দত্তকের নামে শিশু কেনাবেচা, ফেসবুকে চলে দর–কষাকষি

· Prothom Alo

চড়া দাম হাঁকিয়ে শিশু বিক্রির প্রস্তাব এসেছে ফেসবুকের একটি পোস্টে, ‘ইমার্জেন্সি একটা ছেলে বাচ্চা দেওয়া হবে, বয়স ৬ মাস, ডিমান্ড ২ লাখ টাকা, লোকেশন চট্টগ্রাম।’

আমি পোস্টটি পড়লাম ‘সন্তান দত্তক দেওয়া-নেওয়া হয়’ নামের একটি গ্রুপে। পোস্টদাতা প্রতারকদের দূরে থাকতে বলেছেন। তিনি লিখেছেন, ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা যাঁরা চাইছেন, তাঁরা আসলে বাচ্চা দেবেন না।

Visit biznow.biz for more information.

এই যুক্তি খাড়া করে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি সম্ভাব্য ক্রেতাদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘এটা ১০০% রিয়েল পোস্ট, সবকিছু বুঝেশুনে তারপর নক দিবেন।’

ফেসবুকে ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’-এর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। এখানে একজন নামবিহীন অংশগ্রহণকারী ফোন নম্বর দিয়ে গত বছর লিখেছিলেন, ‘একটি বাচ্চা মেয়ে বিক্রি করা হবে।’

গত জুনে ‘দত্তক দেওয়া ও নেওয়া/চাইল্ড অ্যাডপশন’ গ্রুপে একজন লিখেছেন, ‘বিশেষ অফারে একটা ছেলে বাবু দত্তক দেয়া হবে।’ ফেসবুকে কাছাকাছি নামের অনেক গ্রুপে এমন বিজ্ঞপ্তির ছড়াছড়ি। গ্রুপগুলোতে দত্তকের জন্য বাচ্চা চাওয়ার পোস্টও অনেক।

এভাবে ফেসবুকে রীতিমতো দর–কষাকষি করে অর্ডার দিয়ে কেনাবেচার আলাপ চলছে শিশু মায়ের গর্ভে থাকার সময় থেকে। ফেসবুকের বাইরে টাকার বিনিময়ে দত্তক দেওয়া–নেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আমরা সরেজমিনে দেখে এসেছি।

এগুলো আইন এবং সরকারের নজরদারির বাইরে চলছে। এভাবে কত শিশু কেনাবেচা হচ্ছে, সে তথ্য পাওয়া কঠিন।

ফেসবুকে ‘বাচ্চা দত্তক নেওয়া এবং দেওয়ার গ্রুপ’-এর সদস্যসংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। এগুলো আইন এবং সরকারের নজরদারির বাইরে চলছে। এভাবে কত শিশু কেনাবেচা হচ্ছে, সে তথ্য পাওয়া কঠিন।

গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকার মো. সোহাগ মিয়ার সঙ্গে মিলে যাচাই-বাছাই করে আমরা ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ ঘেঁটে দেখেছি। বেশির ভাগের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ, তবে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে।

পরিস্থিতি অনুসন্ধানের জন্য তিনটি গ্রুপে যোগ দিয়েছি; পরিচয় দিয়ে অথবা গোপন করে ইনবক্সে আর মুঠোফোনে দর–কষাকষি করেছি। নিয়মিত ফলো করেছি দুটি গ্রুপ।

চোখে পড়েছে, মেয়েশিশুর চেয়ে ছেলেশিশুর দর বেশি। হাতে গোনা কিছু পোস্টে শিশু প্রাপ্তির কথা আছে। প্রতারণার ঝুঁকি আর অভিজ্ঞতার কথা আছে বেশ কিছু পোস্টে। কোনো পোস্টদাতাকে বাটপারও বলা হয়েছে। কিছু পোস্টদাতা একাধিক গ্রুপে সক্রিয়।

কিছু পোস্টে গর্ভকালীন বিভিন্ন পর্যায়ের ডাক্তারি রিপোর্ট কিনতে চাওয়া হয়েছে। বেশ কিছু গ্রুপে শুক্রাণু (স্পার্ম) দান অথবা গর্ভদানের (সারোগেসি) আলাপই প্রধান। সেগুলোতে যৌনসেবা সরবরাহের প্রস্তাবও আছে।

একটি গ্রুপের মাধ্যমে আমরা এক নারী দালালের খোঁজ পাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে তাঁরা সন্তান রাখতে অনিচ্ছুক গর্ভবতীদের সন্ধান পান। গর্ভবতী নারীরা বাচ্চা দিয়ে দিতে রাজি হলে সংঘবদ্ধ চক্র প্রসব পর্যন্ত তাঁদের দেখভাল করে। ছেলে নবজাতকের দাম পড়ে তিন লাখ আর মেয়ের দুই লাখ টাকা। দালালেরা কমিশন পান।

এদিকে কুষ্টিয়ার আবদুল আলিম একটি গ্রুপে লিখেছেন, তিনি তিনবার ঠকেছেন। মুঠোফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শেষ দফায় একটি নবজাতকের জন্য দাম ঠিক করেছিলেন। এক নারী হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কলে বাচ্চাকে দেখান। তারপর পথখরচা বাবদ অগ্রিম ১০ হাজার টাকা চান।

আবদুল আলিম বলেন, বিশ্বাস করে বিকাশে টাকা পাঠানোর পর ফেসবুকের সেই গ্রুপ উধাও। হোয়াটসঅ্যাপসহ সব নম্বর ব্লক করে দেয়। তাঁর আক্ষেপ, প্রতারক চক্রকে থামানো বা দেখার কেউ নেই!

গত ১২ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম আলোর ফ্যাক্টচেকার মো. সোহাগ মিয়ার সঙ্গে মিলে যাচাই-বাছাই করে আমরা ফেসবুকের ৩৯টি পাবলিক গ্রুপ ঘেঁটে দেখেছি। বেশির ভাগের সদস্যসংখ্যা কয়েক শ, তবে প্রায় ২০ হাজার সদস্যের গ্রুপও আছে।

ফেসবুক গ্রুপে হাঁকডাক

নবজাতক

আমরা এক ডজন গ্রুপের ২৮৮টি পোস্ট খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করেছি। এগুলোর মধ্যে দত্তকের জন্য শিশু প্রার্থনা করে পোস্ট ছিল ৩৪টি। আর শিশু দেওয়ার প্রস্তাব ছিল ৬৩টি পোস্টে। ছেলে-মেয়ে উল্লেখ করার পাশাপাশি ‘বেবি’,‘নিউবর্ন’, ‘সন্তান’, ‘যমজ বাচ্চা’ এমন চাহিদা আর জোগানের কথা আছে।

হাটে হাঁকডাকের কিছু নমুনা দেখুন—‘আমার একটা ছেলে বাবু চাই, খুব ইমার্জেন্সি দরকার।’ ‘অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসে বাচ্চা লাগবে।’ একজন ৫০ হাজার টাকা বাজেটে ১০ দিন বা ১ মাসের ছেলে বাচ্চা চেয়েছেন।

এক নারী লিখেছেন, পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতীর সঙ্গে চুক্তি করবেন। সিজারিয়ানের খরচ দিয়ে শিশুকে ইতালি নিয়ে যাবেন। আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য তিন-চার মাস বয়সী ‘সুন্দর, ফরসা, কিউট মেয়ে বাবু’ চেয়েছেন।

এক শিশু বিক্রেতা লিখেছেন, ‘একটা মেয়ে বাচ্চা দত্তক দেওয়া হবে, পরিবারের “ডিমান্ড” আছে, কোনো অগ্রিম দিতে হবে না, আসবেন, দেখবেন, কথা বলবেন, কাগজ করবেন, নিয়ে চলে যাবেন।’

বাচ্চা নিতে চাইলে ইনবক্সে লিখতে বলা হয়, তখন যোগাযোগের ফোন নম্বরও পাওয়া যায়। শিশু দিতে আগ্রহী আটজনের সঙ্গে আমরা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অথবা গোপন রেখে মুঠোফোনে, হোয়াটসঅ্যাপে ও মেসেঞ্জারে কথা বলেছি।

কিছু পোস্টে গর্ভকালীন বিভিন্ন পর্যায়ের ডাক্তারি রিপোর্ট কিনতে চাওয়া হয়েছে। বেশ কিছু গ্রুপে শুক্রাণু (স্পার্ম) দান অথবা গর্ভদানের (সারোগেসি) আলাপই প্রধান। সেগুলোতে যৌনসেবা সরবরাহের প্রস্তাবও আছে।

কার বাচ্চা, কে বেচে

মা ও শিশু

দুই লাখ টাকায় ‘ইমার্জেন্সি ছেলে বাচ্চা’ বিষয়ে পোস্টটি যিনি দিয়েছিলেন, তিনি একাধিক গ্রুপে সক্রিয়। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রথমে মেসেঞ্জারে, পরে মুঠোফোন নম্বরে তাঁর সঙ্গে কথা বলি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, বাচ্চার মায়ের অনুরোধেই তিনি ফেসবুকে পোস্টটি দিয়েছেন। এই বাচ্চা বিক্রির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। পোস্টে কোথাও মায়ের ফোন নম্বর ছিল না। তিনি একটা নম্বর দিলেন।

পোস্টে ছিল ‘লোকেশন চট্টগ্রাম’। ১৩ সেপ্টেম্বর ফোন করলে এক নারী বললেন, তিনি নরসিংদী থাকেন। শিশুটি নেব বললে তিনি আমার কাছে এক লাখ টাকা চাইলেন। বললেন, ‘বাচ্চা হইতে, বাচ্চারে ৬ মাস পালতে, প্যাম্পার্স কিনতেই তো ৫০ হাজার টাকা খরচ হইয়া গেছে।’

কিন্তু বাচ্চাটা বিক্রি করবেন কেন? তাঁর উত্তর, ‘স্বামী চইল্যা গেছে। আরেক বাচ্চা আছে। ফ্যামেলিগত সমস্যা আছে।’

তিনি নিজের নাম-ঠিকানা দিলেন না, আমার নাম-পরিচয়ও জানতে চাইলেন না। বললেন, নরসিংদী গিয়ে ফোন করলে ঠিকানা দেবেন অথবা আমার ঠিকানা দিলে বাচ্চাকে সেখানে পৌঁছে দেবেন।

বাচ্চাকে দেখতে চাইলে এই নারী হোয়াটসঅ্যাপে একটি শিশুর ছবি এবং টিকার কার্ড পাঠালেন। সেই কার্ডে বাবার নাম লেখা রাকিব হাসান। ঠিকানা গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। নারীটির হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও রাকিব হাসানের নামে।

এক নারী লিখেছেন, পাঁচ-ছয় মাসের গর্ভবতীর সঙ্গে চুক্তি করবেন। সিজারিয়ানের খরচ দিয়ে শিশুকে ইতালি নিয়ে যাবেন। আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায় নেওয়ার জন্য তিন-চার মাস বয়সী ‘সুন্দর, ফরসা, কিউট মেয়ে বাবু’ চেয়েছেন।

ফেসবুক গ্রুপের সেই পোস্টদাতাকে ফোন দিলে এবার তিনি বললেন, ফেনী থেকে একজন ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিতে চাচ্ছেন। কিন্তু দুই লাখ টাকাই লাগবে। পরে আবার বললেন, তাঁর উদ্দেশ্য ওই মাকে সাহায্য করা। এখান থেকে তিনি কোনো টাকার ভাগ পাবেন না।

একটি গ্রুপে ‘কাদের কাদের’ নামের একজন নিজের সঙ্গে দেড়-দুই বছর বয়সী একটি শিশুর ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, এটা তাঁর নিজের সন্তান। স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে দেবেন। স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করতে তিনি ছেলেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে দত্তক দেবেন।

আরেকটি পোস্টে ব্যক্তিটি তাঁর ফোন নম্বর দিয়েছেন। সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে তাঁর সঙ্গে কথা বলি। তিনি বললেন, নিজের বাচ্চা নিজে দত্তক দিলে সমস্যার কিছু নেই।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি বলছেন, ‘শিশু দত্তক’, ‘নবজাতক প্রয়োজন’, ‘শিশু নিতে চাই’, ‘বিনিময়ে এত টাকা’—এ ধরনের পোস্টকে সম্ভাব্য শিশু পাচার বা শোষণের ঝুঁকি হিসেবে দেখা দরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার উচিত বিষয়টি প্রাথমিকভাবে যাচাই করা।

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ফউজুল আজিম এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা দরদাম যদি বাস্তবে শিশুর হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে টাকা কারা নিচ্ছে, কোনো মধ্যস্থতাকারী বা চক্র আছে কি না এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তদন্তে তা দেখতে হবে।

বেআইনি ও অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে কোনো শিশুকে বেচা, কেনা বা হস্তান্তর করলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭২ ও ৩৭৩ ধারায় কঠোর শাস্তির বিধান আছে। ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ দত্তক গ্রহণকে শোষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ফউজুল আজিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন বা দরদাম যদি বাস্তবে শিশুর হস্তান্তরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে টাকা কারা নিচ্ছে, কোনো মধ্যস্থতাকারী বা চক্র আছে কি না এবং শিশুকে ভবিষ্যতে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তদন্তে তা দেখতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদার মতে, সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে, এভাবে কেনাবেচার পর শিশুরা কোথায় যাচ্ছে বা তাদের কী কাজে জড়ানো হচ্ছে, তার কোনো নজরদারি থাকছে না। তিনি বলেন, ‘অনেকে হয়তো এ ধরনের ব্যবসা করার জন্যই সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। বিষয়টিতে সরকারের নজরদারি জরুরি হয়ে পড়েছে।’

শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়

বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ (সিভিল) দত্তক আইন নেই। দেশে পারিবারিক আইনগুলো ধর্মভিত্তিক। মুসলিম পারিবারিক আইনে দত্তকের বিধান নেই।

আইনজীবীরা বলছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ আর খ্রিষ্টানরা ধর্মীয়ভাবে দত্তক নিতে পারেন। ধর্মনির্বিশেষে পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়।

এ ছাড়া ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত শিশুর বিকল্প পরিচর্যার দায়িত্ব হস্তান্তরের সুযোগ আছে। কেবল এ দুটি ক্ষেত্রে নজরদারির বিধান আছে।

সরকারিভাবে শুধু সমাজসেবা অধিদপ্তরের ছয়টি ছোটমণি নিবাসে থাকা শিশুদের আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঢাকার আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের সাবেক উপতত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম বলছেন, নিঃসন্তান দম্পতিরা যেকোনো উপায়ে সন্তান চান। ফলে ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয় হচ্ছে শিশু বেচাকেনার চক্র।

কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন বা সংস্থাও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর আইনি অভিভাবকত্ব হস্তান্তরের কাজ করে। আইনবহির্ভূতভাবে দত্তক দেওয়া প্রতিষ্ঠানও আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদাঅনেকে হয়তো এ ধরনের ব্যবসা করার জন্যই সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। বিষয়টিতে সরকারের নজরদারি জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক ফি নিয়ে ‘দত্তক’

গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলার বারান্দার দেয়ালে বিভিন্ন নোটিশের মধ্যে এই লেখায় চোখ আটকে গেল

গত ১১ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিচতলার বারান্দার দেয়ালে বিভিন্ন নোটিশের মধ্যে একটি লেখায় চোখ আটকে গেল।

‘বাচ্চা দত্তক দিবেন? আমরা নিবো।’ নিচে দুটি ফোন নম্বর ও একটি ঠিকানা। ঠিকানা ধরে ৩০ আগস্ট আমরা চলে যাই যাত্রাবাড়ীতে আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেডের অফিসে।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইট ও ফেসবুক পাতায় আইইউআই, আইভিএফ, সারোগেসিসহ ‘বন্ধ্যাত্ব রোগীর চিকিৎসা’–সেবা সহায়তার কথা আছে। আর ‘শিশুর আইনগত অভিভাবকত্ব’ শিরোনামে আছে নবজাতক বা এতিম শিশু দত্তকের ব্যাপারে সহযোগিতা করার কথা।

৩০ আগস্ট আমরা চলে যাই যাত্রাবাড়ীতে আল-বোখারি কেয়ারগিভিং সার্ভিসেস লিমিটেডের অফিসে

দোতলায় ছোট্ট অফিসঘরে বসে আলাপ শুরু করি বাচ্চা দত্তক নেব বলে। একপর্যায়ে সাংবাদিক পরিচয় দিই এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল আহাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয়। তিনি বলেন, তাঁরা ভারতেও সারোগেসি সেবা দেন।

কোম্পানিটির নিজস্ব প্যাডে বাচ্চা দেওয়া এবং নেওয়ার জন্য আবেদনের ফরম আছে। ‘দত্তক/ আইনগত অভিভাবকত্ব গ্রহণের জন্য আবেদনপত্রে’ আছে, কোম্পানি কনসালটেন্সি সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে।

বাংলাদেশে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো সাধারণ (সিভিল) দত্তক আইন নেই। দেশে পারিবারিক আইনগুলো ধর্মভিত্তিক। মুসলিম পারিবারিক আইনে দত্তকের বিধান নেই। আইনজীবীরা বলছেন, হিন্দু, বৌদ্ধ আর খ্রিষ্টানরা ধর্মীয়ভাবে দত্তক নিতে পারেন।

ফরমে লেখা, বাচ্চা নিতে ইচ্ছুক পক্ষ কোম্পানিকে ৩৫ হাজার টাকা সম্মানী দেবে। আবদুল আহাদ অবশ্য মৌখিকভাবে চেয়েছিলেন ৫০ হাজার টাকা। ব্যবস্থাপনা খরচ হিসেবে এই ফি নিয়ে কোম্পানি দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেয়।

এ ছাড়া বাচ্চাদাতা পরিবারকে চাহিদামতো টাকা দিতে হয়। সিজারিয়ান করে সন্তান প্রসব হলে সেটার খরচও বহন করতে হয়। সব মিলিয়ে খরচ দুই লাখের কাছাকাছি পৌঁছায়।

কোম্পানি একটি বিশদ সম্মতিনামা ও সমঝোতা দলিল সরবরাহ করে। দুই পক্ষ চুক্তি সই করার সময় কোম্পানির পক্ষ থেকে দুজন সাক্ষী হিসেবে সই করেন।

আবদুল আহাদ বলেন, দলিলটি কম্পিউটারের দোকান থেকে অ্যাফিডেভিট করানো হয়। সই-সাবুদের পর বাচ্চা হস্তান্তর করা হয়। তারপর কিন্তু কোম্পানির দায়িত্ব শেষ। আদালতে আইনি অভিভাবকত্বের বিষয়ে তাঁরা কিছু করেন না। তিনি বলেন, স্থানীয় থানায় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ চেয়েছিলেন। পরিষ্কার কোনো দিকনির্দেশ পাননি। এখন নিজেদের মতো করে কাগজপত্র রাখছেন।

আবদুল আহাদের জানামতে, অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান টাকা নিয়ে বাচ্চা দত্তক দেওয়ার কাজ করে। কিছু ভুয়া প্রতিষ্ঠানও আছে। তিনি বলেন, দত্তক দেওয়া-নেওয়ার চাহিদা অনেক বড়।

আবদুল আহাদ নিজের মুঠোফোন থেকে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিলেন, যিনি কয়েক দিন আগে কোম্পানির মাধ্যমে একটি ছেলে বাচ্চা দত্তক নিয়েছেন। ভদ্রলোকটি বললেন, তাঁর খরচ পড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এখন নিজেদের সন্তান পরিচয়ে শিশুটির জন্মনিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজ তৈরি করবেন।

একপর্যায়ে এক নারী ফোন করেন আবদুল আহাদকে। তিনি কল লাউড স্পিকারে দিলে শুনি, নারীটি আসন্নপ্রসবা। আরও একটি সন্তান পালনের সামর্থ্য তাঁর নেই। এক লাখ টাকা এবং অস্ত্রোপচারের খরচ দিলে তিনি গর্ভের ছেলে বাচ্চাটিকে দত্তক দেবেন।

লাগাম পরাতে হবে

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারে নিযুক্ত আছেন। ফেসবুকে শিশু দত্তক দেওয়ার নামে প্রতারণার কথা তিনি জানেন, যদিও এভাবে শিশু বিক্রির সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাননি।

যুগ্ম কমিশনার বললেন, উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, ফেসবুকে এমন কার্যক্রম চালানোটা অপরাধ। তবে তাঁদের সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম দত্তকের নামে গ্রুপ খুলে শিশু বিক্রির তৎপরতার জন্য এখন পর্যন্ত কাউকে আইনের আওতায় আনেনি।

ফেসবুকের পাতায় এবং বাইরে এই বাজার জমে উঠেছে সন্তান দত্তক নেওয়ার চাহিদাকে পুঁজি করে। অন্যদিকে আছে দত্তক দেওয়ার প্রয়োজন, শিশুর জোগান। কিন্তু নেই উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত আইন আর নজরদারির ব্যবস্থা। এই সুযোগে পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে লাগামছাড়া।

আইনবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শাহ্‌নাজ হুদা বলেন, ‘দেশের এতিম ও অসহায় শিশুদের দত্তক বা পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য সর্বজনীন আইন প্রণয়ন করা দরকার। আইনগত কাঠামো থাকলে শিশু বিক্রি বন্ধ করা সহজ হবে। চাই নজরদারি।’

আইন গবেষক সাবেক বিচারক ফউজুল আজিম যোগ করেন, এই মুহূর্ত থেকেই বিষয়টিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার নজরদারি বাড়াতে হবে। সরকারের তত্ত্বাবধানে দত্তকের ব্যাপারে কাঠামো বা ফ্রেমওয়ার্কও তৈরি করতে হবে, যেখানে নজরদারিসহ শিশুর সুরক্ষার সার্বিক বিষয়গুলো থাকবে।

Read full story at source