১৪ কারণে লোকসান গুনছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল

· Prothom Alo

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে (ফিজিবিলিটি স্টাডি) বলা হয়েছিল, ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি গাড়ি টানেলটি ব্যবহার করবে। তবে চালু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ব্যবহার করেছে মোট ৪১ লাখ ৭২ হাজার যানবাহন। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৩ হাজার ৮৬৫টি যানবাহন টানেল পাড়ি দিচ্ছে।

সেতু কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। এ অবস্থায় কর্ণফুলী টানেলের টোল থেকে দৈনন্দিন খরচের টাকাও তোলা সম্ভব হচ্ছে না। পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে এখন প্রতিদিন গড়ে ব্যয় হচ্ছে ২৩ লাখ টাকা; আর দৈনিক আয় গড়ে ১১ লাখ টাকা।

Visit sport-newz.biz for more information.

প্রতিবেদনে টানেলের লোকসানের ১৪টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি টোল আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে।

কর্ণফুলী টানেল: দিনে ব্যয় ৩৭ লাখ, আয় ১০ লাখ

‘কর্ণফুলী টানেলের ফিজিবিলিটি স্টাডি, বাস্তবায়ন এবং বর্তমান আর্থিক অবস্থা’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি গতকাল শনিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া হয়। টানেলসংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং আর্থিক লোকসানের কারণ খতিয়ে দেখতে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংসদীয় কমিটি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ করা হয়। যান চলাচল শুরু হয় ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংসদীয় কমিটিতে দেওয়া প্রতিবেদনে লোকসানের প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে পর্যাপ্ত সড়ক সংযোগের অভাব, সংযোগ সড়কের সক্ষমতা ও উন্নয়ন ঘাটতি, কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দর না হওয়া, মেরিন ড্রাইভের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপিত না হওয়া, কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরে পরিকল্পিত নগরায়ণ না হওয়া, আনোয়ারা প্রান্তে শিল্পায়ন প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানো, বিনিয়োগ বাস্তবায়নে দেরি। এসব কারণে প্রত্যাশিত ট্রাফিক আসছে না।

এ ছাড়া আরও কিছু কারণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আনোয়ারা এলাকায় পর্যটনসুবিধা প্রত্যাশিত মাত্রায় চালু না হওয়া, সার্ভিস এলাকার প্রত্যাশিত ব্যবহার নিশ্চিত না হওয়া, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের সীমাবদ্ধতা, অতিরিক্ত ভারবাহী যান চলাচলে বিধিনিষেধ, স্ক্যানিংয়ের কারণে চালকদের মধ্যে ভীতিকেও লোকসানের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কর্ণফুলী টানেলের রাজস্ব বাড়াতে সার্ভিস এরিয়া ইজারা দেওয়া, পরিচালন ব্যয় সংকোচন, চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ না করে দূরপাল্লার গাড়িগুলোকে কর্ণফুলী টানেলমুখী করাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণে কর্ণফুলী ড্রাইডক লিমিটেডের সাতটি জেটি নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে তিনটি চালু হয়েছে। সব কটি জেটির কার্যক্রম শুরু হলে বছরে ১০০ থেকে ১২০ লাখ টন পণ্য হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে। এতে টানেলের টোল আয় বছরে ২০০ থেকে ২৪০ কোটি টাকা বাড়তে পারে। চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের নির্মাণকাজ গত ২৭ জুলাই উদ্বোধন করা হয়েছে। ১৮ মাসের মধ্যে প্রথম কারখানা উৎপাদনে যাওয়ার কথা আছে। এতেও যানবাহনের চলাচল বাড়বে।

বৈঠকে কর্ণফুলী টানেলের ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা যাচাই), বাস্তবায়ন এবং টানেলটির বর্তমান আর্থিক লোকসানের কারণ নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির আগামী বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। কর্ণফুলী টানেল–সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং বর্তমান আর্থিক লোকসানের কারণ নিয়ে সুষ্ঠু তদন্তের নিরিখে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কাজ করবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়।

২৬ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপি বাস্তবায়নে পিছিয়ে

বৈঠকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন তুলে ধরে জানানো হয়, গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের জাতীয় গড় অগ্রগতি ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ২৬টির অগ্রগতি এই গড়ের নিচে। বাকি ৩০টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অগ্রগতি জাতীয় গড়ের ওপরে ছিল।

পিছিয়ে থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হলো জনপ্রশাসন, মুক্তিযুদ্ধ, ভূমি, সংস্কৃতি, তথ্য, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া, পরিবেশ, ধর্ম এবং মহিলা ও শিশু; তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, সংসদ সচিবালয়, দুদক, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এবং পরিকল্পনা বিভাগ।

গত অর্থবছরে যেসব প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, সেগুলোর তালিকাও বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, এর আগের বৈঠকে (৮ সেপ্টেম্বর) জানানো হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫৬টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮৮।

সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বৈঠকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৫৬টি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করা হয়। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে জটিলতা, আমদানিনির্ভরতা, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে জটিলতা, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সঠিকভাবে না হওয়া, কিছু কিছু প্রকল্পে সময়মতো অর্থছাড় না হওয়া এবং আন্তমন্ত্রণালয় কনফ্লিক্টসহ বিভিন্ন কারণ তুলে ধরা হয়। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে সুপারিশ করেছে কমিটি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় কমিটিকে জানায়, সরকারি প্রকল্পে পরিচালক নিয়োগের একটি নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ সাবেক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।

এ বিষয়ে সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান রয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নীতিমালা চূড়ান্ত হলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে জটিলতার গুণগত সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

কমিটির সভাপতি জহির উদ্দিন স্বপনের সভাপতিতে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, কাজী রফিকুল ইসলাম, মঈনুল ইসলাম খান, মো. সাইফুল আলম ও রাশেদুল ইসলাম।

Read full story at source