ময়মনসিংহ ২০৫০: পুরোনো শহর নয়, গড়ে উঠুক ভবিষ্যতের নগর

· Prothom Alo

‘হাওর, জঙ্গল, মহিষের শিং—এই তিনে মৈমিনসিং; লোকমুখে এখনো প্রচলিত একটি প্রবাদ। ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটিশ আমলে ময়মনসিংহ ছিল বিশাল এক জেলা, যার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বৈশিষ্ট্য বোঝাতেই প্রবাদটি তৈরি হয়েছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায় তা আর অবশিষ্ট নেই। তবে সেই ময়মনসিংহ এখন আর কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা শহর নয়; এটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, প্রশাসন, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।

ব্রহ্মপুত্রের তীরে গড়ে ওঠা এ নগরীর রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। কিন্তু দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত আবাসন, যানজট, জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, খাল-জলাশয় সংকোচন ও নগর অবকাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ ময়মনসিংহের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার দাবি জানাচ্ছে।

Visit freshyourfeel.org for more information.

এ বাস্তবতায় চলতি বছরে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬ প্রণয়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ। আইনটির মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে—ময়মনসিংহ ও এর সন্নিহিত এলাকাকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পিত আধুনিক নগরে রূপ দেওয়া। এ ছাড়া ভূপ্রাকৃতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, অপরিকল্পিত নগরায়ন রোধ, দুর্যোগসহনশীল নগর ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি ও পর্যটনের বিকাশ এবং নাগরিকের উন্নত জীবন নিশ্চিত করা।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

এখন প্রশ্ন হলো, নতুন এ কর্তৃপক্ষ কি শুধু ভবনের নকশা অনুমোদন ও নির্মাণ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান হবে, নাকি ময়মনসিংহের আগামী ২০-৩০ বছরের নগর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রধান পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে? উত্তরটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ, ময়মনসিংহের বর্তমান সংকট মূলত বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্পের সংকট নয়; এটি নগর–পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, আবাসন, পানিনিষ্কাশন, পরিবেশ ও অর্থনীতিকে একসঙ্গে দেখার সংকট।

জনসংখ্যার চাপ ও নগর সম্প্রসারণ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৭২২ এবং জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৬ হাজার ৩১৫ জন। এ সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; এটি নগর–পরিকল্পনার জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ, সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যা আগামী বছরগুলোয় ক্রমবর্ধমান হারে আরও বাড়বে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আবাসিক চাহিদার কারণে আশপাশের উপজেলা ও গ্রামাঞ্চল থেকেও মানুষ নগরমুখী হচ্ছে। ফলে নগরের সীমানা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ সম্প্রসারণ কি পরিকল্পিত হবে, নাকি রাস্তার পাশে, খালের ধারে, কৃষিজমির ওপরে ও নিচু জমিতে বিচ্ছিন্ন আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠবে? ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এখানেই।

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ: একটি নতুন সম্ভাবনা

২০২৬ সালের আইনে ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (মউক) ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টেকসই নগরায়ন, ভূমি জরিপ ও সমীক্ষা, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ, দুর্যোগ সহনশীল নগর–পরিকল্পনা এবং পরিবহন অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনার কথাও আইনে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের কাজ কেবল ‘প্ল্যান পাস’ করা নয়। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মউকের চেয়ারম্যানও জানিয়েছেন, নির্ধারিত এলাকায় ভবনের নকশা অনুমোদনের পাশাপাশি নির্মাণকাজ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না, তা পরিদর্শনের মাধ্যমে নজরদারি করা হবে। এ উদ্যোগ কার্যকর হলে নগর ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষের সফলতা নির্ভর করবে এ পরিকল্পনার মান, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ও আইন বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। তবে সংস্থাটির চেয়ারম্যান নিয়োগ হলেও লোকবল ও পৃথক অফিস এখনো সেভাবে স্থাপিত হয়নি। জেলা গণপূর্ত ভবনের একটি কক্ষে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তাই একটি কার্যকর কর্তৃপক্ষ হিসেবে গড়ে উঠতে মউকের প্রয়োজনীয় লোকবল থাকা জরুরি।

ময়মনসিংহের বর্তমান সংকট কোথায়

সাম্প্রতিক সময়ের দৃশ্যপটের দিকে তাকালে দেখা যায়, ময়মনসিংহ শহরের অন্যতম দৃশ্যমান সমস্যা জলাবদ্ধতা। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারী বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। এমনকি কিছু প্রধান সড়কেও জমে থাকে হাঁটুর ওপর পানি যা সরতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ময়মনসিংহে ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বিভিন্ন স্থানে ড্রেনের অনুপস্থিতি এবং ড্রেনে বর্জ্য ফেলার মতো বিষয় জলাবদ্ধতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে পানি সরতে বেশি সময় লাগে।

এর আগেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার খবর এসেছে। ২০২৫ সালে নগরীর বলাশপুরের একটি এলাকায় প্রায় ২ হাজার পরিবারের মৌসুমি জলাবদ্ধতায় ভোগার কথা সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। এখানে শিক্ষা একটাই—শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করে জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে সমাধান করা যাবে না। প্রয়োজন পুরো নগরের জলপ্রবাহভিত্তিক পরিকল্পনা। পাশাপাশি নগরবাসীর সচেতনতা।

কোন খাল কোথা থেকে পানি নেবে, কোথায় পানি সংরক্ষিত হবে, কোন জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে, কোন এলাকার ভূমি ভরাট করা যাবে না, কোথায় রেইনওয়াটার রিটেনশন পুকুর থাকবে, এ সবকিছুকে সমন্বিত জলব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

নতুন উপশহর: এখনই পরিকল্পনার সময়

ময়মনসিংহের ভবিষ্যৎ নগরায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে, নতুন উপশহর কোথায় এবং কীভাবে হবে? পুরোনো শহরকে আরও ঘন করে তোলার পরিবর্তে নগরের আশপাশে পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে উপশহর বলতে শুধু কয়েক হাজার প্লট বিক্রি করে আবাসিক এলাকা বোঝালে চলবে না। যদিও নগরীর চারপাশে ইতিমধ্যে গড়ে উঠছে আবাসিক এলাকা নামে নানাবিধ প্রকল্প। যত্রতত্র এসব প্রকল্পের লাঘাম টেনে ধরতে হবে।

তবে নতুন উপশহর হিসেবে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে গড়ে উঠতে পারে একটি পরিকল্পিত নগর। যেখানে থাকতে হবে পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা; স্কুল, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র; বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকা; খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান; পার্ক ও জলাধার; বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র; আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা; গণপরিবহন; হাঁটার পথ ও সাইকেল লেন; বিদ্যুৎ ও গ্যাস/জ্বালানি অবকাঠামো; ডিজিটাল কানেক্টিভিটি; জরুরি সেবা কেন্দ্র; সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবকাঠামো।

অর্থাৎ নতুন উপশহর হবে ‘শুধু থাকার জায়গা’ নয়, বরং ‘জীবনযাপনের পূর্ণাঙ্গ নগরকেন্দ্র’।

কোনো দিকে সম্প্রসারণ

ময়মনসিংহের উপশহর পরিকল্পনায় একক কোনো দিককে আগেভাগে চূড়ান্ত না করে জিআইএস, স্যাটেলাইট ইমেজ, ভূমির উচ্চতা, জলপ্রবাহ, কৃষিজমি, বিদ্যমান সড়ক, রেলপথ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও জনসংখ্যার প্রবণতা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের নথিতেও ময়মনসিংহের জন্য স্ট্রাকচার প্ল্যান, আরবান এরিয়া প্ল্যান ও অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহের স্ট্র্যাটেজিক ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ২০১১-২০৩১-এর বিভিন্ন গবেষণা ও রিপোর্ট, যার মধ্যে জলবিদ্যা ও ড্রেনেজ-সংক্রান্ত কাজের বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে।

এখন প্রয়োজন পুরোনো পরিকল্পনাগুলোকে হুবহু অনুসরণ না করে ২০২৬-২০৫০ সময়কালকে সামনে রেখে নতুন বাস্তবতাভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করা যাতে একটি টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

‘পলিসেন্ট্রিক ময়মনসিংহ’ হতে পারে ভবিষ্যৎ

নগর–পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ‘পলিসেন্ট্রিক সিটি’ অর্থাৎ সব কার্যক্রমকে একটি কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল না রেখে একাধিক নগরকেন্দ্র তৈরি করা।

ময়মনসিংহে এ মডেল কার্যকর হতে পারে। বর্তমান কেন্দ্রের ওপর চাপ কমিয়ে এক বা একাধিক নতুন উপকেন্দ্র তৈরি করা যেতে পারে। একটি উপকেন্দ্রে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম, অন্যটিতে শিক্ষা ও গবেষণা, আরেকটিতে স্বাস্থ্যসেবা, বাণিজ্য ও আবাসন—এভাবে কার্যক্রম ভাগ করা যেতে পারে।

এতে শহরের কেন্দ্রভাগে যানবাহনের চাপ কমবে এবং নতুন এলাকাগুলোতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি হবে। বর্তমানে ময়মনসিংহ শহরের একটি বড় সমস্যা অটোরিকশার যানজট। শহরের প্রধান সড়কগুলোয় যানজট নিত্যদিনের ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।

পরিবহন পরিকল্পনাই হবে সাফল্যের চাবিকাঠি

উপশহর তৈরি করে যদি মানুষকে প্রতিদিন মূল শহরে আসতে হয়, তাহলে নতুন উপশহরও একসময় পুরোনো শহরের সমস্যার পুনরাবৃত্তি করবে। তাই উপশহর পরিকল্পনার সঙ্গে প্রথম দিন থেকেই গণপরিবহন পরিকল্পনা যুক্ত করতে হবে।

ময়মনসিংহে একটি ইন্টিগ্রেটেড পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক (আইপিটিএন) গড়ে তোলার চিন্তা করা যেতে পারে। শহর, উপশহর ও আশপাশের উপজেলা কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে নির্দিষ্ট রুটে বাস সার্ভিস, প্রয়োজন অনুযায়ী বিআরটি ধাঁচের করিডর, ট্রেন ও নৌপথের সমন্বয়, পার্কিং হাবসহ একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অযথা গাড়ি প্রবেশের পরিবর্তে পার্কিং হাব তৈরি করে সেখান থেকে গণপরিবহন বা হাঁটার মাধ্যমে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা বিশ্বের অনেক শহরে বেশ ফলপ্রসূ হয়েছে।

কৃষিজমি ও জলাভূমি রক্ষা করতে হবে

যেহেতু ময়মনসিংহ একটি কৃষিভিত্তিক অঞ্চল, তাই নগর সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে কৃষিজমি ও জলাভূমির অনিয়ন্ত্রিত রূপান্তর। উন্নয়ন মানেই কৃষিজমি ভরাট করা নয়। একটি শহরের খাদ্যব্যবস্থা, পরিবেশ, জলধারণের ক্ষমতা ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে কৃষিজমি সরাসরি সম্পর্কিত।

উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে তাই একটি ল্যান্ড ইউ জোনিং ম্যাপ তৈরি করতে হবে। কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা, কোথায় শিল্প, কোথায় কৃষি, কোথায় জলাধার, কোথায় পরিবেশ সংরক্ষণ এলাকা—সবকিছু স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। আইনেও জলাধার ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নতুন উপশহর যেন ভবিষ্যতের জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণ না হয়, এটাই পরিকল্পনার মূল শর্ত হওয়া উচিত।

ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে নগর পুনর্গঠন

ময়মনসিংহের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর একটি ব্রহ্মপুত্র নদ। কিন্তু নদীকে শুধু একটি জলপ্রবাহ হিসেবে দেখলে চলবে না। এ নদকে কেন্দ্র করে একটি রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (আরডিপি) প্রণয়ন করা যেতে পারে। তবে এর অর্থ নদীর তীর দখল করে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ করা নয়। বরং নদীর তীরকে হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে), সবুজ এলাকা, উন্মুক্ত স্থান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, পর্যটন ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত অঞ্চলে পরিণত করা যেতে পারে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নদীতীরের প্রাকৃতিক চরিত্র ও বন্যাপ্রবাহের জায়গা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। ময়মনসিংহের পরিচয়কে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে একটি ‘রিভার সিটি’ ধারণা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন হতে হবে

এখানে একটি প্রশ্ন যদি করা যায়, এ শহর আসলে কার জন্য? শুধু উচ্চ ও মধ্যবিত্তের জন্য পরিকল্পিত আবাসন তৈরি হলে একটি ভারসাম্যহীন নগর তৈরি হবে। নিম্ন আয়ের মানুষ, শ্রমজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহহীন ও বস্তিবাসীর আবাসনের চাহিদাও পরিকল্পনায় থাকতে হবে। ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইনে নিম্নবিত্ত, বস্তিবাসী ও গৃহহীনদের আবাসন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

সুতরাং নতুন উপশহরে মিক্সড ইনকাম হাউজিং বা বিভিন্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিকল্পিত আবাসনব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এতে সামাজিক বৈষম্য কমবে এবং শহরটি অধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।

‘স্মার্ট সিটি’ মানে শুধু প্রযুক্তি নয়

হাল আমলে ময়মনসিংহকে স্মার্ট সিটি করার আলোচনা হতে পারে। কিন্তু স্মার্ট সিটি মানে কেবল সিসিটিভি, অ্যাপ কিংবা ডিজিটাল সাইনবোর্ড–ভিত্তিক এলাকা নয়। স্মার্ট নগর হলো এমন নগর যেখানে দ্রুত নাগরিক সেবা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা তথ্যভিত্তিক, টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা দ্রুত নিরসন হয়, ভূমি ব্যবহারের তথ্য ডিজিটাল, ভবনের নকশা অনুমোদন স্বচ্ছ, নগর ব্যবস্থাপনায় নাগরিকের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ থাকে।

এ জন্য ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একটি আরবান ডেটা সেন্টার (ইউডিসি) থাকা প্রয়োজন। সেখানে জিআইএস–ভিত্তিক ভূমি ব্যবহার, ভবন, রাস্তা, ড্রেন, খাল, জলাধার, জনসংখ্যা, পরিবহন ও পরিবেশের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ থাকবে।

পরিকল্পনায় নাগরিকের অংশগ্রহণ

নগর–পরিকল্পনা কেবল প্রকৌশলী বা স্থপতিদের বিষয় নয়। একটি নগরের প্রকৃত ব্যবহারকারী হলেন এর বাসিন্দা বা নাগরিকেরা। তাই মাস্টার প্ল্যান তৈরির আগে ও পরে নাগরিকদের মতামত গ্রহণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক, স্থপতি, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, নারী প্রতিনিধি, তরুণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

ময়মনসিংহে বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং গবেষণা সক্ষমতা বিবেচনায় একটি আরবান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ফোরাম গঠন করা যেতে পারে। স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত নগরের বায়ু, পানি, যানবাহন, ভূমির ব্যবহার, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু ও সামাজিক সমস্যার ওপর গবেষণা করবে এবং মউক সে গবেষণা পরিকল্পনায় ব্যবহার করবে।

প্রকল্প নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নগরনীতি

বাংলাদেশের নগর উন্নয়নের একটি পুরোনো সমস্যা হলো, একটি সমস্যা দেখা দিলে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। রাস্তা ভাঙলে রাস্তা, পানি জমলে ড্রেন, যানজট হলে রাস্তা প্রশস্তকরণ—এভাবে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নগর পরিচালনা করা হয়। সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। নতুন নগর ময়মনসিংহের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি বদলাতে হবে।

প্রথমে মাস্টার প্ল্যান, স্ট্রাকচাোল প্ল্যান, এরপর আরবান এরিয়া প্ল্যান, তারপর লোকাল এরিয়া প্ল্যান এবং সবশেষে প্রকল্প—এ ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। আইন অনুযায়ী ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মহাপরিকল্পনায় পরিবহন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন নগর অবকাঠামোর বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করতে পারলে ময়মনসিংহের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো পরস্পরবিচ্ছিন্ন থাকবে না।

আগামী ২৫ বছরের একটি রূপরেখা

ময়মনসিংহের জন্য ২০২৬-২০৫০ হিসাবে একটি দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়ন রূপরেখা বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথম ধাপ: ২০২৬-২০৩০

প্রথম ধাপে তথ্য সংগ্রহ, জিআইএস ম্যাপিং, ভূমি ব্যবহার জরিপ, জলাধার ও খাল চিহ্নিতকরণ, যানজটের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান এবং নতুন উপশহরের সম্ভাব্য অঞ্চল নির্ধারণ করতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: ২০৩০-২০৪০

দ্বিতীয় ধাপে নতুন উপশহরের অবকাঠামো, গণপরিবহন, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলা। একই সঙ্গে পুরোনো শহরের পুনর্বিন্যাস করতে হবে।

তৃতীয় ধাপ: ২০৪০-২০৫০

তৃতীয় ধাপে ময়মনসিংহকে একটি বহুকেন্দ্রিক, পরিবেশবান্ধব, ডিজিটাল ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী আঞ্চলিক নগর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

শেষ কথা

ময়মনসিংহের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। একদিকে রয়েছে দ্রুত নগরায়নের চাপ, অন্যদিকে রয়েছে নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ২০২৬ সালের আইন সেই সুযোগকে একটি আইনি ভিত্তি দিয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়নই শেষ কথা নয়। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে পরিকল্পনা কতটা বাস্তবভিত্তিক, কতটা পরিবেশবান্ধব, কতটা জনবান্ধব এবং কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার ওপর। ময়মনসিংহকে ঢাকার আরেকটি ছোট সংস্করণ বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং ময়মনসিংহের নিজস্ব ভূপ্রকৃতি, নদী, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে ভিত্তি করে একটি স্বতন্ত্র নগর মডেল গড়ে তোলা যেতে পারে।

এ নগরের ভবিষ্যৎ হওয়া উচিত এমন যেখানে প্রশস্ত ও নিরাপদ সড়ক থাকবে, কিন্তু শুধু গাড়ির জন্য নয়; যেখানে বহুতল ভবন থাকবে, কিন্তু খোলা জায়গাও থাকবে; যেখানে উন্নত আবাসন থাকবে, কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের জন্যও জায়গা থাকবে; যেখানে আধুনিক হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে, কিন্তু নদী-খাল-জলাধারও সুরক্ষিত থাকবে; যেখানে নতুন উপশহর হবে, কিন্তু কৃষিজমি নির্বিচার হারিয়ে যাবে না।

সবচেয়ে বড় কথা, ময়মনসিংহের উন্নয়ন যেন শুধু ইট-পাথরের উন্নয়ন না হয়; মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হয়। নতুন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সামনে তাই দায়িত্ব শুধু ‘নগর সম্প্রসারণ’ নয়, একটি বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব ও ভবিষ্যৎ ময়মনসিংহ নির্মাণ।

আজ যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তার ফল ভোগ করবে আগামী প্রজন্ম। তাই এখনই দূরদর্শী পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক তথ্য, জনসম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজন। আগামী দিনের নগরচিত্র যেন অপরিকল্পিত বিস্তারের ফল না হয়; বরং পরিকল্পিত উপশহর, সবুজ অবকাঠামো, দক্ষ গণপরিবহন, সুরক্ষিত জলব্যবস্থা ও মানবিক আবাসনের সমন্বয়ে একটি আধুনিক আঞ্চলিক নগরের উদাহরণ হয়ে ওঠে, এটাই এখন সময়ের দাবি।

  • লেখক: সহকারী রেজিস্ট্রার, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: [email protected]

Read full story at source