ইলা মিত্র : ফেরা হলো না রামচন্দ্রপুরে

· Prothom Alo

২০০৫ সালের ১৪ অক্টোবর ‘ফেরা হলো না রামচন্দ্রপুরে’ শিরোনামে ইলা মিত্রকে (১৮ অক্টোবর ১৯২৫–১৩ অক্টোবর ২০০২)  নিয়ে আফজালুর রহমানের এ স্মৃতিগদ্যটি প্রকাশিত হয় প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে। আজ ইলা মিত্রের জন্মদিনে লেখাটি অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

তেভাগা আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেত্রী ইলা মিত্র ছিলেন আমার দেখা এক জীবন্ত বিস্ময়। অপরিমেয় শক্তি নিয়ে তিনি ভালোবেসেছিলেন মানুষকে। জমিদার পরিবারের এই গৃহবধূ অবলীলায় শ্রেণিস্বার্থ ত্যাগ করে বৃহত্তর সাঁওতাল কৃষকদের ন্যায়সংগত দাবি আদায়ের জন্য জীবন বাজি রেখে আন্দোলন সংঘটিত করেছেন। প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্রযন্ত্রের বর্বর পুলিশ বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দুই বছরের বেশি সময় তাঁকে অসুস্থ থাকতে হয়েছে। সে এমন অসুস্থতা, দুই বছর উঠে দাঁড়াতে পারেননি; কিন্তু মানুষের প্রতি অঙ্গীকার থেকে সরে দাঁড়াননি তিনি। এই কিংবদন্তি নারীর সঙ্গে আমি দুই দফা মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। প্রথমবার ঢাকায় আর দ্বিতীয়বার কলকাতায়।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ঢাকায় ইলা মিত্রের সঙ্গে দেখা হয় ১৯৯২ সালে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অষ্টম জাতীয় সম্মেলনে তিনি এসেছিলেন ভারতীয় মহিলা ফেডারেশনের নেত্রী হিসেবে। সেবার এই মহীয়সীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল শওকত নানার (কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান) মাধ্যমে। সে সময় নেওয়া ইলা মিত্রের দীর্ঘ সাক্ষাত্কারটি তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রথম আলোয় ছাপা হয়েছিল। কলকাতায় তাঁর নিজ বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দ্বিতীয়বার আমার কথা হয়।

ইলা মিত্র

১৯৯৪ সালে আমার এক সহকর্মীর হৃদ্‌যন্ত্রের চিকিত্সার প্রয়োজনে কলকাতা যাই। খ্যাতিমান হৃদ্‌যন্ত্র সার্জন দেবী শেঠির শিডিউল নিয়েই গিয়েছি, তবু তাঁর দেখা পেতে দেরি হচ্ছিল। অলস সময় কাটছিল কলকাতায়। আমাদের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এম আর আখতার মুকুল। আমি ভাবলাম, ইলা মিত্রের সঙ্গে এই ফাঁকে যদি দেখাটা করা যায়। মুকুল চাচাকে বললাম। একবাক্যেই সম্মত হলেন তিনি। বললেন, ‘আজ সন্ধ্যায় চল, ইলাদিকে দেখে আসি।’

ইলা মিত্রের বাসায় যখন পৌঁছালাম, তখন রাত পৌনে ৯টা। একটা ছেলে দরজা খুলে দিয়ে ভেতরে গেল। আমরা ড্রয়িংরুমে বসলাম। কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে ইলা মিত্র এলেন। আমি দাঁড়িয়ে নমস্কার করতেই তিনি বললেন, তুমি আফজাল, ঠিক মনে করতে পারছি তো?

আমি অবাক! বললাম, জি মাসিমা আমি আফজাল।
মুকুল চাচা উঠে এসে ভারী শরীরটা নুইয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন। দেখে আমিও উঠে দাঁড়ালাম, তারপর তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, মাসিমা, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিন।

১৯৯৪ সালে আমার এক সহকর্মীর হৃদ্‌যন্ত্রের চিকিত্সার প্রয়োজনে কলকাতা যাই। খ্যাতিমান হৃদ্‌যন্ত্র সার্জন দেবী শেঠির শিডিউল নিয়েই গিয়েছি, তবু তাঁর দেখা পেতে দেরি হচ্ছিল। অলস সময় কাটছিল কলকাতায়। আমাদের সফরসঙ্গী হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এম আর আখতার মুকুল। আমি ভাবলাম, ইলা মিত্রের সঙ্গে এই ফাঁকে যদি দেখাটা করা যায়। মুকুল চাচাকে বললাম। একবাক্যেই সম্মত হলেন তিনি। বললেন, ‘আজ সন্ধ্যায় চল, ইলাদিকে দেখে আসি।’

আবেগ ও স্নেহে ঘরের ভেতরের সময় কয়েক মুহূর্ত যেন থমকে থাকল।
মুকুল চাচা বললেন, ইলাদি, খবর পেয়েছিলাম আপনার জ্বর যাচ্ছে কদিন, শরীরটা এখন কেমন?

আর বলবেন না, এই একটাই তো শরীর...আর কত পারে বলুন। কী করব, প্রায়ই পার্টির কাজ কামাই করতে হয়। মাসিমা বললেন।

এবার চোখ খুলে তাকালাম, মনে হলো শুভ্র বসন এই প্রসন্নমূর্তির ওপর দিয়ে মৃদু ঝড় বয়ে গেছে। ক্লান্তি আর অবসাদ শীর্ণ দেহটায় যেন চেপে বসেছে।
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আফজাল, তোমাদের মামলাটির খবর কী? এখান থেকে তো কিছু জানতে পারি না...

আমি খুব বিস্মিত হলাম। সেবার ঢাকায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্কার নেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত শওকত ওসমান আমাদের মামলার বিষয়টা তুলেছিলেন। আমি তখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি। ওই কাগজে আমার নেওয়া সাক্ষাত্কারের একটি মন্তব্য নিয়ে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছিল।
বললাম, মাসিমা মামলা মিটে যাবে।

অবসন্ন কণ্ঠে ইলা মিত্র বললেন, মুকুলদা আর কখনোই কি আমার বাংলাদেশে যাওয়া হবে...
মুকুল চাচা কোনো কথা বললেন না।
কিছুক্ষণ পর আমার দিকে তাকিয়ে ইলা মাসি বললেন, তোমাকে ঢাকায় বলেছিলাম, ওই যে আমাদের গ্রামে মেয়েদের জন্য স্কুলটা করেছিলাম, জানো... ওখানে আমি পড়াব, এ কথাটা শুনে আমার শাশুড়ি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, গোঁড়া মুসলিম ও হিন্দু সমাজনেতারা আমাদের রামচন্দ্রপুর হাটের বাড়িতে এসে মেয়েদের পড়া ও স্কুল করার বিরোধিতা করে গেছেন। বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের পথ ঘোড়ার গাড়ির ভেতরে গা ঢাকা দিয়ে আমাকে স্কুলে যেতে হতো। আমি ও রমেন মিলে মাত্র তিনজন ছাত্রী জোগাড় করতে পেরেছিলাম। শুনেছি, সেই স্কুলটা নাকি এখন মেয়েদের কলেজ হয়েছে। খুব ইচ্ছা হয়, একবার দেখে আসি।

আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আফজাল, তোমাদের মামলাটির খবর কী? এখান থেকে তো কিছু জানতে পারি না...। আমি খুব বিস্মিত হলাম। সেবার ঢাকায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্কার নেওয়ার সময় সেখানে উপস্থিত শওকত ওসমান আমাদের মামলার বিষয়টা তুলেছিলেন। আমি তখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় কাজ করি। ওই কাগজে আমার নেওয়া সাক্ষাত্কারের একটি মন্তব্য নিয়ে আদালত অবমাননার মামলা হয়েছিল।

আপনার নাচোলের সাঁওতালরা এখন কেমন আছে, খবর জানেন?
‘না, জানি না। ভাবতে অবাক লাগে, আজ কী করে থাকতে পারি এত বছর ওদের খবর না নিয়ে! ১৪ দিনের ছেলেকে হাসপাতালে শাশুড়ির কোলে তুলে দিয়ে আমি ওদের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। সেই ছেলের সঙ্গে আমার যখন দেখা হলো, তখন ওর বয়স সাত বছর। আমাকে চিনতে পারেনি। কী প্রচণ্ড ভালোবাসত ওরা আমাকে। পুলিশের মার খেয়ে, গুলি খেয়ে মরেছে, তবু পুলিশের কাছে স্বীকার করেনি আমি ওদের রানিমা। পুলিশ ওদের সাক্ষী করতে পারলেই আমার ফাঁসি নিশ্চিত হয়। ওরা স্বীকারোক্তি না দিলেও স্বৈরশাসকের আদালত আমার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দিয়েছিলেন। আমার তখন কোনো শাস্তিতেই ভয় ছিল না।

আমি বললাম, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুও তো তাঁর বারদী গ্রামের বাড়ি ঘুরে এলেন সেদিন। আপনিও তো যেতে পারেন রামচন্দ্রপুর।

কথাটা শুনে একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আগের কথাগুলো বলতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছিলেন।

তারপর দম নিয়ে বললেন, স্বাধীনতার পরপর যেবার বাংলাদেশে গেলাম, তখন শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গেও দেখা হয়েছিল। তাঁকে আমার মামলার কথা বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীন দেশে এই মামলার কথা থাকতেই পারে না।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেবেন। আমার নামে মনুমেন্ট হবে।’ ১৯৫৪ সালে নুরুল আমিন সরকার জেলে আমার কাছ থেকে মুচলেকা আদায় করতে চেয়েছিল, আমি যেন পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে যাই। তারাই আমার আমেরিকা বা লন্ডনে যাওয়ার ও উন্নত চিকিত্সার ব্যবস্থা করে দেবে। জানো, সেদিন আমি রাজি হইনি; কিন্তু দেখ, মুচলেকা সই না করলেও আমার বাংলাদেশে আর ফেরা হলো না।

সেদিন না খেয়ে আমাদের বের হতে দেননি ইলা মাসি। খাবার টেবিলে বললেন, যে প্রবল রক্তক্ষরণের মুখে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়েছিল। আমি শুনেছি, তখন আমার মুসলমান ভাইয়েরা আমাকে রক্ত দিতে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছিল। ভয়ে কোনো হিন্দু আসতে পারেনি। দেখ আমার শরীরে বইছে মুসলমান ভাইদের রক্ত।
ইলা মিত্রের আর ফেরা হয়নি তার রামচন্দ্রপুর গ্রামে। সেই সাঁওতাল অধ্যুষিত জনপদে আর কখনোই ফিরে আসবেন না তাঁদের প্রিয় রানিমা। বাংলার মহীয়সী মানবতাবাদী সংগ্রামী নারী ইলা মিত্র এখন এক কিংবদন্তি। বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসের অহংকার।

২০০২ খ্রিষ্টাব্দে ১৩ অক্টোবর বাংলার অগ্নিকন্যা, সাঁওতাল আন্দোলন ও কৃষকবিদ্রোহের নেত্রী ইলা মিত্রের দেহাবসান হয়। এই মহীয়সী সংগ্রামী বাঙালি নারীর প্রতি নিবেদন করছি আমার প্রাণের গভীর শ্রদ্ধা।

Read full story at source