যে জমিতে বাবা ছিলেন বর্গাচাষি, সেই জমি কিনে ছেলে গড়েছেন কৃষি খামার
· Prothom Alo

সুমন আহমেদ তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। তাঁর বাবা আবদুল হামিদ হাওলাদার অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করতেন। একবার একটি জমিতে ডাল চাষ করেছিলেন। বর্গার ভাগ রেখে জমির তিন মালিকের প্রাপ্য ডাল সমান করে তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন। কাঁধে ডালের বস্তা নিয়ে সুমনও ছিলেন বাবার সঙ্গে।
Visit betsport24.es for more information.
তিন মালিকের একজনের বাড়িতে ডাল পৌঁছে দেওয়ার পর অভিযোগ এল, তাঁকে ডাল কম দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে সুমনের বাবাকে ভর্ৎসনাও করেন। কথাটি গভীরভাবে দাগ কাটে কিশোর সুমনের মনে। সেদিনই তিনি সংকল্প করেছিলেন, একদিন নিজের জমির কৃষক হবেন।
৭২ বছর বয়সে সেই সংকল্প পূরণ করেছেন সুমন। যে জমিতে তাঁর বাবা একসময় বর্গা চাষ করতেন, সেই জমিই কিনেছেন তিনি। বিদেশে রংমিস্ত্রির কাজের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে পরে সেখানে গড়ে তুলেছেন সমন্বিত কৃষি খামার। পেঁপে, বেগুন, ধুন্দুল, মিষ্টিকুমড়া ও মাছ চাষের পাশাপাশি উৎপাদন করছেন পেঁপে ও বিভিন্ন সবজির চারা।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের বায়লাখালী গ্রামের সুমন এখন শুধু সফল কৃষক নন, অন্যদেরও কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার পথ দেখাচ্ছেন।
বিদেশে গিয়ে কৃষি নিয়ে নতুন অভিজ্ঞতা
দরিদ্র পরিবারের সন্তান সুমন সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। অর্থের অভাবে আর পড়াশোনা এগোয়নি। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পাড়ি জমান ঢাকায়। কখনো রাজমিস্ত্রির জোগালি, কখনো শ্রমিক, আবার কখনো রংমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেছেন।
১৯৮২ সালে রংমিস্ত্রি হিসেবে কুয়েতে হুন্দাই কোম্পানিতে কাজের সুযোগ পান। পরে কোম্পানির কাজেই কাতার, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যান। সর্বশেষ ২০০৬ সালে পাড়ি জমান দক্ষিণ আফ্রিকায়।
বিদেশে গিয়ে কৃষিকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেন সুমন। দেখেন, জার্মানি ও চীনের লোকজন বড় বড় কৃষি খামার গড়ে সফলতা পেয়েছেন। সেখানে কৃষি কেবল জীবিকা নয়, লাভজনক ব্যবসাও।
কৃষি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা নিতে এরপর মালয় উপদ্বীপে যান সুমন। সেখানে বড় কৃষি খামার ঘুরে দেখার সময় পেঁপে চাষ তাঁর নজর কাড়ে। ভারতীয় শাহি ও কাশ্মীরি জাতের পেঁপে দেখে মুগ্ধ হন। এসব জাতের বীজ সংগ্রহ করতে কেরালার কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিন্তু দেশে ফিরে পেঁপে চাষ করবেন, এমন জমি তখনো তাঁর ছিল না।
সুমনের খামারে এখন ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেনজমি কিনে গড়েন স্বপ্নের খামার
পৈতৃক বাড়িটুকু ছাড়া সুমনের পরিবারের তেমন কোনো জমি ছিল না। বিদেশে উপার্জন করা অর্থ দিয়ে অল্প অল্প করে জমি কিনতে শুরু করেন সুমন। একসময় বাড়ির পাশে ১২৩ শতক এবং কিছুটা দূরে আরও ৫০ শতক জমি কেনেন।
২০১৯ সালে দেশে ফিরে এসব জমিতে সমন্বিত কৃষি খামার গড়ার পরিকল্পনা করেন। একপর্যায়ে একটি পুকুর খনন করেন। পুকুরের পাশে শ খানেক পেঁপের চারা লাগান। পুকুরে শুরু করেন মাছ চাষ। ছোট পরিসরের সেই উদ্যোগই ধীরে ধীরে বড় খামারে রূপ নেয়।
এখন সুমনের দুটি খামারের মোট আয়তন ১৭৩ শতক। একটিতে আছে প্রায় ১ হাজার ২০০ পেঁপেগাছ ও তিনটি পুকুর। অন্য খামারে আছে আরও ৪০০ পেঁপেগাছ।
পেঁপে থেকে বীজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব বীজ প্রতি কেজি ৫০ হাজার টাকায় স্থানীয় চারা উৎপাদকদের কাছে বিক্রি করছেন সুমন আহমেদপেঁপে চারায় বড় সম্ভাবনা
সুমন এবার পেঁপে বিক্রি করেছেন ১৭ লাখ টাকার। এতে অন্তত আট লাখ টাকা লাভের আশা করছেন। খামারে থাকা পেঁপে আরও অন্তত ৬ লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। তবে এই পেঁপে তিনি বিক্রি করবেন না। প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যাঁরা এই খামার দেখতে আসেন, তাঁদের আপ্যায়নের জন্য এসব রেখে দিয়েছেন। এর পাশাপাশি চাষ করছেন বেগুন, ধুন্দুল ও মিষ্টিকুমড়া।
সুমনের মতে, তাঁর কৃষি উদ্যোগের বড় সম্ভাবনা এখন চারা উৎপাদনে। এ বছর প্রায় ২০ লাখ পেঁপের চারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছেন। এরই মধ্যে ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ অনুযায়ী সাড়ে চার লাখ চারা তৈরি করেছেন। প্রতিটি চারা বিক্রি করছেন ৪০ টাকা করে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকেরা এই খামারে আসেন চারা কিনতে এবং চাষের কৌশল শিখতে। ভারত থেকে সংগ্রহ করা পেঁপের বীজের দাম কেজিপ্রতি ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
সুমন আহমেদ জানান, এক কেজি বীজে ২১ হাজার চারা তৈরি করা যায়। আর প্রতিটি চারা বিক্রি করে তাঁর দুই টাকা লাভ থাকে।
সুমনের খামারের আয়ও বেড়েছে ধারাবাহিকভাবে। ২০২৩ সালে আয় হয়েছিল ৬ লাখ টাকা, ২০২৪ সালে ১৫ লাখ এবং ২০২৫ সালে ২৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা। চলতি বছর পেঁপে, সবজি, মাছ ও চারা বিক্রি করে আয় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন।
নিজের পাঠশালায় বিভিন্ন স্থান থেকে আসা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলছেন সুমন আহমেদউন্নত চারা উৎপাদনে আধুনিক সিডলিং হাউস
সুমন ভারতীয় শাহি ও কাশ্মীরি জাতের বীজ থেকে পেঁপের চারা উৎপাদনের জন্য খামারে গড়ে তুলেছেন বিশেষ সিডলিং হাউস।
সিডলিং হাউসের ছাউনিতে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত মানের ইউভি স্টেবিলাইজড পলিথিন। এর মাধ্যমে ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বীজের অঙ্কুরোদ্গম এবং চারার প্রাথমিক বৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা সহায়তা করে। যত্নসহকারে চারা উৎপাদনের কারণে তাঁর খামারের চারার মান ভালো হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাহিদা বাড়ছে।
বাবুগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুর রউফ সুমনের উদ্যোগের প্রশংসা করে সুমনকে পরিশ্রমী ও উদ্ভাবনী কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, উন্নত মানের পেঁপের চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি পুরো অঞ্চলের কৃষকদের উপকৃত করছেন। তাঁর এই উদ্যোগটি অনুকরণীয়।
খামারে উৎপাদিত হচ্ছে উন্নত মানের পেঁপের চারারোগমুক্ত ও উচ্চফলনশীল উন্নত জাতের পেঁপের চারা উৎপাদন করায় সুমনের খামারের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে জানিয়ে বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি তথ্য সার্ভিসের কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাহিদ বিন রফিক বলেন, ফলে সারা দেশে এসব চারার চাহিদা বাড়ছে। বরিশালের স্থানীয় ও লবণাক্ত মাটিতেও তাঁর উৎপাদিত পেঁপের চারা ভালোভাবে মানিয়ে নেয় এবং ভালো ফলন দেয়।
গত বৃহস্পতিবার সুমনের খামারে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক পেরিয়ে সিডলিং হাউসে কাজ করছেন কয়েকজন নারী। কেউ পলিথিনের ব্যাগে মাটি ভরছেন, কেউ তাতে বীজ বুনছেন। আবার কেউ বীজ বপন করা ব্যাগগুলো অঙ্কুরোদ্গমের জন্য ট্রেতে সাজিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখছেন।
আরও সামনে এগোতেই দেখা যায়, পুকুরের ভেতরে তৈরি বৈঠকখানায় বসে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছেন সুমন। পুকুরের দুই পাড়ে সারি সারি পেঁপেগাছ। গাছের কাণ্ডে ঝুলছে অসংখ্য পেঁপে। বাগানে শ্রমিকদের কেউ বেডে পানি দিচ্ছেন, কেউ গাছের গোড়ার মাটি আলগা করছেন।
সুমনের খামারে এখন ১৫ জন শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জন নারী। নারী শ্রমিক জেসমিন আক্তার বলেন, ‘এই খামারে কাজ করে পরিবারে সচ্ছলতা এসেছে।’
কৃষকের সম্মান ফেরানোর স্বপ্ন
নিজে সফল হওয়ার পরও থেমে থাকেননি সুমন। স্ত্রী দেলোয়ারা বেগমের নামে বায়লাখালী এলাকায় গড়ে তুলেছেন দেলোয়ারা কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। সেখানে কৃষকদের বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করেন।
সুমনের দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় দুই হাজার মানুষকে বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। তাঁদের অনেকেই এখন কৃষিতে উদ্যোক্তা হয়েছেন।
কুমিল্লার লাকসাম থেকে পেঁপের চারা কিনতে এসেছেন তরুণ উদ্যোক্তা ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, ‘২০০টি চারা কিনেছি। এক দিন খামারে থেকে চাষাবাদ সম্পর্কে প্রশিক্ষণও নিয়েছি।’