হাতিরা কেন মাইগ্রেট করে

· Prothom Alo

শেরপুরের বেশ কিছু ভিডিও এখন ফেসবুক রিলসে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, ধানখেতে নেমেছে হাতির পাল। কয়েকটি হাতি শুঁড় দিয়ে ধানগাছ টেনে খাচ্ছে। এদিকে কৃষকেরা ছুটে এসেছেন হাতি তাড়াতে। কেউ হাতিগুলোকে তাড়ানোর চেষ্টা করছেন, কেউ ভয়ে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ আবার মুঠোফোনে ভিডিও করছেন। কোথাও হাতি আর মানুষের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে প্রশ্ন জাগে, হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ল কেন? তারা কি বোঝে না, এখানে মানুষের বসতি? ধানখেতের ফসল নষ্ট হলে কৃষকের কতটা ক্ষতি হয়, তা কি তারা জানে?

আসলে হাতিরা এসব হিসাব করে না। তারা জানে না বাংলাদেশ কোথায় শেষ, ভারত কোথায় শুরু। খাবার, পানি আর নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে তারা এক বন থেকে অন্য বনে যায়। এই যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া, একে বলে মাইগ্রেশন বা পরিযান।

Visit newsbetting.club for more information.

কিন্তু হাতিদের এই চলাচলের পথ যদি মানুষ বন্ধ করে দেয়, তাহলে কী হবে?

হাতি কিংবা ড্রিল মেশিনের চেয়েও জোরে শব্দ করতে পারে যে পাখিবন্য হাতি

২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘No country for gentle giants’। বাংলায় বললে, বিশালদেহী এই শান্ত প্রাণীদের জন্য যেন কোনো দেশই নেই। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও শেরপুর সীমান্তের হাতিদের সমস্যার কথা বলা হয়েছে।

প্রায় ২০০০ সাল থেকে ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে হাতির পাল বাংলাদেশের শেরপুর অঞ্চলে আসতে শুরু করে। প্রথম দিকে তাদের সংখ্যা ছিল ১৫ থেকে ২০টি। তারা বাংলাদেশ ও ভারতের বনাঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত করত। কিন্তু ২০০৭ সালে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ভারতের দিকের যাতায়াতের ফটকগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাতিদের পুরোনো পথে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে এখন প্রায় ১২০টি হাতি রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০টি শাবক। হাতিদের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে, বনে খাবারও কমে যাচ্ছে। তাই খাবারের খোঁজে হাতিরা কৃষিজমি ও লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। এতে মানুষ ও হাতির মধ্যে সংঘাত বাড়ছে।

কিন্তু হাতিরা কেন এত দূর যায়? শুধু কি খাবারের জন্য?

হাতিবন্য হাতি

হাতির খিদে অনেক!

একটা হাতির কথা ভাবো। এর শরীরটা কত বড়! সেই শরীর চালাতে প্রতিদিন কত খাবার লাগে? হাতি ঘাস খায়, পাতা খায়, গাছের কচি ডাল ও ছাল খায়। নানা ধরনের উদ্ভিদই এর খাবার। আবার প্রচুর পানিও পান করতে হয় একে।

একটি বনে যখন খাবার কমে যায়, কিংবা পানির উৎস শুকিয়ে আসে, তখন হাতিদের অন্য জায়গায় যেতে হয়। বর্ষাকালে যে জায়গায় প্রচুর ঘাস জন্মায়, শুকনো মৌসুমে সেখানে খাবারের অভাব দেখা দিতে পারে। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে খাবার ও পানির প্রাপ্যতাও বদলায়। হাতিরা সেই অনুযায়ী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়।

হাতি সাধারণত দল বেঁধে চলে। সেই দলে থাকে ছোট ছোট শাবকও। তাই এদের এমন জায়গা দরকার, যেখানে পর্যাপ্ত খাবার ও পানি পাওয়া যাবে, আবার শাবকদের নিয়ে নিরাপদেও থাকা যাবে। একটি বনে এসবের অভাব দেখা দিলে অন্য বনের দিকে যাত্রা করাই তাদের জন্য স্বাভাবিক।

কিন্তু মানুষের জন্য যে বন এক জায়গায় সীমাবদ্ধ, হাতিদের জীবন তো তেমন নয়। তাদের বেঁচে থাকার জন্য একাধিক বনের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা দরকার।

হাতি নিয়ে ১০টি মজার তথ্য

হাতিদেরও চেনা পথ আছে

স্কুলে যাওয়ার জন্য নিশ্চয়ই তোমার একটি পরিচিত পথ আছে। প্রতিদিন সেই পথে যাতায়াত করতে করতে পথের বাঁক, গাছপালা, দোকানপাট সবই চেনা হয়ে যায়। অন্য পথে গেলে হয়তো বেশি সময় লাগবে, কিংবা পথ হারানোর ভয় থাকবে।

হাতিদেরও এমন পরিচিত পথ আছে। এক বন থেকে অন্য বনে যাতায়াতের এই পথকে বলে এলিফ্যান্ট করিডর বা হাতির চলাচলের পথ। কোনো কোনো হাতির দল বহু বছর ধরে একই পথ ব্যবহার করে। বয়স্ক হাতিরা এসব পথ কম বয়সী হাতিদের চিনিয়ে দেয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবে পথ চেনে। এই পথ একাধিক বনকে যুক্ত করে। হাতিরা সেই পথ ধরে খাবার ও পানির সন্ধানে যায়, আবার ফিরে আসে।

এবার ভাবো, তোমার স্কুলে যাওয়ার পরিচিত পথটিতে যদি হঠাৎ দেয়াল তুলে দেওয়া হয়, তাহলে কী করবে? অন্য পথ খুঁজবে নিশ্চয়ই। কিন্তু সেই পথ যদি না থাকে, তাহলে?

হাতিদের সমস্যাও অনেকটা সে রকম। তাদের চেনা পথে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলে, রাস্তা তৈরি হলে কিংবা মানুষের বসতি গড়ে উঠলে চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। তখন তারা সহজে এক বন থেকে অন্য বনে যেতে পারে না। খাবার ও পানির সংকট দেখা দেয়। অনেক সময় বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয় মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। কিন্তু হাতিরা তো পাসপোর্ট নিয়ে চলে না! ওদের কাছে সীমান্তের রেখার চেয়ে খাবার, পানি আর নিরাপদ আশ্রয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই হাতির চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেলে সমস্যায় পড়ে হাতি যেমন, তেমনি বিপদে পড়ে মানুষও।

গাণিতিক ধাঁধা সমাধান করতে পারে বন্য হাতি নাফ নদী সাঁতরে কক্সবাজারের টেকনাফে চলে আসা হাতি

টেকনাফের হাতিরাও মাইগ্রেট করে

শেরপুর বা মেঘালয়ের হাতিরা তো এই অসুবিধায় আছেই। পাশাপাশি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলেও হাতিদের চলাচলের পথ রয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এশীয় বন্য হাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এই অঞ্চলের হাতিদের চলাচলের সঙ্গে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের বনাঞ্চলের সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝখানে রয়েছে নাফ নদী। ২০২১ সালের ২৬ জুন মিয়ানমার থেকে দুটি বুনো হাতি নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। জাতিসংঘের সংবাদ সংস্থা ইউএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়, খাবারের অভাবে হাতি দুটি নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে বন বিভাগের হাতি উদ্ধার ও সাড়াদানকারী দলের সদস্যরা তাদের আবার বনে ফিরিয়ে দেন।

একবার ভাবো, হাতি দুটি কেন নদী পেরিয়ে অন্য দেশে চলে এল? তারা কি বেড়াতে এসেছিল? নিশ্চয়ই না। খাবারের খোঁজে কিংবা নিজেদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই তারা এমন পথ পাড়ি দিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

টেকনাফের হাতিদের জন্যও এক বন থেকে অন্য বনে যাওয়ার পথ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাহাড় কেটে বসতি তৈরি, বনভূমি কমে যাওয়া এবং মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে হাতিদের চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ২০২৩ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন কনজারভেশন সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় টেকনাফ বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে মানুষ ও হাতির সংঘাতের বিভিন্ন কারণ তুলে ধরা হয়েছে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, বনাঞ্চলে মানুষের বসতি ও কৃষিকাজের বিস্তার হাতিদের আবাসস্থলের ওপর চাপ তৈরি করছে।

অর্থাৎ হাতিদের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সমস্যা শুধু একটি এলাকার নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় হাতিদের টিকে থাকার জন্য বনাঞ্চল এবং এক বন থেকে অন্য বনে যাওয়ার সুযোগ প্রয়োজন।

যে হাতি পৃথিবীতে একটিই ছিলতিন দিন ধরে খাদ্যের সন্ধানে এ টিলা থেকে ও টিলা চষে বেড়াচ্ছে ৪০টি ছোট–বড় বন‌্য হাতির দল। তারা সীমান্তবর্তী জঙ্গল ছেড়ে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে সমতলে চলে এসেছে। এ নিয়ে সীমান্তের গ্রামগুলোর মানুষ রয়েছে হাতি আতঙ্কে। দুপুর ১২টার দিকে, কালাপানি এলাকা, নালিতাবাড়ী, শেরপুর, ৪ জুন

মানুষ ও হাতির সংঘাত কেন হয়

ধরো, একটি হাতির দল বনে খাবার পাচ্ছে না। তারা খাবারের খোঁজে পাশের ধানখেতে চলে গেল। হাতিরা ধান খেতে শুরু করল। কৃষকের ফসল নষ্ট হলো। কৃষক ক্ষুব্ধ হলেন। হাতিদের তাড়াতে গিয়ে কেউ আহত হলেন, আবার মানুষের আক্রমণে হাতিও আহত হতে পারে।

এভাবেই মানুষ ও হাতির সংঘাত তৈরি হয়। কখনো এতে মানুষের মৃত্যু হয়, কখনো হাতিরও মৃত্যু ঘটে। অথচ বন কমে যাওয়া এবং হাতিদের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে এই সংঘাতের অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার। হাতি ইচ্ছা করে মানুষের ক্ষতি করতে লোকালয়ে আসে না। তারও খাবার লাগে, পানি লাগে, নিরাপদে থাকার জায়গা লাগে। বনে সেসবের অভাব দেখা দিলে সে অন্য জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করে। সেই জায়গাটি যদি মানুষের বসতি বা কৃষিজমি হয়, তখনই বিপত্তি বাধে।

তাই মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে হলে শুধু হাতিকে তাড়ানোর কথা ভাবলে হবে না। কেন হাতি লোকালয়ে আসছে, সেই কারণও খুঁজে বের করতে হবে।

যে হাতি প্রতিদিন নিজে পাইপ দিয়ে গোসল করেরামুর গহিন বনে খাদ্যসংকটে থাকা হাতি

হাতিদের বাঁচাতে কী করা দরকার

হাতিদের রক্ষা করতে হলে প্রথমেই তাদের বনের জায়গা রক্ষা করতে হবে। যেসব বন নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো পুনরুদ্ধার করতে হবে। হাতিদের পুরোনো চলাচলের পথগুলো চিহ্নিত করে নিরাপদ রাখতে হবে, যাতে এরা নির্বিঘ্নে এক বন থেকে অন্য বনে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তে হাতিদের যাতায়াতের পথ আবার নিরাপদ করার জন্য দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন। একইভাবে টেকনাফের হাতিদের চলাচলের পথ রক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বনাঞ্চলের সংযোগের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিও অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। হাতি লোকালয়ে ঢুকে পড়লে কীভাবে নিরাপদে পরিস্থিতি সামলানো যায়, সে বিষয়ে স্থানীয় মানুষকে সচেতন করা দরকার। হাতিকে আঘাত করা কিংবা উত্ত্যক্ত করার বদলে বন বিভাগের সহায়তা নেওয়া উচিত।

হাতিদের চলাচলের পথ রক্ষা করা মানে হাতিদের উপকার করা। এতে মানুষেরও উপকার হয়। হাতিরা যদি বনের মধ্যে খাবার ও পানি খুঁজে পায়, তাহলে লোকালয়ে ঢোকার প্রয়োজন কমবে। তাতে ফসলের ক্ষতি ও মানুষ-হাতির সংঘাত কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

হাতিরা মানুষের মতো দেশভাগের সীমারেখা মানে না। প্রকৃতির নিয়মে তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়। তাদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দিলে শুধু হাতিরাই বিপদে পড়ে না, মানুষও বিপদে পড়ে।

তাই হাতির মাইগ্রেশন বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, বন মানে শুধু অনেক গাছ না। বন হলো হাতিসহ অসংখ্য প্রাণীর বাড়ি। আর সেই বাড়ির সঙ্গে অন্য বনের যোগাযোগের পথটিও এদের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি।

আমরা যেমন বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্কুলে যাই, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করি, প্রয়োজনে অন্য জায়গায় যাই, হাতিদেরও তেমন চলাচলের প্রয়োজন আছে। পার্থক্য শুধু এটুকু, আমরা পথ বন্ধ পেলে বিকল্প রাস্তা খুঁজতে পারি, কিন্তু হাতিদের সামনে সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে এদের যাওয়ার জায়গা থাকে না।

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টারভুলে যাওয়া রোগ, হাতি এবং অন্যান্য

Read full story at source