প্রবাসে থেকেও নিজ উদ্যোগে কুমিল্লায় ৬৭ পাঠাগার গড়লেন সাইফ মিঠু

· Prothom Alo

১৭ বছর লন্ডনে কাটিয়ে এখন কেন্টে থাকেন সাইফ মিঠু। যুক্তরাজ্যের হাই সিকিউরিটি কারাগার বেলমার্শে কাজ করেন যুক্তরাজ্যের ফুড ডিপার্টমেন্টের এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা। প্রবাসে থেকেও নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে গড়ে তুলেছেন বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার। এ প্রকল্পের মাধ্যমে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন বই। শিশুদের বই পড়ানোর এই চিন্তা তার মাথায় কী করে এল, জানাচ্ছেন রাসেল হোসেন

বিদ্যা বিকাশ পাঠাগারের বিতরণ করা বই হাতে শিশুরা

২০২৪ সালের কথা। মেয়ে আরিয়া তখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল থেকে প্রতি সপ্তাহে সে তিনটি করে বই বাড়ি নিয়ে আসত। গল্প, রূপকথা, ইতিহাস, বিজ্ঞান, জীবনী—নানা ধরনের বই। স্কুল থেকে তাকে একটি ‘রিডিং রেকর্ড’-ও দেওয়া হয়েছিল। বই পড়ে ফেরত দেওয়ার সময় সেখানে অভিভাবক হিসেবে সাইফ মিঠু অথবা তাঁর স্ত্রীকে স্বাক্ষর করতে হতো।

Visit afsport.lat for more information.

আরিয়ার বইগুলো হাতে নিয়ে একদিন সাইফের মনে হলো, আচ্ছা, বাংলাদেশের কোনো গ্রাম বা মফস্‌সলের তৃতীয় শ্রেণির একটি শিশু কি এমন সুযোগ পায়? প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে বই নিয়ে পড়তে পারে?

নিজের ছেলেবেলার কথা মনে করার চেষ্টা করেন। এমন কিছু মনে পড়ে না। ভাবলেন, সময় বদলেছে, পরিস্থিতিও হয়তো বদলেছে। খোঁজ নিতে শুরু করেন। বিশেষ করে নিজের জন্মস্থান কুমিল্লার লালমাই উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় খোঁজখবর করেন। একসময় হতাশ হয়ে আবিষ্কার করেন, বিদ্যালয়ে পাঠ্যবই আছে, শিক্ষক আছেন, পড়াশোনাও হচ্ছে, কিন্তু শিশুদের জন্য পাঠ্যবইয়ের বাইরে নিয়মিত বয়সোপযোগী বই পড়ার সুযোগ এখনো সীমিত। শহরের একটি শিশু যেভাবে লাইব্রেরি, বইয়ের দোকান, স্কুল কিংবা পরিবারের সংগ্রহ থেকে নানা ধরনের বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে, গ্রামের অনেক শিশুরই সেই সুযোগ নেই।

এ বাস্তবতা থেকেই ২০২৪ সালের মার্চে যাত্রা শুরু করে ‘বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার’।

লালমাই উপজেলার ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব কটিতেই এখন বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার আছে

স্বপ্ন হলো বাস্তব

প্রথমে লালমাইয়ের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন। কাজ করতে করতে জানতে পারেন, উপজেলায় মোট ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। প্রথম ১৫টি বিদ্যালয়ে প্রতিটি পাঠাগারের জন্য ১৫০টির মতো বই দিয়েছেন। পরে ৫২টি বিদ্যালয়ে দেওয়া হয় ১০০টি করে বই।

একটি একটি করে ইউনিয়ন, একটি একটি করে বিদ্যালয়—এভাবেই কাজ এগিয়ে গেছে। ২০২৬ সালে এসে পূরণ হয় লক্ষ্য। লালমাই উপজেলার ৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব কটিতেই এখন বিদ্যা বিকাশ পাঠাগার আছে।

শুরুতে বিদ্যা বিকাশের জন্য আলাদা কোনো তহবিল ছিল না। বড় কোনো দাতা বা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সহযোগিতাও ছিল না। তাই কাজটি শুরু করার পর প্রথম যে বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হন সাইফ মিঠু, সেটি হলো, এতগুলো বিদ্যালয়ের জন্য নিয়মিত বই কেনার অর্থ কোথা থেকে আসবে? সাইফ মিঠু জানান, ‘আমাদের বাসায় একটি ছোট ঘর ছিল, যেটি আমি পড়াশোনা ও ব্যায়ামের ঘর হিসেবে ব্যবহার করতাম। সিদ্ধান্ত নিলাম, ঘরটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস এয়ারবিএনবিতে অতিথিদের জন্য ভাড়া দেব। ভাড়া থেকে উপার্জিত আয় বিদ্যা বিকাশের বই কেনা ও পাঠাগার স্থাপনের কাজে ব্যবহার করব।’

তখন থেকে এয়ারবিএনবি থেকে পাওয়া ভাড়া বিদ্যা বিকাশের নিয়মিত অর্থায়নের একটি প্রধান উৎস। বন্ধু, পরিচিতজন ও শুভানুধ্যায়ীরা এগিয়ে এসেছেন। কেউ একটি পাঠাগারের জন্য অর্থ দিয়েছেন, কেউ বই কেনার জন্য সহযোগিতা করেছেন, কেউ পরামর্শ দিয়েছেন, আবার কেউ অন্যদের কাছে এই উদ্যোগের কথা পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছেন।

সাইফ মিঠু

পেছনের মানুষজন

বিদ্যা বিকাশের কার্যক্রম চালানোর জন্য বাংলাদেশে আছে একটি বড় টিম। এই টিম মাঠপর্যায়ের সব কার্যক্রম পরিচালনা করে। বিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যোগাযোগ, বই পৌঁছানো, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত, পাঠাগার উদ্বোধন, পরবর্তী সময়ে খোঁজখবর নেওয়া—এসব কাজ করেন বিদ্যা বিকাশের স্থানীয় প্রতিনিধি, সমন্বয়ক ও স্বেচ্ছাসেবকেরা।

বই কিনে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেন তাঁরা। তাঁদের প্রতিনিধি গিয়ে পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু করে দিয়ে আসেন। কিন্তু এরপর পাঠাগারটি সফল হবে কি না, সেটি অনেকটাই বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর নির্ভর করে। তাই সাইফ মিঠু মনে করেন, এই উদ্যোগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের।

বিদ্যা বিকাশের লক্ষ্যটি সহজ। বই যেন কেবল বিদ্যালয়ের আলমারিতে সাজানো না থাকে। তারা চায়, শিক্ষার্থীদের বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। সপ্তাহে অন্তত এক দিন একজন শিক্ষক যদি বই ইস্যু করেন, একটি সাধারণ রেজিস্টার খাতায় শিক্ষার্থীর নাম ও বইয়ের নাম লিখে রাখেন এবং পরের সপ্তাহে বইটি ফেরত নিয়ে আরেকটি বই দেন, তাহলেই পাঠাগারটি সত্যিকার অর্থে কাজে লাগতে পারে। শিশুটি হয়তো ছুটির দিনে বইটি পড়বে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে পড়তে পারে। আবার মা-বাবাও সন্তানকে পড়ে শোনাতে পারেন।

যদি কোনো বই হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়, তাহলেও তাঁরা আবার বই দেওয়ার চেষ্টা করেন। শিশুদের মধ্যে যেন কোনো ধরনের আশঙ্কা বা দ্বিধা না কাজ করে—এ জন্যই এই উদ্যোগ। সাইফ বলেন, বই ধার নেওয়া ও যত্ন করে ফেরত দেওয়ার মধ্য দিয়ে শিশুরা বইয়ের যত্ন নেওয়া ও দায়িত্ববোধ শিখবে।

পাঠাগার স্থাপনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা বই পড়ছে কি না, কী ধরনের বই পছন্দ করছে—সেটিও বোঝার চেষ্টা করছেন তাঁরা। ২০২৫ সালে তাঁরা শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস মূল্যায়নের একটি ছোট উদ্যোগ নেন। সেখান থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থীকে সেরা পাঠক পুরস্কার হিসেবে সনদ, বই ও নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছিল।

এবার লালমাই উপজেলার হাইস্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজে পাঠাগার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে বিদ্যা বিকাশ

৬৭–তেই শেষ নয়, শুরু

৬৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এসেছিল—এবার কী? শুরু হয় বিদ্যা বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়। লালমাই উপজেলার হাইস্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজ মিলিয়ে মোট ৪৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে পাঠাগার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে বিদ্যা বিকাশ। সাহিত্য, বিজ্ঞান, ইতিহাস, জীবনী, দর্শন, ভ্রমণ, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ ও সংস্কৃতি—বিভিন্ন বিষয়ের বৈচিত্র্যময় ও রুচিশীল একটি সংগ্রহ তৈরির কাজ এখন চলছে। যেহেতু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের পছন্দ ও চাহিদা বদলে যায়, তাই এবার বইয়ের পরিসর আরও বড় হবে, একই সঙ্গে ব্যয়বহুলও হবে।

তাদের স্বপ্ন, লালমাইয়ের একটি গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া একজন কিশোর বা তরুণও যেন বাংলা ভাষা ও বিশ্বের অন্তত ১০০ গুরুত্বপূর্ণ লেখক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও মনীষীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়।

কোনো একদিন যুক্তরাজ্যে নিজের মেয়ের ‘রিডিং রেকর্ড’-এ স্বাক্ষর করতে গিয়ে সাইফ মিঠুর মনে যে বীজ রোপিত হয়েছিল, সেটি আজ চারা গাছ। একদিন মহিরুহ হয়ে সেটি হয়তো বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শিশুর কাছে ছড়িয়ে পড়বে।

৯ বছর পর খুলে দেওয়া ওসমানী উদ্যানে দর্শনার্থীদের জন্য কী কী আছে

Read full story at source