পশ্চিমবঙ্গে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ২

· Prothom Alo

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এক দিনের ব্যবধানে দুটি পৃথক পুলিশি ‘এনকাউন্টার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। আশির দশকের পর রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা কার্যত নজিরবিহীন বলে জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধীরা।

গত মঙ্গলবার রাত আড়াইটার দিকে প্রথম ঘটনাটি ঘটে উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটায়। এর ঠিক ১২ ঘণ্টা পর বেলা আড়াইটার দিকে দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে। দুই ঘটনার ক্ষেত্রেই পুলিশি বিবরণে দেখা গেছে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য। পুলিশের ভাষ্য, পুলিশের রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়।

Visit afnews.co.za for more information.

গাইঘাটার ঘটনায় নিহত ব্যক্তির নাম প্রহ্লাদ দাস, বয়স ২৩ বছর। গত শনিবার রাতে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী স্থানীয় এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন প্রহ্লাদের বাড়ির পেছন থেকে তার ক্ষতবিক্ষত ও নগ্ন দেহ উদ্ধার করা হয়।

পরদিন কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে প্রহ্লাদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত সোমবার গভীর রাতে ফেরার পথে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজেকে মুক্ত করতে এবং শৌচকার্য করার অজুহাতে গাড়ি থামায়।

পুলিশের দাবি, সেই সময় এক পুলিশ কর্মকর্তার পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে তিনি গুলি চালাতে শুরু করেন। ঘটনায় এক পুলিশকর্মী আহত হন এবং অন্যজন পাশের খালে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। পাল্টা জবাবে পুলিশ চার রাউন্ড গুলি চালালে প্রহ্লাদের শরীরে তিনটি গুলি লাগে এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে সিআইডির গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬ বছর বয়সী সামিউল শেখ। তিনি বিজেপির কর্মী সুজিত মণ্ডল হত্যার প্রধান আসামি। গত আগস্ট মাসের শেষ দিকে নিখোঁজ হওয়া সুজিত মণ্ডলের দেহাবশেষ সেপ্টেম্বরের শুরুতে নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। আর্থিক লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সুজিতকে হত্যা করে দেহ টুকরা টুকরা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন সামিউল।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে এই মামলার তদন্ত সিআইডির হাতে যায় এবং তৎকালীন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। সেখানেও একই কায়দায় সামিউল আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে সিআইডির গুলিতে নিহত হন বলে দাবি পুলিশ প্রশাসনের।

এই জোড়া ঘটনা নিয়ে ভবানী ভবনে রাজ্য পুলিশের সদর দপ্তরে বৈঠক সেরে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। তিনি জানান, রাজ্যে মাদকের কারবার ও নারীদের ওপর অপরাধ দমন করতে পুলিশকে সম্পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুন্ডামি বরদাশত করা হবে না।

গাইঘাটার ঘটনা প্রসঙ্গে পুলিশি ব্যাখ্যাকে সমর্থন জানিয়ে শুভেন্দু বিস্তারিত মন্তব্যে বিরত থাকলেও সামশেরগঞ্জের ক্ষেত্রে তিনি রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেন। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এই জোড়া ‘এনকাউন্টার’ বর্তমানে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতি

মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রাইট (এপিডিআর) এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জানিয়েছে, ‘গাইঘাটায় তথাকথিত এনকাউন্টারে প্রহ্লাদ দাস নামের এক তরুণের মৃত্যুর খবরে আমরা গভীর উদ্বিগ্ন। রাত ১২টার সময় বন্দীকে নিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণে যাওয়া গভীর সন্দেহজনক। তা-ও বন্দীর হাত খোলা রেখে। দিনের আলোতেই পুলিশ বেআইনিভাবে বন্দীদের কোমরে দড়ি বা হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়। কাজেই রাতে হাত খোলা রেখে নিয়ে যাওয়া গভীর সন্দেহজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এপিডিআর বলছে, ‘এনকাউন্টারের’ গল্প সাজানোর জন্যই কি রাত ১২টায় হাত খোলা রেখে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? বন্দী পালানোর চেষ্টা করলে তার পায়ে বা কোমরের নিচে গুলি করার কথা, তাহলে হত্যা করার জন্য গুলি কেন করা হলো? পুলিশের রিভলবার কীভাবে ছিনতাই হলো?

এপিডিআরের তরফে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি পশ্চিম বাংলায় পুলিশ হেফাজতে লাগাতার বন্দী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। বারুইপুরের পরে কান্দি, হালিশহর বীজপুর, ক্যানিং, দুবরাজপুরে পুলিশ হেফাজতে বন্দী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কোনো ক্ষেত্রেই দোষীদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। বিচার বিভাগের ভূমিকাও হতাশাজনক।

Read full story at source