বিশ্ব মাস্তানতন্ত্রের হুমকিতে দুনিয়ার শান্তি ও নিরাপত্তা

· Prothom Alo

পাড়ার মাতাল মাস্তান যেভাবে ক্ষমতা দেখায়, গর্বের সঙ্গে খুন-জখমের কথা বলে, ইচ্ছেমতো মানুষজনকে অত্যাচার করে, যেভাবে আইনকানুনের তোয়াক্কা না করার বাহাদুরি করে, সে রকমই আমাদের এখন দেখতে হচ্ছে বিশ্বের প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলবলকে। তাঁর প্রধান গৌরব তাঁদের কাছে মানুষ খুন আর দেশ ধ্বংসের সর্বাধুনিক অস্ত্র আছে। তাঁর প্রধান আকাঙ্ক্ষা সব দেশে তাঁদের করপোরেট সাম্রাজ্য নিশ্চিত হবে, কোনো প্রতিযোগী থাকবে না, ইচ্ছেমতো শুল্ক আরোপ থেকে সামরিক অভিযান চলবে। সবাই ভয়ে ‘নম নম’ করবে।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

মনে হচ্ছে এক ব্যক্তি ক্ষমতায় বসে পুরো বিশ্ব তছনছ করে দিচ্ছে। কিন্তু পুরোটা যে ব্যক্তি মাস্তানতন্ত্র নয়, তা বোঝা যায় যখন আমরা দেখি বিশ্বের সব বড় বড় ভদ্রলোক–মিডিয়া, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইউরোপসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রধান তাঁরাও এর সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক। তার মানে এটা একটা বিশ্বব্যবস্থার সর্বশেষ চিত্র, যেখানে সাম্রাজ্যবাদ নগ্ন মাস্তানতন্ত্রের রূপ নিয়েছে। যেখানে শান্তি মানে যুদ্ধ, উন্নয়ন মানে মানব বিপর্যয়, প্রতিশ্রুতি মানে প্রতারণা, যেখানে সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার খুন ও ধ্বংস মানে যুদ্ধ খাতে।

এই বছরের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সামরিক রক্তক্ষয়ী হামলা চালিয়ে সে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণ করে। তাঁকে নিউইয়র্কে এনে আটকে রাখা হয়েছে। ছয় দশকের মার্কিন অবরোধ মোকাবিলা করে টিকে থাকা কিউবা দখলের হুমকি দিচ্ছে, হামলা করছে। হুমকি দিচ্ছে ব্রাজিল, মেক্সিকোকে।

আর ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে, ইরানের সঙ্গে তথাকথিত পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলা অবস্থাতেই, ইসরায়েলসহ আক্রমণ চালাল যুক্তরাষ্ট্র। দেড় শতাধিক স্কুলছাত্রীসহ খুন করল সে দেশের প্রধান ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গর্বের সঙ্গে এই হামলা ও হত্যাযজ্ঞের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁদের আইন মানার কোনো দরকার নেই।

তাঁদের এই ঔদ্ধত্যের অন্যতম উৎস ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর আনুগত্য। সৌদি আরব গত কয়েক বছরে ছয় হাজার কোটি ডলারের বেশি অস্ত্রশস্ত্র কিনেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাই। এই সবগুলো দেশেই আছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। তাদের সমর্থনই ফিলিস্তিন থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলি প্রশাসনের সামরিক আগ্রাসনের অন্যতম শক্তি।

যুক্তরাষ্ট্রকে ‘খ্রিষ্টান রাষ্ট্র’ বানাতে কেন মরিয়া ট্রাম্প

কিন্তু এভাবে কি অন্য দেশে ইচ্ছেমতো ঘোষণা দিয়ে আগ্রাসন, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ড চালানো যায়? আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইনকানুন, মানবাধিকার, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি কোথায়? নেই। জাতিসংঘ বলে যে কোনো প্রতিষ্ঠান আছে, তার কার্যকারিতা টেরই পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের কোনো অপরাধই ইউরোপীয় ইউনিয়নকে মানবাধিকার বিষয়ে আগ্রহী করতে পারে না।

লক্ষণীয় যে ইরান আগ্রাসনের প্রধান দুই ব্যক্তি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনই বিভিন্ন অপরাধে নিজ নিজ দেশের আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত এবং আরও তদন্তের আওতায়। আন্তর্জাতিক আদালত যদি কাজ করত, তাহলে তাঁরা দুজনই যুদ্ধাপরাধী হিসেবে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। গাজায় গণহত্যার জন্য নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে এই রায়ও আছে।

ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বলছেন ইরান তাঁদের জন্য অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করছে। আসলে উল্টো তাঁদের কারণেই পুরো বিশ্ব এখন নিরাপত্তা হুমকিতে। মার্কিন জোট তাদেরই নিশ্চিহ্ন করতে চায়, যারা সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু দেশে দেশে এই প্রত্যাখ্যানের শক্তি বাড়ানো ছাড়া প্রাণপ্রকৃতি, মানুষসহ দুনিয়ার অস্তিত্ব রক্ষার আর কোনো পথ নেই।

ইতিহাসের দিকে তাকালে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অসংলগ্ন মনে হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত কয়েক দশকে গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস দেখলে ঘাতক বা ধ্বংসকারী হিসেবে এই রাষ্ট্রের চেহারাই সবচেয়ে ভয়ংকর দেখা যায়। মানব ইতিহাসে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের কারণে মুহূর্তের মধ্যে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এরপরও ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, নিকারাগুয়া, ইরাকসহ বহু দেশে লাখ লাখ মানুষ হত্যা, একের পর এক জনপদ ধ্বংস করায়, বহু দেশের সম্ভাবনা বিনাশে তাদের ভূমিকাই প্রধান।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পরে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান চালানো হয়। মার্কিন সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কথাবার্তার মধ্যে তখনই ছিল এরপর ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া এবং ইরান দখলের পরিকল্পনা। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে এর আগেই অবরোধে বিপর্যস্ত ইরাক আক্রমণ ও দখল করে মার্কিন প্রশাসন।

যৌক্তিকতা তৈরির জন্য সাজানো হয় মানববিধ্বংসী অস্ত্রের মিথ্যা গালগল্প। যথারীতি দখলকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর এর কোনো সন্ধান কেউ পায়নি। অর্থাৎ বছরের পর বছর ধরে যে বিষয় প্রচার করে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত এবং বিদ্বেষী করে তোলা হলো, বিপুল সম্পদ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত থেকে উঠিয়ে নিয়ে যুদ্ধ আয়োজনে লাগানো হলো, যে অজুহাত ধরে জাতিসংঘের সদস্য সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর একতরফা হামলা, গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হলো এবং সবশেষে ঔপনিবেশিক দখলদারত্ব কায়েম করা হলো, সেই পুরো ব্যাপারটাই জালিয়াতি, প্রতারণা এবং পুরোপুরি মিথ্যাচার। কিন্তু এর জন্য দায়ী মার্কিন প্রশাসন, বিশেষত একাধিক প্রেসিডেন্টকে কোনো জবাবদিহি করতে হয়নি, যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাঁদের দণ্ডিত হওয়ার কথা।

উদার বিশ্বব্যবস্থা তার শেষ ভোরটা দেখে ফেলেছে

ইরাকের পর লিবিয়া, সিরিয়া দখলে আসে; এখন ইরান একটানা আক্রমণের মুখে। একের পর এক দেশগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ, নারী–পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ, নিহত–আহত হয়েছেন। অপরিমেয় সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, প্রাণপ্রকৃতি, পরিবেশ বিপন্ন হয়েছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে মানুষকে অসুস্থ করে তোলা হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে সাদ্দাম, গাদ্দাফি, আসাদদের অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের পকেটে থাকতে সম্মত ছিলেন না। পকেটে থাকলে আল–কায়েদার নেতাও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানের কথা বলে ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া সবগুলো দেশেই সেক্যুলার সরকার সরিয়ে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীগুলোকেই ক্ষমতায়িত করা হয়েছে।

ইরানে শাসক পরিবর্তনের ঘোষণা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র জোট। গত কয় বছরে ইরানে প্রায়ই সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ঘটনা দেখেছি আমরা। ইরানের লাখ লাখ নারী–পুরুষ বারবার প্রতিবাদে নেমেছেন অর্থনৈতিক সংকট এবং নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার জগদ্দল পাথর থেকে মুক্তির জন্য। তার অর্থ এটা নয় যে তারা মার্কিন প্রশাসনের হাতে বা তাদের পোষা পাহলভিদের হাতে আবারও দেশটিকে তুলে দিতে চান। কী ধরনের শাসন মার্কিন সাম্রাজ্যের আকাঙ্ক্ষিত, তা বুঝতে তাকাতে হবে পাশের দেশগুলোর দিকে—সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত...।

ইসরায়েলের আগ্রাসন যেভাবে ভীতিকর বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করছে

বিষয় হলো এমন শাসক চাই, যারা সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষা করবে। ইরানে ১৯৫৩ সালে নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে উচ্ছেদ করে স্বৈরশাসক শাহানশাহকে বসিয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষিত মডেল স্পষ্ট করেছিল। সে কারণে পঞ্চাশের দশক থেকে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে সামরিক বা বেসামরিক বা রাজতন্ত্রী স্বৈরশাসক ক্ষমতার উৎস এই মার্কিন-ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। বিশ্বজুড়ে ভয়ংকর নজরদারি সামরিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, ধর্ম-মিডিয়া নেটওয়ার্ক সেভাবেই দাঁড় করানো হয়েছে। আসলে মার্কিন আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের কোথাও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কোনো দৃষ্টান্ত নাই।

বাংলাদেশও এসব আগ্রাসনের বাইরে নয়। ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে মার্কিন সেনা, প্রযুক্তি আসা এবং তাদের দায়মুক্তির চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে দুই দশকের বেশি আগে। গত কিছুদিনে অন্তর্বর্তী সরকার আরও বিপদের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা চলাকালেই মার্কিন বাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেখানে বিশাল পর্যটনকেন্দ্র করার পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়। এই মার্কিন এজেন্ডায় সেনাবাহিনী জোগান দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশকে বলা হলেও তেমন সাড়া পায়নি ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আগবাড়িয়ে তাতে যোগ দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।

ইরানে হামলা ও ইসরায়েলি বিলবোর্ডের ‘বারো ভাইয়া’

দ্বিতীয়ত, ট্রাম্পের বিশ্বজুড়ে শুল্ক আগ্রাসন অবৈধ ঘোষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রেরই সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ট্রাম্পকে খুশি করার আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। সে জন্য সারা বিশ্বের বহু দেশ না করলেও, নির্বাচিত সরকারের জন্য রেখে দেওয়ার সুযোগ থাকলেও, নির্বাচনের দুদিন আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন চুক্তি করেছে, যা বাংলাদেশকে দীর্ঘদিনের জন্য একটা ভয়ংকর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধীনতার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। এই ধারায় আরও চুক্তির প্রস্তুতি চলছে। বাংলাদেশে সামনে তাই আরও দখল, সন্ত্রাস, নৈরাজ্যের হুমকি মোকাবিলা করতে হবে।

ট্রাম্প, নেতানিয়াহু বলছেন ইরান তাঁদের জন্য অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করছে। আসলে উল্টো তাঁদের কারণেই পুরো বিশ্ব এখন নিরাপত্তা হুমকিতে। মার্কিন জোট তাদেরই নিশ্চিহ্ন করতে চায়, যারা সাম্রাজ্যবাদী কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু দেশে দেশে এই প্রত্যাখ্যানের শক্তি বাড়ানো ছাড়া প্রাণপ্রকৃতি, মানুষসহ দুনিয়ার অস্তিত্ব রক্ষার আর কোনো পথ নেই।

  • আনু মুহাম্মদ শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source