কেমব্রিজের কুয়াশায় ক্রিস্টোফার রাউন্ডের ছায়া: প্রেম, ঈর্ষা ও এক অশান্ত আত্মার গল্প
· Prothom Alo

ভূত নিয়ে কৌতূহল কেবল আমাদের নয়, পৃথিবীর সব দেশের মানুষের মধ্যে থেকে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আজকের এআইয়ের যুগে এসেও এর ব্যতিক্রম হয়নি; বরং ভূত এখন উদ্যাপনের বিষয়। তবে ক্রিস্টোফার রাউন্ডের মতো এমন কাহিনি আছে ইংল্যান্ডের নানা জায়গায়।
ইংল্যান্ডের হাজার বছরের ইতিহাসের আনাচকানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ভৌতিক উপকথা। প্রায় প্রতিটি শহরেই রয়েছে এমন কিছু প্রাচীন গির্জা, প্রশাসনিক ভবন, দুর্গ কিংবা রেলস্টেশন, যেগুলো ঘিরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে আছে অদ্ভুত সব ভূতের গল্প। কোথাও পরিত্যক্ত কোনো রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মধ্যরাতে শোনা যায় অদৃশ্য কারও পায়ের শব্দ, কোথাও আবার শতাব্দীপ্রাচীন কোনো গির্জার ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে মিশে থাকে অশরীরী উপস্থিতির গল্প।
Visit turconews.click for more information.
কেমব্রিজের কিংস কলেজযুক্তরাজ্যে বর্তমানে আমার বসবাস কেমব্রিজ শহরে। হাজার বছরের বেশি সময়ের ইতিহাস বুকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে থাকা এই শহর একদিকে যেমন জ্ঞানচর্চা, দর্শন ও বিজ্ঞানের তীর্থস্থান; অন্যদিকে এর প্রাচীন অলিগলি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক কলেজ, নিস্তব্ধ বাগান আর পাথরের দেয়ালঘেরা পথের পরতে পরতে জমে আছে নানা গল্পকাহিনি। রোমানদের পদচিহ্ন থেকে অ্যাংলো-স্যাক্সনদের বসতি কেমব্রিজের ইতিহাস যেন সময়ের দীর্ঘ এক যাত্রা। দিনের আলোয় শহরটি জ্ঞান, সৌন্দর্য আর আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু হ্যালোউইনের রাতে যখন পুরোনো ভবনগুলোর গায়ে কুয়াশা জমে, নিস্তব্ধ বাগানের গাছগুলো অন্ধকারে অস্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন এই শহরের কিছু লোককথা যেন নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মানুষ আমি। ভূত, প্রেত, বল্লা, জিন, দেওয়ের গল্প শুনে কেটেছে আমাদের শৈশব। তাই এহেন ঘোর হ্যালোউইন, অর্থাৎ তেনাদের রাত্রে বেরোলাম ভূতের খোঁজে। তেনারা ব্রিটিশ ভূত। যেসব ভূতকে নাকি পেলেপুষে রাখে ব্রিটিশ হেরিটেজ। তেনাদের ঘাঁটতে গিয়ে খোঁজ মিলল কেমব্রিজের বিখ্যাত প্রেমিক ভূত খ্রিস্টোফার রাউন্ডের। যার নাম জড়িয়ে আছে কেমব্রিজের ক্রাইস্টস কলেজ ফেলোজ গার্ডেনের একটি বিখ্যাত পুরোনো মালবেরিগাছ ঘিরে। খ্রিস্টোফারের তেনারা নাকি পূর্ণিমা রাতে সেই গাছের আশপাশে অদ্ভুত ছায়ামূর্তি হয়ে ঘুরে বেড়ায়। দেখতে লম্বা, বয়স্ক এক পুরুষ। শরীর সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে আছে, মাথায় পুরোনো দিনের বিভার-ফেল্টের টুপি। নিঃশব্দে, ধীর পায়ে সে ঘুরে বেড়ায় গাছটির চারপাশে। তার নাম ক্রিস্টোফার রাউন্ড।
ক্রাইস্ট’স কলেজের গ্রেট গেটবলা বাহুল্য, ক্রাইস্টস কলেজের ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। এই কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন চার্লস ডারউইন, জন মিল্টন, জে রবার্ট ওপেনহাইমার, সাচা ব্যারন কোহেন, রোয়ান উইলিয়ামস, জগদীশ চন্দ্র বসু, লর্ড মাউন্টব্যাটেন, জান স্মাটস, মার্টিন ইভান্স, ডানকান হ্যালডেন, জন অলিভারের মতো বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে যাঁদের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তাঁদেরই পদচারণে একসময় মুখর ছিল এই কলেজের প্রাঙ্গণ। সেই প্রাঙ্গণে নাকি ঘাপটি মেরে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত বছর আগের মৃত ক্রিস্টোফার রাউন্ডের তেনারা। যার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত প্রেম, ঈর্ষা ও মৃত্যুর উপাখ্যান।
কিংবদন্তি অনুসারে, উনিশ শতকের শুরুর দিকে ক্রাইস্টস কলেজের ক্ল্যাসিক্যাল স্টাডিজের ফেলো ছিল ক্রিস্টোফার রাউন্ড। একসময় সে প্রেমে পড়ে লেডি মেরি ক্লিফোর্ড নামের এক অসাধারণ সুন্দরী নারীর। কিন্তু সেই প্রেমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় কলেজেরই আরেক পণ্ডিত ফিলিপ কলিয়ার। সেও ভালোবাসত মেরিকে। একই নারীকে ঘিরে দুই পুরুষের এ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধীরে ধীরে এক অন্ধকার পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। এক সন্ধ্যায় অতিরিক্ত মদ্যপানের পর ফিলিপ কলিয়ার কলেজের প্রাঙ্গণে থাকা একটি খোলা সুইমিংপুলে পড়ে যায়। ঠান্ডা পানিতে হাবুডুবু খেতে খেতে সে প্রাণ বাঁচানোর জন্য চিৎকার করতে থাকে। আশপাশে কেউ নেই। কিন্তু ঘটনাস্থলের কাছেই ছিল ক্রিস্টোফার রাউন্ড।
শত বছরের পুরনোকলিয়ারকে বাঁচানোর সুযোগ ক্রিস্টোফারের ছিল। কিন্তু প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বীকে উদ্ধারের পরিবর্তে সে কলিয়ারকে মৃত্যুর মুখে ফেলে চলে যায়।
ফিলিপ কলিয়ারের মৃত্যু হয়।
কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়; বরং শুরু হয় আরও অন্ধকার এক অধ্যায়ের।
হয়ত এখানেই ঘুরে বেড়ায় ক্রিস্টোফার রাউন্ডের প্রেতাত্মাকথিত আছে, কলিয়ারের মৃত্যুর পর থেকেই রাউন্ডের মধ্যে জন্ম নেয় গভীর অনুশোচনা। যে ঈর্ষা ও প্রতিহিংসা তাকে একসময় নিষ্ঠুর করে তুলেছিল, মৃত্যুর পরও সেই অপরাধ বোধ থেকে সে মুক্তি পায়নি। তার অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও ক্রাইস্টস কলেজের বাগানে ঘুরে বেড়ায়। বিশেষ করে সেই পুরোনো মালবেরিগাছের আশপাশে। পূর্ণিমা রাতে নাকি গাছটির কাছে দেখা মেলে এক লম্বা, বয়স্ক পুরুষের। মাথায় পুরোনো দিনের বিভার টুপি, শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে। সে ধীরে ধীরে গাছটির চারপাশে হাঁটে, যেন বহন করে চলেছে এমন এক অপরাধের ভার, যা থেকে মৃত্যুও তাকে মুক্তি দিতে পারেনি।
তবে এই গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ে যায় শৈশবের আরেকটি ঘটনা। আমাদের এলাকার এক আরবি শিক্ষকের কথা। ছোটবেলায় শোনা সেই কাহিনি আমার স্মৃতিতে এমনভাবে গেঁথে আছে যে ঘন কুয়াশার কোনো শীতের সকাল দেখলেই সেটি মনে পড়ে যায়। আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এমন হাজারো ভূতের গল্প শুনে। শীতের রাতে কিংবা সন্ধ্যার পর ঘরে বড়দের মুখে শোনা সেই সব গল্প এতটাই জীবন্ত হয়ে উঠত যে গল্প শেষ হওয়ার পর বসার ঘর থেকে নিজের শোবার ঘরে যেতেও বুকের ভেতর কেমন একটা ভয় কাজ করত। অন্ধকার বারান্দা, জানালার বাইরের গাছের নড়াচড়া কিংবা দূরের কোনো অচেনা শব্দ সবকিছুর মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকত কোনো অদৃশ্য উপস্থিতি।
তো সেই আরবি শিক্ষকের বাড়ি ছিল আমাদের পার্শ্ববর্তী উপজেলা কানাইঘাটে। তিনি নাকি প্রেমে পড়েছিলেন আমাদের গ্রামের এক বিধবা নারীর। সেই নারীর স্বামী মধ্যপ্রাচ্যে মারা গিয়েছিলেন। স্বামীহারা হওয়ার পর জীবনের একাকিত্বে তিনি হয়তো নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আর সেই স্বপ্নের সঙ্গী হয়েছিলেন ওই আরবি শিক্ষক। কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা মেনে নিতে পারেনি এলাকাবাসী।
সমাজের চোখে তাঁদের সম্পর্ক ছিল অপরাধ। শুরু হয় নানা অপবাদ, কটূক্তি আর সামাজিক নির্যাতন। একপর্যায়ে সেই বিধবা নারীকে শাস্তি দেওয়া হয়। অপমান, লাঞ্ছনা আর অসহায়ত্বের ভার হয়তো আর বইতে পারেননি তিনি। একদিন মসজিদের কাছের একটি করচগাছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন।
তার পর থেকেই শুরু হয় আরেক গল্প।
সেটি ছিল শীতকালের। প্রতিবছর ঘন কুয়াশায় ঢাকা শীতের ভোরে ফজরের আজানের সময় নাকি মসজিদের আশপাশে দেখা যেত সাদা থান পরা এক নারীকে। মুখ ঢাকা থাকত সাদা কাপড়ে। কখনো শোনা যায় বোবা কান্নার গোঙানির শব্দ। তাঁকে দেখা যেত মসজিদের পাশের বোরো ধানখেতের বেড়ার ওপর ভিজে চুপসে যাওয়া ধবধবে সাদা কাপড় মেলে দিতে। কেউ বলতেন, তিনি সেই মৃত বিধবা নারী। কেউ বলতেন, তাঁর অতৃপ্ত আত্মা আজও ফিরে আসে সেই পরিচিত জায়গায়। যে সমাজ তাঁকে বাঁচতে দেয়নি, সেই সমাজের কাছেই যেন বারবার ফিরে আসেন তিনি।
কিন্তু ছোটবেলায় এসব গল্প শোনার পর সবচেয়ে বেশি ভয় লাগত ভোরের দিকে। চারপাশ যখন কুয়াশায় ঢাকা, দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে, আর বাড়ির উঠানে জমে থাকা শিশিরে পা ভিজে যাচ্ছে; তখন মনে হতো, সত্যিই কি কোথাও সাদা থান পরা সেই নারী দাঁড়িয়ে আছেন?
আজ কেমব্রিজের পুরোনো কলেজের বাগানে ক্রিস্টোফার রাউন্ডের কিংবদন্তি শুনতে শুনতে হঠাৎ সেই গ্রামের গল্পটিই মনে পড়ে গেল। দুটি গল্পের পটভূমি আলাদা। একটি ইংল্যান্ডের শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগানে, অন্যটি বাংলার এক অজানা গ্রামের মসজিদসংলগ্ন ধানখেতে। কিন্তু দুটির মধ্যে কোথায় যেন এক অদ্ভুত মিল রয়েছে। একজন পুরুষ, একটি অসমাপ্ত প্রেম, ঈর্ষা, মৃত্যু আর অপরাধবোধ।
অন্যদিকে একজন নারী, সামাজিক নিষ্ঠুরতা, অপমান আর এক করুণ পরিণতি। ভূতের অস্তিত্ব নিয়ে তর্ক হতে পারে। এসব গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে, লোককথায় আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা গল্পে তারা বেঁচে থাকে অন্য এক বাস্তবতা নিয়ে। হয়তো ভূতেরা সত্যিই ফিরে আসে না। হয়তো ফিরে আসে মানুষের অপরাধবোধ, অব্যক্ত ভালোবাসা আর অতীতের কিছু অসমাপ্ত অধ্যায়। আর কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাতে কিংবা হেমন্তের পূর্ণিমায়, পুরোনো কোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সেই গল্পগুলো মনে পড়লে আজও মনে হয়, সব গল্পের শেষ কি সত্যিই মৃত্যুতে হয়?
ছবি: লেখক