ব্রাজিলে লুলার জয়ে ধূলিসাৎ হলো ট্রাম্পের ‘ডনরো নীতি’

· Prothom Alo

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিজয় ডোনাল্ড ট্রাম্পের পশ্চিম গোলার্ধ নিয়ে পরিকল্পনায় বড় আঘাত হেনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চেয়েছিলেন, দক্ষিণের দেশগুলোকে নিয়ে এমন একটি বলয় গড়তে, যেখানে তাঁর অনুগত নেতারা ব্যবসাবান্ধব নীতি ও কঠোর শাসনের ভঙ্গি অনুসরণ করবেন। একই সময়ে তিনি উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুসারী মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াতে চেয়েছিলেন। রোববারের নির্বাচনের আগপর্যন্ত পরিকল্পনাটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এখন তা কার্যত ভেঙে পড়েছে।

বিশ্ব থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে পশ্চিম গোলার্ধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য একটি দুর্গে পরিণত করার স্বপ্ন যুক্তরাষ্ট্রের বহু পুরোনো। উনিশ শতকের গোড়ায় প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ১৮২৩ সালে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে আমেরিকা মহাদেশের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার সতর্কবার্তা দিয়ে যে নীতি ঘোষণা করেছিলেন, সেটিই মনরো নীতি নামে পরিচিত। ১৮৯০-এর দশকে স্পেনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় এই নীতি নতুন করে গুরুত্ব পায়। পরে আন্তমার্কিন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা আড়ালে চলে যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার সেই পরিকল্পনা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

ব্রাজিলে লুলা যে কৌশলে অবিশ্বাস্য জয় ছিনিয়ে আনলেন

ব্রাজিল যদি বাম পন্থা থেকে ডান পন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ত, তাহলে লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের জন্য তা হতো অভাবনীয় সাফল্যের বছর। বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে অপহরণের পর দেশটিকে নিজের অনুগত রাষ্ট্রে পরিণত করার সুযোগ পান ট্রাম্প। এরপর চিলির নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী হোসে আন্তোনিও কাস্তের জয় হয়। তাঁর বাবা ছিলেন জার্মানির নাৎসি বাহিনীর একজন কর্মকর্তা। কলম্বিয়াতেও ট্রাম্প-সমর্থিত ডানপন্থী প্রার্থী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার কাছে বামপন্থীরা পরাজিত হন।

এই সাফল্যের ফলে এল সালভাদরের নায়িব বুকেলে ও আর্জেন্টিনার হাভিয়ের মিলের মতো ট্রাম্পের পুরোনো মিত্ররা আর বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম বলে বিবেচিত হচ্ছেন না। ব্রাজিলে কট্টর ডানপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারো জিতলে মেক্সিকোর দক্ষিণে ট্রাম্পের মিত্রদের প্রায় পূর্ণ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতো।

২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে পশ্চিম গোলার্ধের দিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। এরপর ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিজলভ’-এর আওতায় মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে আটক করে। তাঁর উত্তরসূরিকে দিয়ে ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্রে নতুন করে ১০০ বছরের জন্য একটি মার্কিন কোম্পানিকে অধিকার দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়। এসব তেলক্ষেত্রে প্রমাণিত মজুতের পরিমাণ ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (বাঁয়ে) ও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে আসিয়ানের ৪৭তম শীর্ষ সম্মেলনের এক ফাঁকে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, ২৬ অক্টোবর ২০২৫

মার্চে হোয়াইট হাউস ‘আমেরিকাস কাউন্টার কার্টেল কোয়ালিশন’ বা মাদক চক্রবিরোধী জোট গঠনের মাধ্যমে এই পরিকল্পনা আরও জোরদার করে। ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ বা ‘আমেরিকার সুরক্ষাকবচ’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল মাদক ব্যবসা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন করা।

ফ্লোরিডার ডোরালে মার্কিন দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ডের সদর দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজনের পর লাতিন আমেরিকার ১২ জন নেতা ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর গলফ ক্লাবে যান। মার্কিন কর্মকর্তারা মাদক চক্র, বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও চীনের মতো বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রশংসা করেন। বক্তব্যের শেষ দিকে ট্রাম্প এই আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে ইরানে তাঁর সামরিক হামলারও যোগসূত্র টানেন।

তবে এই জোট শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ডোরালে গোপন বৈঠকের পর ভেনেজুয়েলার সোনা ও তেল এবং চিলির খনিজ সম্পদ নিয়ে এমন কিছু চুক্তি সামনে আসে, যেগুলো মার্কিন কোম্পানির স্বার্থের অনুকূলে ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে জোটের সদস্যরা ‘অর্থনৈতিক সহযোগিতা’কে আনুষ্ঠানিকভাবে এর লক্ষ্য হিসেবে যুক্ত করেন। এর মধ্যে ছিল বিনিয়োগ যাচাই, খনিজ সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল অবকাঠামোয় নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী নিশ্চিত করার উদ্যোগ।

বহু মেরুর বিশ্ব তৈরিতে যেভাবে সাহস দেখাচ্ছেন ব্রাজিলের লুলা দা সিলভা

কিন্তু লুলার বিজয়ের আগেই জোটটির দুর্বলতা প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। জোট ঘোষণার মাত্র দুই দিন আগে এর প্রথম প্রধান ক্রিস্টি নোয়েমকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে অপমানজনকভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁকে বিশেষ দূত হিসেবে রাখার সিদ্ধান্তও সেপ্টেম্বরে কার্যত শেষ হয়ে যায়। পরবর্তী দায়িত্বপ্রাপ্ত কাউকে নিয়োগের প্রয়োজনও পররাষ্ট্র দপ্তর অনুভব করেনি।

বুয়েনস এইরেস ও সান্তিয়াগোয় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের কর্মকাণ্ডও আঞ্চলিক বিরোধ উসকে দিয়েছে। চিলিতে ট্রাম্পের দূত ব্র্যান্ডন জাড—যিনি আগে মার্কিন সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে কাজ করতেন—ম্যাগেলান প্রণালির ওপর চিলির সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার সঙ্গে চিলির সহযোগিতার শর্তও জুড়ে দেন তিনি। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার সম্পদ ভাগাভাগি নিয়ে হোয়াইট হাউসে প্রকাশ্য দুর্নীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে।

লুলার সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কারণ, ব্রাজিলকে অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তবে আমেরিকা মহাদেশকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে ট্রাম্পের বড় পরিকল্পনা যখন ভেঙে পড়েছে, তখন লুলার জন্য সেই কাজ কিছুটা সহজ হতে পারে।

  • জেরেমি অ্যাডেলম্যান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গ্লোবাল হিস্ট্রি ল্যাব’-এর পরিচালক

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source