বিছানাকান্দি থেকে লক্ষণছড়ার পথে হেঁটে চলা
· Prothom Alo

ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি, কাজের চাপ আর প্রতিদিনের নানা চিন্তার বাইরে গিয়ে যখন প্রকৃতির কাছে দাঁড়ানো যায়, তখন মনটা যেন অন্য রকম হয়ে ওঠে। নতুন কিছু দেখা, অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানা—সব মিলিয়ে ভ্রমণ হয়ে ওঠে একধরনের শিক্ষা।
এই ভাবনা থেকেই পরিকল্পনা করেছিলাম কোনো এক ছুটিতে সিলেটে গিয়ে বর্ডার হাইকিং করব। শুধু পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখাই নয়; সিলেটের পাহাড়, ঝরনা, সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করব। অবশেষে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলো।
Visit casino-promo.biz for more information.
বিছানাকান্দি থেকে লক্ষণছড়া
২ সেপ্টেম্বর রাত ১০টায় টঙ্গী থেকে বাসে করে সিলেটের উদ্দেশে রওনা দিলাম। পরদিন সকাল ৮টার দিকে সিলেট শহরে পৌঁছাই। নাশতা করে হোটেলে চেক-ইন করলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম বিছানাকান্দির উদ্দেশে।
শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে যেতে একটি সিএনজি ভাড়া করলাম। ঘাটে পৌঁছে জানতে পারলাম, এরপর নৌকায় যেতে হবে। নৌকার ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় শেয়ারিং করে নৌকায় উঠলাম।
নৌকা যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছিল, চারপাশের দৃশ্য যেন ক্রমেই বদলে যাচ্ছিল। একদিকে দূরের পাহাড়, অন্যদিকে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি, আর মাঝখানে নদীর শান্ত জল। প্রকৃতির এই মিলন আমাকে মুগ্ধ করে।
প্রায় তিন ঘণ্টা নৌপথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছালাম বিছানাকান্দি। সেখানে পৌঁছে সত্যিই কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে গিয়েছিলাম। পাহাড়, পাথর আর স্বচ্ছ শীতল পানির এমন সমন্বয় আগে খুব কাছ থেকে অনুভব করিনি। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। পানি এতটাই ঠান্ডা ও স্বচ্ছ যে কিছুক্ষণ পর আমিও সেই পানিতে শুয়ে পড়লাম। শহরের সব ক্লান্তি যেন সেই ঠান্ডা পানির স্রোতে ধুয়ে যাচ্ছে।
প্রায় দুই ঘণ্টা বিছানাকান্দিতে কাটানোর পর শুরু করলাম আমাদের মূল পরিকল্পনা বর্ডার হাইকিং। গন্তব্য ছিল লক্ষণছড়া। নৌকায় করে আরও কিছুটা এগিয়ে স্থানীয় একজন মাঝিকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের কাছাকাছি থেকে হাঁটা শুরু করলাম।
ছবি: লেখকপাহাড়ের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চারপাশের দৃশ্য বারবার থামিয়ে দিচ্ছিল। পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট ঘরবাড়ি, সবুজ প্রকৃতি আর নির্জন পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, শহুরে জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো পৃথিবীতে চলে এসেছি।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর শুরু হলো ঝুমবৃষ্টি। আমরা একটি স্থানীয় বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টির মধ্যে সেখানে বসে বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হলো। তাঁদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে পারলাম। জানলাম তাঁদের কাজ, শিকার এবং আয়ের উৎস সম্পর্কে।
তাঁদের জীবন খুবই সাধারণ। বিদ্যুৎ নেই, ইন্টারনেট নেই, শহুরে জীবনের অনেক সুবিধাই নেই। অথচ তাদের জীবনে রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে এক অদ্ভুত নিবিড় সম্পর্ক। বাড়ির পাশে গাছপালা, গরু-ছাগল, সাধারণ একটি ঘর আর বারান্দায় খেলতে থাকা ফুটফুটে একটি শিশু—দৃশ্যটি খুব সাধারণ হলেও আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে।
একটা বিষয় উপলব্ধি করলাম, আমরা শহরের মানুষ আধুনিক জীবনের অসংখ্য সুবিধা পেয়েও অনেক সময় শান্তি খুঁজে পাই না। অথচ প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকা এই মানুষগুলো হয়তো অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, কিন্তু তাঁরা প্রকৃতির যে নির্মল সৌন্দর্য প্রতিদিন অনুভব করতে পারেন, সেটি আমাদের জীবনে খুবই বিরল।
ছবি: লেখকবৃষ্টি থামার পর আবার হাঁটা শুরু করলাম।
পাহাড়ের ওপর থেকে ঝরনার পানি নেমে আসছিল। কোথাও পাথরের ওপর দিয়ে স্বচ্ছ পানি বয়ে যাচ্ছে, কোথাও পাহাড়ের গা বেয়ে ছোট ছোট ঝরনা নেমে আসছে। যত সামনে যাচ্ছিলাম, প্রকৃতি যেন তার সৌন্দর্যের নতুন নতুন অধ্যায় খুলে দিচ্ছিল।
অবশেষে পৌঁছালাম লক্ষণছড়া। সেখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, পাহাড়ের বুক চিরে যেন স্বর্গের কোনো এক অদৃশ্য ধারা নেমে এসেছে। পাথর, পাহাড় আর স্বচ্ছ পানির সেই দৃশ্য আমাকে সত্যিই অভিভূত করেছিল।
অনেকক্ষণ সেখানে ছিলাম, ছবি তুললাম, চারপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। কিন্তু কিছু কিছু দৃশ্য ছবি দিয়ে ধরে রাখা যায় না, সেগুলো শুধু অনুভব করতে হয়।
লক্ষণছড়া থেকে আবার বর্ডার ধরে হাইকিং করে ফিরতে শুরু করলাম। পরে নৌকায় করে ঘাটে ফিরে এলাম। শহরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত প্রায় ৮টা।
সংগ্রাম থেকে উত্তরণের স্বপ্নসিলেট শহরের রাত
দিনভর পাহাড়, নদী আর ঝরনার সঙ্গে সময় কাটানোর পর রাতে সিলেট শহরে ফিরে বিখ্যাত পাঞ্জী হোটেলে রাতের খাবার খেলাম।
খাওয়া শেষে গেলাম সিলেটের অন্যতম পরিচিত স্থান হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শরিফে। সেখানে কিছু সময় কাটিয়ে আবার ফিরে এলাম।
হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। সারা দিনের ক্লান্তি তখন শরীরে, কিন্তু মনের মধ্যে ছিল অদ্ভুত এক প্রশান্তি। একদিনেই এত কিছু দেখেছি, এত মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, এত নতুন অভিজ্ঞতা হয়েছে—সবকিছু মনে করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছি, টেরই পাইনি।
ছবি: লেখকসাদাপাথরের মায়াবী জগৎ
পরদিন সকাল ৮টার দিকে ঘুম থেকে উঠে দ্বিতীয় দিনের যাত্রা শুরু করলাম। গন্তব্য এবার সাদাপাথর।
বাসে করে সাদাপাথরের উদ্দেশে রওনা করি। মজার ব্যাপার হলো, যে বাসে করে গিয়েছিলাম সেটির নামও ছিল ‘সাদাপাথর’।
সাদাপাথরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর প্রথম যে দৃশ্যটি চোখে পড়ল, সেটিই আমাকে আনন্দে ভরিয়ে দিল, পাহাড়ের ওপর মেঘ ভাসছে। মেঘের সেই ভেসে থাকা দৃশ্য এতটাই সুন্দর ছিল যে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজের হাতে একটা ছবি এঁকে দিয়েছে।
সাদাপাথরে পৌঁছে শেয়ার করে একটি নৌকা ভাড়া করলাম। নৌকায় করে ভেতরের দিকে যেতে যেতে চারপাশের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
পাহাড় থেকে অগণিত ধারায় পানি নেমে আসছে। গভীর স্রোত, অসংখ্য পাথর আর বরফশীতল স্বচ্ছ পানি—সব মিলিয়ে জায়গাটাকে অসম্ভব মায়াবী মনে হচ্ছিল।
তবে বিছানাকান্দির তুলনায় সাদাপাথরে মানুষের ভিড় অনেক বেশি। পর্যটকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় জায়গাটার পরিবেশ কিছুটা আলাদা মনে হয়েছে। তারপরও প্রায় দুই ঘণ্টা সেখানে থেকে অনেক আনন্দ করেছি, পানিতে নেমেছি, চারপাশ ঘুরে দেখেছি এবং অনেক স্মৃতি ক্যামেরাবন্দী করেছি।
দুই ঘণ্টা পর আবার ঘাটে ফিরে এলাম। সেখান থেকে বাসে করে সিলেট শহরে ফিরে এসে বেলা ৩টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলাম।
দীর্ঘ যাত্রার পর রাত প্রায় ১২টার দিকে ঢাকায় পৌঁছাই।
শেষ অনুভূতি
দুই দিনের এই ভ্রমণ জীবনের অন্যতম সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে। সিলেট শুধু পাহাড়, ঝরনা আর পাথরের জন্যই আমাকে মুগ্ধ করেনি। শহরের সৌন্দর্য, চারপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, পাহাড়ি জনপদ, মানুষের জীবনযাপন, তাদের সংস্কৃতি ও ভাষা সবকিছু মিলিয়ে জায়গাটার প্রতি আলাদা একটা ভালো লাগা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে মানুষের ব্যবহার। অপরিচিত হয়েও তাঁরা যে আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলেছে, নিজেদের জীবন সম্পর্কে জানিয়েছে সেটা সত্যিই মনে রাখার মতো।
এই ভ্রমণ আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, জীবনে কখনো কখনো সবকিছু থেকে একটু দূরে সরে যেতে হয়। পাহাড়ের কাছে যেতে হয়, ঝরনার পানিতে পা ভেজাতে হয়, বৃষ্টিতে দাঁড়াতে হয়, অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে হয়।
লেখক: সিনিয়র অফিসার, রেনটা পিএলসি