আগুনে পুড়ে মৃত্যু: নবীজি যে সুসংবাদ দিয়েছেন

· Prothom Alo

আগুনের লেলিহান শিখা যখন মানুষের শরীর গ্রাস করে, তখন তার স্বজনদের অসহায় আর্তনাদ, বাঁচার আকুতি আর মুহূর্তের মধ্যে নিভে যাওয়া একটি জীবনের গল্প আমাদের ভীষণভাবে নাড়া দেয়।

Visit betsport24.es for more information.

এমন মৃত্যুতে শোকের ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু নবীজি (সা.) এমন কিছু মানুষের জন্য শহিদ হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন, যাঁদের মৃত্যু বাহ্যিকভাবে বেদনাদায়ক হলেও আল্লাহর কাছে তাঁদের মর্যাদা হতে পারে অত্যন্ত সম্মানজনক।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে নিহত হওয়া ছাড়াও সাত শ্রেণির শহীদ রয়েছেন। মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, প্লুরিসিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ এবং গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী শহীদ।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৩১১১)

হাদিসটি আমাদের সামনে মৃত্যুর এক ভিন্ন তাৎপর্য তুলে ধরে। মানুষের দৃষ্টিতে কোনো মৃত্যু যতই মর্মান্তিক হোক, আল্লাহর রহমত ও প্রতিদানের বিবেচনায় তা অসম্মানজনক হওয়ার কোনো কারণ নেই।

যে মানুষটি আগুনের ভয়াবহতায় দগ্ধ হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন, তাঁর স্বজনদের জন্য এই হাদিস সান্ত্বনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।

তাঁদের চোখের জল হয়তো থামবে না, শূন্যতা হয়তো পূরণ হবে না; তবু তাঁরা আশা রাখতে পারেন, তাঁদের প্রিয়জনের এই বেদনাদায়ক পরিণতি আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদা লাভের কারণ হতে পারে।

একটি অগ্নিকাণ্ডে যখন একের পর এক প্রাণ ঝরে যায়, তখন শোক প্রকাশের পাশাপাশি আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতি কতটা ছিল? অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি?
ইসলামে জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টির রহস্য

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। হাদিসে আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্য শহিদ হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত ঘোষণা দিতে পারি। চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহর হাতে। আমাদের কর্তব্য হলো, মৃত ব্যক্তির জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া করা এবং তাঁর স্বজনদের পাশে দাঁড়ানো।

তবে এই হাদিসের তাৎপর্য মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ও স্বজনদের সান্ত্বনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আগুনে পুড়ে মৃত্যুর মতো দুর্ঘটনা আমাদের সামনে জীবিত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও তুলে ধরে।

একটি অগ্নিকাণ্ডে যখন একের পর এক প্রাণ ঝরে যায়, তখন শোক প্রকাশের পাশাপাশি আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতি কতটা ছিল? অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি?

জরুরি বহির্গমনপথ খোলা ছিল কি? বিপদের মুহূর্তে মানুষকে উদ্ধারের কার্যকর ব্যবস্থা ছিল কি?

ইসলাম মানুষকে মৃত্যুর পর সান্ত্বনা দেওয়ার শিক্ষা দেয়, একই সঙ্গে জীবিত মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। কারও মৃত্যুর পর তাঁর জন্য শহিদ হওয়ার সুসংবাদ উল্লেখ করা আর তাঁর জীবন রক্ষায় অবহেলার দায় এড়িয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।

তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস মানুষের দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে দেয়— তা নয়; বরং দায়িত্ব পালনের পরিণাম আল্লাহর হাতে সোপর্দ করতে শেখায়। আমরা প্রায়ই দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করি, দোয়া করি, সাহায্যের হাত বাড়াই। এগুলো অবশ্যই মানবিক ও প্রশংসনীয় কাজ।

জীবন ও মৃত্যু: পরিপূরক নাকি বিপরীত
মৃত্যু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে এমন অনেক বিপদ প্রতিরোধের দায়িত্ব আমাদের হাতে রয়েছে।

কিন্তু কোনো বিপর্যয় যদি আমাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করতে, অবহেলার কারণ চিহ্নিত করতে এবং ভবিষ্যতে প্রাণহানি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ না করে, তাহলে আমাদের উপলব্ধিতে ঘাটতি থেকে যায়।

মানুষের জীবন আল্লাহর দেওয়া আমানত। এই আমানত রক্ষায় ব্যক্তিগত সতর্কতা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি সবকিছুরই গুরুত্ব রয়েছে।

আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্য নবীজি (সা.)-এর দেওয়া সুসংবাদ আমাদের দুটি ভিন্ন অনুভূতির সামনে দাঁড় করায়; একদিকে রয়েছে মৃত ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমতের আশা, অন্যদিকে রয়েছে জীবিত মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব।

প্রথমটি আমাদের শোকের মধ্যে সান্ত্বনা দেয়, দ্বিতীয়টি আমাদের উদাসীনতার মধ্যে জবাবদিহির বোধ জাগিয়ে তোলে। মৃত্যু আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে এমন অনেক বিপদ প্রতিরোধের দায়িত্ব আমাদের হাতে রয়েছে।

আমরা মৃত ব্যক্তির জন্য শহীদ হওয়ার মর্যাদার আশা রাখব, তাঁর পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাব এবং একই সঙ্গে চেষ্টা করব, আমাদের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা কিংবা নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটিতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন নির্মম শোকের মুখোমুখি হতে না হয়।

আল্লাহ–তাআলা আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী মুসলিমদের প্রতি রহম করুন, তাঁদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, শহিদদের মর্যাদা দান করুন এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ধারণের তাওফিক দিন। আমিন।

  • ইফতেখারুল হক হাসনাইন : আলেম ও প্রাবন্ধিক

বিপদের তীব্রতায় মৃত্যু কামনা: কী বলে ইসলাম

Read full story at source