বিশ্বে খেলনার বাজার ১২ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে কেন
· Prothom Alo
বিশ্বের খেলনার বাজার ১২ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের। এই বিশাল বাজারে গত বছর চীন রপ্তানি করছে ৩ হাজার ৪৮২ কোটি ডলারের খেলনা। অথচ বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারের। গত অর্থবছরে অবশ্য বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে বড় অংশীদারত্ব নেওয়ার সুযোগ এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির জটিলতা, নীতিসহায়তার অভাব, মানোন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকা এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পিছিয়ে পড়ছে এই শিল্প। বিদেশি বিনিয়োগে কয়েকটি কারখানা রপ্তানিতে এগিয়ে থাকলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের সামনে বাধা অনেক।
বিশ্বজুড়ে খেলনার বাজার বড় হচ্ছে। শিশুদের পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের বিভিন্ন ধরনের খেলনার চাহিদা বাড়ছে। খেলনার বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা এখনো খুবই ছোট। বছরে ৫-৬ কোটি ডলারের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানি।
উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির জটিলতা, নীতিসহায়তার অভাব, মানোন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা না থাকা এবং ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে পিছিয়ে পড়ছে এই শিল্প। বিদেশি বিনিয়োগে কয়েকটি কারখানা রপ্তানিতে এগিয়ে থাকলেও দেশীয় উদ্যোক্তাদের সামনে বাধা অনেক।
খেলনাশিল্পের একাধিক উদ্যোক্তা জানালেন, বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা হচ্ছে। বিশ্বের অনেক ফ্যাশন ব্র্যান্ড ও খুচরা বিক্রেতা তৈরি পোশাকের পাশাপাশি খেলনাও বিক্রি করে। সে জন্য খেলনার রপ্তানি বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য তুলনামূলক সহজ।
তৈরি পোশাকের মতো খেলনা উৎপাদনেও ক্রেতাদের চাহিদা ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে হয়। খেলনাশিল্পকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়—ধাতু, কাঠ, প্লাস্টিক ও কাপড়ের তৈরি খেলনা। খেলাধুলা, বিনোদন ও শিক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি এসব পণ্যের মধ্যে আছে ঐতিহ্যবাহী খেলনা, ইলেকট্রনিক খেলনা, বিভিন্ন চরিত্রের আদলে তৈরি পুতুল ও মডেল, ধাঁধা, বোর্ড গেম, শিক্ষামূলক উপকরণসহ আরও অনেক কিছু।
আন্তর্জাতিক খেলনাশিল্পের সংগঠন দ্য টয় অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, দুই বছর ধরে বিশ্বে খেলনা বিক্রি বেড়েছে। ২০২৩ সালে খেলনা বিক্রি ছিল ১১০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। পরের বছর সেটি প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। গত বছর খেলনা বিক্রি ৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ১২৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে চীন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪১টি দেশে খেলনা রপ্তানি হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইতালিতে ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে খেলনা রপ্তানিতে চীন আধিপত্য ধরে রেখেছে। পরের অবস্থানে রয়েছে চেক রিপাবলিক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, মেক্সিকো, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, হাঙ্গেরি, ফ্রান্স ও হংকং। এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে।
ইউএন কমট্রেড ডেটাবেজের তথ্যানুযায়ী, গত বছর চীন ৩ হাজার ৪৮২ কোটি ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। এ ছাড়া চেক রিপাবলিক ৪০২ কোটি ডলার, জার্মানি ২৩৫, নেদারল্যান্ডস ১৬০ ও মেক্সিকো ১৪২ কোটি ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে।
খেলনা রপ্তানি বাড়ছে, আমদানিও
বাংলাদেশের খেলনা রপ্তানি গত চার বছর ৫-৬ কোটি ডলারের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬ কোটি ২৯ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ বেশি।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে চীন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪১টি দেশে খেলনা রপ্তানি হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইতালিতে ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি হয়েছে।
বাংলাদেশে উৎপাদন হলেও বিদেশ থেকে প্রতিবছর খেলনা আমদানি হয়। গত অর্থবছর ১ কোটি ১৬ লাখ ডলারের খেলনা আমদানি হয়েছে। এই আমদানি তার আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খেলনা আমদানি হয়েছিল ১ কোটি ১৩ লাখ ডলার।
খেলনায় বিদেশি বিনিয়োগ, কে কত রপ্তানি করল
বাংলাদেশ থেকে কাগজে–কলমে খেলনা রপ্তানি করে ২৫ প্রতিষ্ঠান। তার মধ্যে মূল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৩-১৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শীর্ষ পাঁচটি কারখানা হয়েছে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে।
ইপিবির তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে চীন, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ৪১টি দেশে খেলনা রপ্তানি হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইতালিতে ১ কোটি ৪৯ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি ৪ কোটি ২১ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে সনিক (বাংলাদেশ) লিমিটেড। এটি হংকংভিত্তিক সনিক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। নীলফামারীর উত্তরা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় (ইপিজেড) গড়ে উঠা এই প্রতিষ্ঠানটি ডাই-কাস্ট পদ্ধতিতে তৈরি বিভিন্ন গাড়ির ক্ষুদ্র মডেল উৎপাদন করে।
সনিক গ্রুপ দিনাজপুরে উইন চ্যাম্পিয়ন (বিডি) লিমিটেড ও বিপি ম্যানুফ্যাকচারিং (বিডি) কোম্পানি লিমিটেড নামে আরও দুটি খেলনা উৎপাদনের কারখানা করেছে। গত অর্থবছর উইন চ্যাম্পিয়ন প্রায় ৭৫ লাখ ডলার এবং বিপি ম্যানফ্যাকচারিং ৪৮ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শীর্ষ খেলনা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান।
জার্মান-বাংলাদেশ বিনিয়োগে নরসিংদীতে স্থাপিত কাপকেক এক্সপোর্টস নামের কারখানাটি থেকে গত অর্থবছর ৩১ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি হয়েছে। কাপড়ের তৈরি খেলনা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করেছিল। অন্যদিকে ঢাকা ইপিজেডে চীনা বিনিয়োগে স্থাপিত মেইগো (বাংলাদেশ) লিমিটেড গত অর্থবছর ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ডলারের ডাই-কাস্টের খেলনা রপ্তানি করেছে।
রপ্তানির সম্ভাবনা খুলবে কীভাবে
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল অভ্যন্তরীণ বাজারে খেলনা বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করে। গত অর্থবছর তাদের ডিউরেবল প্লাস্টিক ও আরএফএল প্লাস্টিক পৌনে ১২ লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করে। প্লাস্টিকের ঝুনঝুনি থেকে শুরু করে হাতি ঘোড়া, বল, পাজল, ব্লক, দোলনা, ট্রাইসাইকেল ইত্যাদি খেলনা রপ্তানি করে তারা।
জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, খেলনা বৈশ্বিক পণ্য। সব দেশেই খেলনার চাহিদা রয়েছে। শিশুদের খেলাধুলার পাশাপাশি সৃজনশীলতা এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। রপ্তানি বাজারে শীর্ষস্থানীয় ধরে রাখা দেশগুলো নিত্যনতুন খেলনা উদ্ভাবন করছে। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যের মান উন্নত করতে উদ্যোগ লাগবে। সরকার যদি এই খাতের উন্নয়নে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হয়, তাহলে দ্রুত ফলাফল মিলবে।
দেশে খেলনার বাজারে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান আমান প্লাস্টিক টয় ইন্ডাস্ট্রিজ। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে শ্রীলঙ্কা ও ইতালিতে খেলনা রপ্তানি করে। গত অর্থবছর প্রায় দুই লাখ ডলারের খেলনা রপ্তানি করেছে।
জানতে চাইলে আমান প্লাস্টিক টয় ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী আমান উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘খেলনা উৎপাদনের অধিকাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেই কাঁচামাল আমদানি করতে গিয়ে আমাদের প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হয়। এ ক্ষেত্রে বন্ড সুবিধা দেওয়া হলে আমাদের কাজটি সহজ হয়। তা ছাড়া খেলনার বাজারে অনেক বৈচিত্র্য। পণ্য বৈচিত্র্য বাড়াতে আমাদের উদ্যোগ লাগবে। কাজটি আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে সম্ভব না। এ জন্য সরকারের সহায়তা লাগবে।’
আমান উল্লাহ আরও বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহও নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে। প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন পর্যায়ে আমাদের ১-১৫ শতাংশ পণ্য নষ্ট হচ্ছে। চীনের এই হার ১ শতাংশ। সার্বিকভাবে আশির দশকে সরকার যেসব সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক একইভাবে উদ্যোগ নিলে কয়েক বিলিয়ন ডলারের খেলনা রপ্তানি সম্ভব বলে মনে করেন এই তরুণ উদ্যোক্তা।