কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৩% শিক্ষার্থী থাকেন হলের বাইরে
· Prothom Alo
বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে।
মাসের শুরুতেই মেসভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের খরচের চিন্তা। ক্যাম্পাস থেকে দূরে থাকার কারণে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। আবার হলে থেকেও স্বস্তি নেই। চারজনের থাকার কক্ষে থাকতে হচ্ছে ৮ থেকে ১০ জনকে। কারও পড়ার টেবিল নেই, কেউ মেঝেতে বিছানা পেতে থাকছেন। একই বিছানা ও পড়ার জায়গা ভাগাভাগি করে দিন কাটছে অনেকের।
Visit newsbetsport.bond for more information.
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসনসংকট এখন শুধু থাকার জায়গার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি খরচ, নিরাপত্তা, ঘুম ও পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশের সংকট। প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পার হলেও অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসিক–সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নিয়মিত শিক্ষার্থী আছেন ৬ হাজার ২১৩ জন। পাঁচটি আবাসিক হলে প্রশাসনিকভাবে আসন আছে ১ হাজার ৪৪৪টি; অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২৩ দশমিক ২৪ শতাংশের জন্য প্রশাসনিকভাবে আসন বরাদ্দ আছে।
তবে আসনসংখ্যার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে পাঁচটি হলে অবস্থান করছেন। পাঁচ হলে মোট ১ হাজার ৬৪৫ জন থাকছেন; অর্থাৎ আসনের চেয়ে বেশি ২০১ জন শিক্ষার্থী হলে থাকছেন। তাঁরা সবাই ছাত্রদের তিনটি হলে থাকছেন। সে হিসাবে মোট শিক্ষার্থীর ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের বাইরে থাকছেন।
মেসে বাড়তি খরচ, নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ হাজার ২১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩ হাজার ২২৪ জন ছাত্র এবং ২ হাজার ৯৮৯ জন ছাত্রী। ছাত্রদের জন্য তিনটি হলে আসন আছে ৭৬৪টি। ছাত্রীদের দুটি হলে আসন ৬৮০টি।
ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। বিশেষ করে কুমিল্লার বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ভাড়া, খাবার ও যাতায়াত বাবদ বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যয় বড় চাপ তৈরি করছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে আরও প্রায় ২৪২ কোটি টাকা প্রয়োজন। অর্থের সংস্থান না হওয়ায় প্রকল্পের শেষ পর্যায়ের কাজ আটকে আছে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের জান্নাতুন দিপা প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় নিরাপত্তা কম অনুভূত হয়। মেসের খরচ তুলনামূলক বেশি। খাবার নিয়েও সমস্যা হয়।’
হলে থেকেও স্বস্তি নেই
আবাসনসংকট শুধু হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হলে থাকার সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও অনেকে স্বাভাবিক পরিবেশ পাচ্ছেন না।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের তিনটি আবাসিক হল ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন কক্ষে গাদাগাদি করে থাকছেন শিক্ষার্থীরা। যে কক্ষে চারজন শিক্ষার্থীর থাকার কথা, সেখানে ৮ থেকে ১০ জন পর্যন্ত থাকছেন। কয়েকটি কক্ষে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় মেঝেতে বিছানা পেতে থাকতে দেখা গেছে শিক্ষার্থীদের। আবার কিছু কক্ষে এমনভাবে আসন পাতা হয়েছে যে হাঁটাচলার জায়গাও নেই।
জান্নাতুন দিপা, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। ক্যাম্পাসের বাইরে থাকায় নিরাপত্তা কম অনুভূত হয়। মেসের খরচ তুলনামূলক বেশি। খাবার নিয়েও সমস্যা হয়।একই কক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী থাকায় অনেকের নিজস্ব পড়ার টেবিল নেই। কয়েকজনকে একই টেবিল ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। বিছানা, পড়ার জায়গা ও চলাচলের জায়গাও ভাগাভাগি করতে হচ্ছে। এতে ঘুম, বিশ্রাম ও পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. হাসিব কাজী নজরুল ইসলাম হলের নিচতলায় থাকেন। তিনি বলেন, প্রায় এক বছর ধরে তাঁদের কক্ষগুলোতে ১০ থেকে ১২ জন করে থাকতে হচ্ছে। এতজন একসঙ্গে থাকায় স্বাচ্ছন্দ্যে থাকা যায় না। নিজস্ব পড়ার টেবিল নেই। এক বিছানায় দুজন থাকায় ঠিকমতো ঘুমও হয় না। এতে পড়াশোনায় প্রভাব পড়ছে।
নতুন ক্যাম্পাসে চারটি আবাসিক হল
দীর্ঘদিনের আবাসনসংকট কাটানোর প্রত্যাশা এখন নতুন ক্যাম্পাস ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় সেখানে চারটি বড় আবাসিক হল নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রতিটি হলে ১ হাজার ৫৬ জন করে মোট ৪ হাজার ২২৪ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে; অর্থাৎ নতুন চারটি হল চালু হলে এতে বর্তমান শিক্ষার্থীদের ৬৮ শতাংশ থাকতে পারবেন।
অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম, উপাচার্য, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে নতুন ক্যাম্পাস হস্তান্তর করতে পারবেন। নতুন ক্যাম্পাসে চারটি হল চালু হলে শিক্ষার্থীদের আবাসনসমস্যা প্রায় সমাধান হয়ে যাবে।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, নতুন ক্যাম্পাস চালু হলে বর্তমান ৫০ একরের সঙ্গে আরও ১৯৪ একর যুক্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আয়তন দাঁড়াবে ২৪৪ একর।
২০১৮ সালের ২৩ অক্টোবর একনেকের সভায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য ১ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
২০২১ সালের ১১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ব্যাটালিয়ন ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হয়। একই বছরের নভেম্বরে ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়। তিন দফা সময় বাড়ানো হলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে আরও প্রায় ২৪২ কোটি টাকা প্রয়োজন। অর্থের সংস্থান না হওয়ায় প্রকল্পের শেষ পর্যায়ের কাজ আটকে আছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অর্থের জোগানের বিষয়টিও এগিয়েছে। এখন একনেকের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে নতুন ক্যাম্পাস হস্তান্তর করতে পারবেন বলে তাঁকে জানিয়েছেন। নতুন ক্যাম্পাসে চারটি হল চালু হলে শিক্ষার্থীদের আবাসনসমস্যা প্রায় সমাধান হয়ে যাবে।