রাজশাহী সিল্কে বাড়ছে ক্রেতার টান
· Prothom Alo

রাজশাহী জেলার উন্নয়ন রেশম বস্ত্র তথা রেশম শিল্পকেন্দ্রিক। জিআই স্বীকৃতিও পেয়েছে রাজশাহী সিল্ক। ঐতিহ্যের কথা মনে রেখে রাজশাহী–ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী একটি আন্তনগর ট্রেনের নামই দেওয়া হয়েছে সিল্ক সিটি এক্সপ্রেস।
রাজশাহীতে বেড়াতে এসে ফেরার সময় স্মৃতি হিসেবে রাজশাহী সিল্ক নেওয়া হবে না, তা কি হয়? এই রেওয়াজ আজকের না। এই ঐতিহ্যের কারণেই সিল্ক দিয়ে রাজশাহী জেলার ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে। রাজশাহীকে বলা হয়েছে ‘সিল্ক হেভেন’। লোগোতে একটি বৃত্তের দুই পাশে উজ্জ্বল সোনালি বর্ণের দুটি উড়ন্ত রেশম বস্ত্র দিয়ে বোঝানো হয়েছে, এই জেলার উন্নয়ন রেশম বস্ত্র তথা রেশম শিল্পকেন্দ্রিক। জিআই স্বীকৃতিও পেয়েছে রাজশাহী সিল্ক। ঐতিহ্যের কথা মনে রেখে রাজশাহী–ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী একটি আন্তনগর ট্রেনের নামই দেওয়া হয়েছে সিল্ক সিটি এক্সপ্রেস।
Visit moryak.biz for more information.
সিল্কের শাড়ির চাহিদা বাড়ছেরাজশাহীর এই ঐতিহ্যটির সাম্প্রতিক হালহকিকত জানতে ২৭ সেপ্টেম্বর সপুরা সিল্কের বিক্রয়কেন্দ্রে ঢুঁ মেরেছিলাম। সেখানেই কলেজশিক্ষক মনিকা কবিরাজের সঙ্গে দেখা। বগুড়া থেকে পূজার বাজার করতে এসেছেন। সঙ্গে এসেছেন তাঁর মাসি আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন ছেলে। মনিকা কবিরাজ বলেন, ‘পূজায় সিল্ক ছাড়া আমার চলেই না। গত পূজায় তিনটা শাড়ি কিনেছিলাম। এবার নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনব, বোন ও মাসির জন্য কিনব। আর ছেলের জন্য কিনব সিল্কের পাঞ্জাবি।’ সিল্কের শাড়ি কেনার জন্য পূজায় কেমন বাজেট থাকে—জানতে চাইলে মনিকা হাসতে হাসতে বললেন, পছন্দ হলে বাজেট ম্যাটার করে না। বাজেট একটু সমন্বয় করে নেওয়া যায়।
টাঙ্গাইলে শুধু শাড়িই নয়, নীরবে গড়ে উঠেছে ছেলেদের পোশাকের বাজারবরিশালের মেয়ে এলিনা তাসনীম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ফার্মেসি বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করেন। বন্ধুদের সঙ্গে সিল্কের শাড়ি কিনতে এসেছেন তিনি। সিল্কের তো অনেক আইটেম, কোনটার প্রতি বিশেষ দুর্বলতা, জানতে চাইলে বলেন, ‘সিল্কের শাড়িটা পরে চলাফেরা করা খুব আরামদায়ক। এ জন্য শাড়িটাকেই আমি সব সময় অগ্রাধিকার দিই। এ ছাড়া শাড়ির অনেক ভ্যারাইটি পাওয়া যায়। পছন্দমতো কেনা যায়।’
বিক্রির শীর্ষে রয়েছে সিল্কের থ্রি–পিস, পাঞ্জাবি ও শাড়িটাঙ্গাইল থেকে রাজশাহীতে বেড়াতে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারিন তাসনীম। রাজশাহী সিল্কের ঐতিহ্যের কথা মনে করে তিনি সিল্কের শোরুমে এসেছেন। তিনি বললেন, সিল্কের শাড়ি, স্কার্ফ, সালোয়ার–কামিজ—সবই পছন্দ। ইতিমধ্যে একটা স্কার্ফ কিনেছেন, এখন একটা শাড়ি দেখছেন।
শাড়ির নকশায় আনা হয়েছে বৈচিত্র্যসপুরা সিল্ক মিলসের পরিচালক সাজ্জাদ আলী জানান, রেশমের কাপড়ের চাহিদা বেড়েছে। মেয়েদের এখন রেশমের শাড়ির প্রতি টান বেড়েছে। সারা দেশে রেশমের থানকাপড়ের ওপরে হাতের কাজ করছেন প্রায় ৭০০ নারী। হাতের কাজ করা শাড়ির খুবই কদর। শাড়ি ছাড়াও তাঁরা রেশমের পাঞ্জাবি, শার্ট, থ্রি–পিস, ফতুয়াসহ হরেক রকম আইটেম করেছেন। এগুলোর বেশ চাহিদা।
অনলাইনে কেনাকাটা করছেন, সতর্ক আছেন তোপোশাকে অনেক বৈচিত্র্যও আনা হয়েছে। এ জন্য গত দুই বছর আগের তুলনায় সিল্কের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। বিশেষ করে ‘র’ সিল্ক বা মসলিন থানকাপড়ের উৎপাদন সর্বোচ্চ পরিমাণ করেও তাঁরা চাহিদা মেটাতে পারছেন না। তিনি বলেন, মসলিন থানকাপড়ের ওপরে হাতের কাজ, ব্লকপ্রিন্ট, এমব্রয়ডারি, জামদানির নকশাসহ নানা রকমের কাজ করা হচ্ছে। একশ্রেণির তরুণ-তরুণী এই থানকাপড় কিনে নিয়ে তাতে নানা আধুনিক নকশার কাজ করে অনলাইনে বিক্রি করছেন। তাঁরা পোশাকে নতুনত্ব নিয়ে আসছেন। এ জন্য সিল্কের চাহিদা বাড়ছে। তবে এই পূজার চাহিদার শীর্ষে রয়েছে থ্রি–পিস, পাঞ্জাবি ও তারপর রয়েছে শাড়ি।
সিল্কের শাড়ি মানিয়ে যায় উৎসবের সময়এই বিক্রয়কেন্দ্রে মসলিন থান বা ‘র’ সিল্কের শাড়ি কিনতে এসেছেন রাজশাহী নগরের সাধুর মোড় এলাকার তরুণী তানিয়া শারমিন। তিনি বলেন, দু–তিন দিন পরপরই তাঁকে এখানে আসতে হয়। তাঁর একটি অনলাইন পেজ রয়েছে। তিনি এখান থেকে সিল্কের মসলিন থান কিনে নিয়ে তার ওপরে আধুনিক নকশা করে বাইরে বিক্রি করেন। কয়েকটি শাড়ির নকশা বের করে দেখালেন। সেগুলো হাতে করা নকশা। এগুলো খুবই জনপ্রিয়। তাঁর হাতে ধরা ছিল একগাদা শাড়ি। তিনি সেগুলো কিনেছেন বলে জানালেন।
আছে নানা নকশার পাঞ্জাবিওসরকারি রেশম কারখানার সামনের বিক্রয়কেন্দ্র থেকেও ক্রেতারা রেশম কাপড় কিনছেন। এই বিক্রয়কেন্দ্রের পণ্যতালিকায় রয়েছে গরদ শাড়ি, টাইয়ের কাপড়, টাই, ২/২ থান, প্রিন্টেড শাড়ি, থান, টু–পিস, হিজাব ও ওড়না, স্ট্রাইপ সুপার বলাকা, ধুপিয়ান সার্টিন, ২/৪ গ্রে থান ইত্যাদি।
পূজা উপলক্ষে সিল্ক শাড়ি যে দামে বিক্রি হচ্ছেধুপিয়ান সিল্কের একটু ভারী কাপড়ের পাঞ্জাবিগুলো মানুষ সাধারণত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরে থাকে। সিরাজগঞ্জ থেকে একজন সরকারি কর্মকর্তা তাঁর সহকর্মীদের জন্য এই পাঞ্জাবি কিনতে এসেছেন। একসঙ্গে ১০টি পাঞ্জাবি কিনলেন তিনি। দাম সাড়ে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে।
নানা নকশার সিল্কের শাড়িপাশের উষা সিল্ক নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়েও দেখা গেল আসলেই সিল্কের পোশাকের চাহিদা বাড়তি। সেখানেও ক্রেতাদের ভিড়। প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জহুরুল ইসলাম বলেন, চাহিদা এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি। তিনিও বলেন, বিক্রির শীর্ষে রয়েছে সিল্কের থ্রি–পিস, পাঞ্জাবি ও শাড়ি।
সিল্কের পোশাকে রাজকীয় রূপপোশাক দাম
সফট সিল্ক শাড়ি ৩০০০–৭৫০০
এন্ডি সিল্ক শাড়ি ৩৮৫০–৭৯৫০
‘র’ সিল্ক হ্যান্ড প্রিন্ট শাড়ি ৩৫৫০–৬৫০০
তসর সিল্ক শাড়ি ৮৮০০–১৯২০০
মসলিন সিল্ক এমব্রয়ডারি শাড়ি ৯৫০০–৩২৫০০
বলাকা সিল্ক স্টিচ শাড়ি ১৭০০০–২৮০০০
তসর সিল্ক এমব্রয়ডারি শাড়ি ১৯৫০০–৩২৫০০
সফট ও ‘র’ সিল্ক থ্রি-পিস ৬০৫০–৩২০০০
সিল্ক শার্ট ২০০০–৩৫০০
সিল্ক পাঞ্জাবি এন্ডি/বলাকা ৬৫০০–২২০০০
সিল্ক ওড়না ও স্কার্ফ ৫৫০–৮৫০০
থানকাপড় প্রতি গজ
‘র’ সিল্ক মসলিন থান ৪৫০
বলাকা থান ১০৫০
ধুপিয়ান থান ১২৫০
মটকা থান ৮৯০
সফট সিল্ক প্রিন্ট থান ৮৫০
‘র’ মসলিন প্রিন্ট থান ৫৫০
সিল্কের আভিজাত্যে