুষ না থাকলেই বুঝি প্রকৃতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। বরং চেরনোবিল থেকে দেখা যায়, যখন পরিবেশের স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙে পড়ে, তখন প্রকৃতি থেমে থাকে না। নতুনভাবে প্রকৃতি মানিয়ে নেয়, নতুন ভারসাম্য তৈরি করে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদকসূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাসমাছের অজানা ৭

Read full story at source