কিশোর মানে আলো, কিশোর মানে ভালো

· Prothom Alo

কিশোর শব্দটা শুনলেই কী যে সুন্দর একটা ইমেজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ফেসবুকে একটা ছবির ধাঁধা আছে। বলুন তো, জেলাটার নাম কী? একটা কিশোরের ছবি+গঞ্জ। মানে কিশোরগঞ্জ। কিশোরের ছবি কখনো অসুন্দর হয় না।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

আমাদের কালে আমরা স্কুলের বইয়ে গোলাম মোস্তফার ‘কিশোর’ নামের কবিতা পড়তাম, ‘আমরা নূতন, আমরা কুঁড়ি নিখিল বন–নন্দনে,/ ওষ্ঠে রাঙা হাসির রেখা জীবন জাগে স্পন্দনে।’ বিটিভির ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের শুরুতে কবিতাটা গান হিসেবে কতবার যে শুনেছি!

এখন সংবাদপত্রের শিরোনামে কিশোর আছে। দুঃখের বিষয়, কিশোর কথাটার সঙ্গে গ্যাং কথাটাও উচ্চারিত হচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী হতে পারে! এত সুন্দর একটা ইতিবাচক শব্দের সঙ্গে একটা নেতিবাচক শব্দও যোগ করতে হচ্ছে! বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ! সবাই তো আর গ্যাং বানায়নি।

কিশোর–কিশোরী নিয়ে সচেতন হোন

আমরা যাঁরা ঢাকায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে দেশের ভাবনা ভাবি, তাঁদের কাছে জেন–জি মানে আধুনিক সচ্ছল একটা প্রজন্ম। কিন্তু কুড়িগ্রামের চরে যে কিশোর স্কুলে যাচ্ছে, কিংবা গরু চরাচ্ছে, রংপুরে যে কিশোরী মাদ্রাসায় যাচ্ছে, রাঙামাটিতে যে কিশোরেরা পাহাড়–নদী ডিঙিয়ে স্কুলে যাচ্ছে, যে কিশোরেরা গ্লাস ফ্যাক্টরিতে প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে, যারা টেম্পোর পেছনে ঝুলছে, যারা জুতার দোকানে ছাদের স্বল্প পরিসরে ঢোকে জুতা নামানোর জন্য, যারা শিশুবিবাহের শিকার—তারাও কিন্তু জেন–জি বা জেন–আলফার সদস্য।

কথা হচ্ছে, আমরা আমাদের শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ শৈশব-কৈশোর নিশ্চিত করতে পারিনি। আবার তাদের সামনে ভালো মানুষ হওয়ার পথ কিংবা লক্ষ্য দিতেও পারিনি। ভালো মানুষ হওয়াটাকে একটা ‘কুল’ ব্যাপার করে তুলতে পারিনি।

আমরা আমাদের শৈশবের কথা মনে করতে পারি। খেলাঘর ছিল, কচি-কাঁচার মেলা ছিল। আগে-পরে ছিল মুকুল ফৌজ, চাঁদের হাট, শাপলাশালুকের আসর। এরপর শুরু হলো নতুন কুঁড়ি, আর শিশু একাডেমির কার্যক্রম। স্কুলে লাইব্রেরি ছিল, স্যার বই আনতেন ক্লাসে, এক সপ্তাহের জন্য আমরা যেকোনো একটা বই ধার নিয়ে যেতে পারতাম। স্কুলে বিতর্ক হতো, নাটক হতো, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হতো, বার্ষিক মিলাদ হতো, পুরস্কার বিতরণী হতো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, বিজ্ঞান মেলা হতো, দেয়ালপত্রিকা বের করতাম, বার্ষিকীতে লেখা ছাপা হলে খুশির সীমা থাকত না। টেলিভিশনে জনপ্রিয় ছিল বিতর্কের অনুষ্ঠান।

স্মার্ট বাংলাদেশ বনাম কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি

রংপুরে আমাদের পাড়ায় কোনো গাড়ি ছিল না, দোতলা বাড়ি ছিল মাত্র দুইটা। এখন সেই পাড়ায় সব বাড়ি বহুতল, গগনচুম্বী। আমরা সচ্ছল হলাম, কিন্তু শিশু-কিশোরেরা অপরাধমনস্ক দল বানাতে শুরু করেছে। মাদক একটা বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

১৩ বছর আগে আমরা কিশোর আলো প্রকাশ করতে শুরু করি। আমাদের উদ্দেশ্য শিশু-কিশোরদের আলোর সন্ধান দেওয়া। তাদের মনের আকাশটাকে বড় করা। আমাদের শিশু–কিশোরেরা বই পড়ার আনন্দে মেতে উঠুক, ভালো মানুষ হওয়াটাকে জীবনের সার্থকতা হিসেবে গণ্য করুক। সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাক। সে জন্য নিজেদের প্রস্তুত করুক। এই হলো কিশোর আলো প্রকাশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

৩ কোটি ৩০ লাখের জন্য এই আয়োজন খুবই ছোট্ট। কিন্তু তবু তো আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। একটা মোমবাতি জ্বলে উঠলে তা থেকে তো অনেক মোমবাতিতে আলো ছড়ানো যাবে। সেই যে গল্প আছে, এক ভদ্রলোক ভোরবেলা সৈকতে হেঁটে হেঁটে স্টারফিশ বালু থেকে তুলে পানিতে ছাড়ছেন। আরেকজন তাঁকে বলল, কটা স্টারফিশকে পানিতে ছাড়বেন। এখানে তো শত শত স্টারফিশ। ভদ্রলোক বললেন, যাকে পানিতে ছাড়ছি, তার জন্য তো সমস্তটা জীবন। শত শত পারব না। কিন্তু যতটা পারি, ততটাই করব।

কিশোর আলো পত্রিকাটি আজ ১৩ বছর পূর্ণ করল। আজ কিশোর আলোর ১৪তম বছরের শুরু। এ উপলক্ষে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। শিশু-কিশোরেরা কিশোর আলো পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়ুক, আমরা তা–ই চাই। আর আছে অনলাইন। কিশোর আলো ডট কম। সেটাও পড়া যেতে পারে।

কিশোর আলো যারা ১৩ বছর আগে পড়তে শুরু করেছে, এদের অনেকেই এখন কর্মক্ষেত্রে ঢুকে গেছে। কেউ কেউ সন্তানের বাবা-মাও হয়েছে। আমরা দেখি, তারা হয়েছে একটুখানি নম্র-ভদ্র, আবার নীতির প্রশ্নে নিরাপস, দেশপ্রেমিক, এবং একটুখানি স্বপ্নবান। দেশে-বিদেশে তারা ভালো করছে।

একটা উদাহরণ আগেও দিয়েছি। সারণী নামে কিশোর আলোর একজন স্বেচ্ছাসেবক বাবা-মায়ের সঙ্গে কিশোর বয়সেই আমেরিকার নিউইয়র্ক যায়। সেখানে গিয়ে সে পড়াশোনার পাশাপাশি জব শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই তার অফিসে সে নেতৃত্বের জায়গায় চলে যায়। কারণ, সে কথা বলতে পারে, দায়িত্ব নিতে পারে। সবাই বিস্মিত, নতুন আমেরিকায় আসা একজন বাঙালি মেয়ে এতটা তুখোড় হলো কীভাবে? সে জবাব দেয়, ‘কিশোর আলোর কারণে। আমি কিশোর আলো পড়তাম, কিশোর আলোর ভলান্টিয়ার ছিলাম। আমার সোশ্যাল অ্যাংজাইটি তাই নেই।’ আমি বলব, আপনার সন্তানের হাতে কিশোর আলো দিন। বিজ্ঞানচিন্তা দিন।

অপ্রতিম হত্যা, টিকটকের ‘গ্যাং’ এবং আমাদের দায়

আরেকটা উদাহরণ দিই। এম জাহিদ হাসান বড় পদার্থবিজ্ঞানী। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। ছোটবেলায় তিনি বিজ্ঞান সাময়িকী পত্রিকায় লিখতেন। তাঁর বই
আছে, এসো ধূমকেতুর রাজ্যে। অর্থাৎ বিজ্ঞান সাময়িকী পত্রিকার একটা অবদান আছে একজন বড় বিজ্ঞানীর গড়ে ওঠার পেছনে।

কিশোর আলো পত্রিকাটি আজ ১৩ বছর পূর্ণ করল। আজ কিশোর আলোর ১৪তম বছরের শুরু। এ উপলক্ষে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। শিশু-কিশোরেরা কিশোর আলো পত্রিকা হাতে নিয়ে পড়ুক, আমরা তা–ই চাই। আর আছে অনলাইন। কিশোর আলো ডট কম। সেটাও পড়া যেতে পারে। শিশু-কিশোরেরা কিশোর আলোর নানা প্রতিযোগিতা, কুইজ, অনলাইন আয়োজন, অফলাইন আয়োজনে অংশ নিক। ওদের মনের দিগন্ত খুলে যাক। ওরা বড় মনের মানুষ হয়ে উঠুক।

● আনিসুল হক সম্পাদক, কিশোর আলো

Read full story at source