ব্যাংক খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, অর্থনীতি এবার নদীতে পড়তে পারে: মাহবুব উল্লাহ

· Prothom Alo

জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, ‘অলিগার্কদের প্রশ্রয় না দিলে অর্থনীতিকে সঠিক পথে ফেরানো যাবে না—এ ধারণা উৎসাহিত করা উচিত নয়। এবার অর্থনীতি লাইনচ্যুত হয়েছে, ভবিষ্যতে শুধু লাইনচ্যুত হবে না, হয়তো নদীতে গিয়ে পড়বে। তাই এ ধরনের মানুষদের বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা উচিত।’

Visit michezonews.co.za for more information.

অধিকাংশ ব্যাংক আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে—এমন মন্তব্য করে মাহবুব উল্লাহ। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি শোষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই শোষণ কার জন্য? এই শোষণ সাধারণ জনগণের জন্য নয়; এই শোষণ স্বল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা কোটিপতির জন্য, যাদের আমরা “অলিগার্ক” বলি। এ দেশে এই অলিগার্কদের জন্ম দিয়েছে খোদ রাষ্ট্র নিজেই।’

বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের আজকের দিনের প্রথম অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ কথাগুলো বলেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ। রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের শেষ দিন আজ।

অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব।

অনুষ্ঠানে জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের ব্যাংকিং খাত অত্যন্ত দুর্বল, ভঙ্গুর। এটি প্রায় বিলুপ্তির মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এটি বাংলাদেশের মানুষ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি।’

অধিকাংশ ব্যাংক আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে—এমন মন্তব্য করে মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘আমরা যদি বাজারের নিয়ম মেনে চলতাম, তবে এসব ব্যাংকের অধিকাংশই এত দিনে বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু আমরা নানা উপায়ে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। এসব চেষ্টা ওই ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা আমার জানা নেই।’

আস্থার সংকটকে ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে করেন মাহবুব উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে এত বেশি অনিয়ম হয়েছে যে অধিকাংশ মানুষই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। এই চরম আস্থার সংকটের মধ্যেও কিছু ব্যাংক ভালো করছে এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। হয়তো আমরা এই চার-পাঁচটি ব্যাংক থেকে শিখতে পারি যে এই খাতের ক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী।’

এখন ব্যাংকিং খাত পুরোপুরি সরকারমুখী হয়ে পড়েছে বলে জানান এই জাতীয় অধ্যাপক। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতের দিকে তাদের মনোযোগ নেই। এর ফলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বিশাল ঋণের বোঝা জমা হবে। সরকার কীভাবে সেই ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করবে তা আমার জানা নেই।’

মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘আমরা শিল্পকারখানা বা ব্যাংকের বেসরকারীকরণের কথা বলি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা দেশের শাসকেরা এই রাষ্ট্রকে জনগণের রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করেননি। তাঁরা রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা একটি সাম্রাজ্য মনে করেছেন, যেখান থেকে তাঁরা তাঁদের নিজস্ব সমর্থক, আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের অনুগ্রহ ও সুবিধা বিলিয়ে দিয়েছেন। এটাই মূল সমস্যা।’

মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘যতক্ষণ না এই সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, যতক্ষণ না আপনি গুটিকয় উচ্চাভিলাষী মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাষ্ট্রের প্রকৃতি পরিবর্তন করে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবেন, ততক্ষণ কোনো উন্নতি সম্ভব নয়।’

ব্যাংক খাতে বিপরীতমুখী চাপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক বরকত-এ-খোদা বলেন, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে এক অদ্ভুত বিপরীতমুখী চাপ বিরাজ করছে—একদিকে কিছু দুর্বল ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক তীব্র তারল্য–সংকটে ভুগছে, অন্যদিকে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে রেকর্ড পরিমাণ অলস বা অতিরিক্ত তারল্য জমে আছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্যের পরিমাণ বেড়ে ৪ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি রেকর্ড গড়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৯ শতাংশ বেশি।

বরকত-এ-খোদা জানান, অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। এক. রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল সুশাসন, দুই. নমনীয় নীতিমালা এবং বারবার ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা প্রদান এবং তিন. বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির ধীরগতি।

অর্থ পাচার ও ব্যাপক আর্থিক আত্মসাৎ ব্যাংকিং খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে জানান বরকত-এ-খোদা। তিনি বলেন, আনুমানিক পাঁচ লাখ কোটি টাকা ভুয়া ঋণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। আড়াই লাখ থেকে তিন লাখ কোটি টাকা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট বিদেশে পাচার করেছে। ব্যাংকের পরিচালক ও অলিগার্করা নীতিমালা বিকৃত করে উপযুক্ত জামানত বা পরিশোধের সদিচ্ছা ছাড়াই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তসংযুক্ত নেটওয়ার্ক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গেছে।

Read full story at source