‘কোনো দিন ভাবিনি, নিজের একটা দোকান হবে’, ফিরোজার পাশে বন্ধুসভা
· Prothom Alo

দোকানের তাকজুড়ে নতুন নতুন মুদিপণ্য। চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিপস, চকলেট, বিস্কুটসহ নানা সামগ্রী। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে সেগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলেন ফিরোজা আক্তার। কিছুক্ষণ পর চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে বললেন, ‘কোনো দিন ভাবিনি, আমার নিজের একটা দোকান হবে। দোকানঘর করার টাকা ছিল না, মাল কেনার সামর্থ্যও ছিল না। এখন দোকানও হয়েছে, দোকানের মালও পেয়েছি। মেয়েটার পড়ালেখার খরচ চালাতে আর এত কষ্ট হবে না।’
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার মুন্সিপাড়া গ্রামের ফিরোজা আক্তারের (৩৫) জীবনে এই দোকান নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিন সদস্যের সংসারের দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নেন তিনি। অভাবের সংসারে প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যখন কঠিন, তখন মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালানো হয়ে ওঠে আরও বড় চিন্তার কারণ।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
সেই ফিরোজার পাশে দাঁড়িয়েছে ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভা। প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ‘একটি ভালো কাজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে তাঁকে একটি দোকানঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১১ হাজার টাকার মুদি মালামাল কিনে দিয়েছেন বন্ধুরা। দোকানটির নাম রাখা হয়েছে ‘বন্ধু স্টোর’।
বন্ধু স্টোরের সামনে ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভার বন্ধুরাপ্রায় দুই বছর আগে স্বামীকে হারান ফিরোজা। এরপর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয়ে পড়েন তিনি। তিন সদস্যের সংসার চালাতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো অভাব, কখনো সন্তানের পড়াশোনার খরচ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনই ছিল নতুন দুশ্চিন্তা।
এর মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা থামাননি ফিরোজা। ভালো ফল করে এসএসসি পাস করেছে তাঁর মেয়ে। মেয়ের এই সাফল্যে আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল ভবিষ্যতের চিন্তা। মেয়ের পড়াশোনা কীভাবে চালাবেন, সেটিই ভাবিয়ে তুলছিল।
নিজের একটা ছোট দোকান করার ইচ্ছা ছিল ফিরোজার। তাতে সংসারের পাশাপাশি মেয়ের পড়াশোনার খরচও চালানো যেত। কিন্তু দোকানঘর তৈরি ও মাল কেনার টাকা জোগাড় করতে পারছিলেন না তিনি। এই সংগ্রামের কথা জানতে পারে ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভা। এরপর তাঁকে স্বাবলম্বী করে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংগঠনের সদস্য ও উপদেষ্টারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এ কাজে সহযোগিতা করেন।
দোকান সাজিয়ে দিচ্ছেন বন্ধুরা২২ ও ২৩ অক্টোবর ফিরোজার জন্য দোকানঘর তৈরি করেন বন্ধুসভার সদস্যরা। ২৫ অক্টোবর দোকানের জন্য মুদিপণ্য কেনা হয়। পরে বন্ধুসভার সদস্য, উপদেষ্টা ও প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা ফিরোজার বাড়িতে গিয়ে দোকানটি সাজিয়ে দেন।
বিকেল চারটার দিকে ‘বন্ধু স্টোর’ উদ্বোধন করা হয়। দোকান চালুর মুহূর্তে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন ফিরোজা। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘কত কষ্ট করে সংসার চালিয়েছি। ছেলেমেয়ের পড়ালেখা নিয়েও অনিশ্চয়তায় ছিলাম। এখন দোকান চালিয়ে ভালো থাকতে পারব। নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারব। এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।’
বন্ধুসভার সদস্যরা চান, দোকানটি ফিরোজা আক্তারের পরিবারের নিয়মিত আয়ের একটি উৎস হয়ে উঠুকবন্ধুসভার এ উদ্যোগের খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজনও সেখানে উপস্থিত হন। তাঁরা উদ্যোগটির প্রশংসা করেন এবং অসহায় মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভার সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ফিরোজা আক্তারের পাশে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য শুধু তাঁকে কিছু সহায়তা দেওয়া নয়। আমরা চাই, দোকানটি তাঁর পরিবারের নিয়মিত আয়ের একটি উৎস হয়ে উঠুক। তিনি যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন, সেটিই আমাদের আনন্দ।’
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরগাঁও বন্ধুসভার উপদেষ্টা প্রফেসর নাসরিন জাহান আইভী, ডাক্তার শুভেন্দু কুমার দেবনাথ, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শিহাব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম ইবনে আলিফ, প্রশিক্ষণ সম্পাদক মারুফ হাসান, বন্ধু নুসরাত নিশি, কাব্য, মেহরাব হোসেন, পিংকি আক্তার, আল নাফিস চৌধুরী, মো. উজ্জ্বল, আনিস, নাইম, তিষান, মিঠুসহ অন্য বন্ধুরা।