কোনো পার্টিতে সব বন্ধুকে দাওয়াত না দেওয়া কি অভদ্রতা

· Prothom Alo

রাতে ঘুমানোর আগে একবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারা কি তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে? অনেকেই এখন এই অভ্যাসে আসক্ত। রাতে বিছানায় শুয়ে ইনস্টাগ্রাম ঘাঁটছিলেন এক ভদ্রমহিলা। হঠাৎ তাঁর চোখ আটকে গেল একটা ছবিতে। তাঁর ঘনিষ্ঠ সব বান্ধবীরা মিলে কোনো এক রেস্তোরাঁয় ডিনার করছে, হয়তো কারও জন্মদিন উদ্‌যাপন চলছে। ছবিতে সবাই আছে...শুধু তিনি ছাড়া!

Visit umafrika.club for more information.

দৃশ্যটা দেখে ওই পূর্ণবয়স্ক নারী এমনভাবে কেঁদে উঠলেন যে পাশের ঘর থেকে তাঁর পরিবারের সদস্যরা ছুটে এলেন! কাঁদতে কাঁদতেই তিনি পাগলের মতো নিজের মেসেজ, ই–মেইল চেক করতে লাগলেন। হয়তো তিনি ইনভাইটেশনটা মিস করেছেন? মেসেজ কি স্প্যামে চলে গেছে? নাকি এটা হ্যাকারদের কাজ?

উঁহু, কোনো হ্যাকার নেই। আসল সত্যিটা হলো, তাঁকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি!

পরদিন ওই গ্রুপের এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা হলে তিনি একটু ইতস্তত করেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পার্টি কেমন হলো?’ বান্ধবী তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি জানতাম এটা শুনে তোমার খারাপ লাগবে। কিন্তু ভাই, সবার সব জায়গায় ডাক পাওয়ার দরকার নেই। একটু মানিয়ে নিতে শেখো।’

কথাটা তিরের মতো বিঁধল তাঁর বুকে। সেই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝলেন, ওই ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে তাঁকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে!

কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠও তো আছে। ধরো, তুমি একটা প্ল্যান করলে। এখন তোমার যত পরিচিত বন্ধু আছে, সবাইকে যদি ডাকতে হয়, তবে তো রীতিমতো একটা কনভেনশন সেন্টার ভাড়া করতে হবে, ক্যাটারিং সার্ভিস ডাকতে হবে! তাই মাঝেমধ্যে তোমাকে হয়তো বেছে নিতে হবে, কাকে ডাকবে আর কাকে বাদ দেবে। আর বিশ্বাস করো, অতিথি তালিকা থেকে বাদ পড়ার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হলো সেই তালিকা বানানোর সময় ভাবা, ‘হায় খোদা, কাকে বাদ দিই!’

ওই যে রূঢ় বান্ধবীটি বলেছিল, ‘সবার সব জায়গায় ডাক পাওয়ার দরকার নেই’—কথাটা কি খুব ভুল? মোটেও না। সব জায়গায় সবার ডাক পড়বে না, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আসল ঝামেলাটা বাধে এর ভেতরের সূক্ষ্ম বিষয়গুলোতে।

তাহলে কি বন্ধুদের রাতের আড্ডায় পুরো গ্রুপকে না ডাকাটা আসলেই অভদ্রতা? কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাবে? তোমার নিজের অনুভূতিতে যখন আঘাত লাগে, তখন কী করবে? চলো, একটু হিসাব মেলানো যাক।

আখতার হুসেন: আমাদের ছড়া-দাদু

কাউকে বাদ দেওয়ার পক্ষে যুক্তি

সবকিছুর মূলে রয়েছে বাস্তবতা। সব জায়গায় তো আর বিশাল বাহিনী নিয়ে যাওয়া যায় না। রেস্তোরাঁয় টেবিলের একটা নির্দিষ্ট সাইজ আছে, কনসার্টে টিকিটের লিমিট আছে। আবার তোমার বসার ঘরে যদি একটা বড়সড় খাবারের প্লেট রাখা হয়, তবে তিন স্কয়ার ফুটের বেশি জায়গাই হয়তো আর অবশিষ্ট থাকে না!

ডানবারস সোশ্যাল থিওরি অনুযায়ী, একজন মানুষ তার জীবনে মোটামুটি ১৫০টি অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। এই সম্পর্কগুলো কয়েকটা বৃত্তের মতো কাজ করে।

·ভেতরের বৃত্ত: এখানে থাকে ৫ জনের মতো বন্ধু। এদের তুমি রাত ২টায় বিপদে পড়লেও ডাকতে পারবে।

· মাঝের বৃত্ত: এখানে থাকে ১৫ জনের মতো বন্ধু, যাদের সঙ্গে তোমার নিয়মিত দেখা হয়।

· পরের বৃত্ত: এখানে থাকে প্রায় ৫০ জন, যারা মূলত তোমার পার্টি বা আড্ডার সঙ্গী।

· সবচেয়ে বড় বৃত্ত: এখানে থাকে সেই ১৫০ জন মানুষ, যাদের সঙ্গে তোমার মোটামুটি ভালো সম্পর্ক আছে।

সুতরাং, বন্ধুদের মধ্যেও এমন ছোট ছোট গ্রুপ থাকাটা কোনো বিশ্বাসঘাতকতা নয়, বরং এটাই বন্ধুত্বের স্বাভাবিক নিয়ম। তুমি তো আর সব সময় বিশাল দলবল নিয়ে ঘুরতে চাইবে না। হয়তো কখনো তুমি শুধু তোমার তিন জন বেস্ট ফ্রেন্ডকে নিয়ে বসে এটা আলোচনা করতে চাও যে তুমি একটা ল্যাপটপ কী দেখে কিনবে, কত টাকা খরচ করবে। এর জন্য তো আর ২০ জন বন্ধুকে ডেকে আলোচনায় বসা যায় না!

হয়তো কোনো একটা অ্যাকটিভিটি গ্রুপের সবার পছন্দ নয়, হয়তো গ্রুপের দুজনের মধ্যে আদায় কাঁচকলায় সম্পর্ক আর তুমি সারা রাত তাদের ঝগড়া মেটাতে চাও না; অথবা হয়তো কোনো বন্ধুর সঙ্গে তোমার বহুদিন দেখা হয়নি বলে একটু আলাদা সময় কাটাতে চাও। এসব কারণেই গ্রুপ ছোট করাটা খুব স্বাভাবিক।

হাত ধোয়ার সঠিক নিয়ম

সবাইকে ডাকার পক্ষে যুক্তি

আসল সমস্যা হলো, তুমি যাকে খুব যৌক্তিক কারণে বাদ দিলে, তার কাছে বিষয়টা সামাজিক একঘরে হওয়ার মতো মনে হতে পারে। হয়তো সেই বন্ধুটি ভাবত সে তোমার ইনার সার্কেলের অংশ, কিন্তু রাতে বিছানায় শুয়ে ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করতে গিয়ে সে আবিষ্কার করল আসলে তা নয়!

কতজনকে বাদ দিচ্ছ: ১০ জনের গ্রুপের মধ্যে তুমি যদি ৯ জনকে ডাকো, আর ১ জনকে বাদ দাও; তাহলে এটা কোনো প্রাইভেট আড্ডার আয়োজন না, এটা ওই ১ জনের সঙ্গে বেইমানি করা!

গবেষণা বলে, সামাজিকভাবে বাদ পড়া বা এক্সক্লুড হওয়াটা মানুষের মনে খুব বাজে প্রভাব ফেলে। ইউনিভার্সিটি অব বাসেল এবং পারডু ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, দৈনন্দিন জীবনে এভাবে বাদ পড়াটা মানুষের নিরাপত্তা ও আপন হওয়ার অনুভূতিকে দারুণভাবে নাড়িয়ে দেয়। আরও নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইনস্টাগ্রামের কোনো পোস্টে ট্যাগ না করাটাও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। আর ছবি থেকে বাদ পড়াটা তো আরও ভয়ংকর!

তাই তোমার বন্ধুরা যখন এক প্লেট ফুচকা খাচ্ছে আর তুমি সেখানে নেই, তখন তোমার মস্তিষ্ক এমনভাবে রিঅ্যাক্ট করতে পারে যেন পুরো মানবসভ্যতাই তোমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে! কখনো কখনো এটা হয়তো অনিচ্ছাকৃত, কিন্তু কখনো কখনো ইনভাইটেশন হলো একটা গ্রুপের ভেতরে নিজের ক্ষমতা দেখানোর হাতিয়ার।

তার মানে এই নয় যে তোমাকে সবাইকে সব জায়গায় ডাকতেই হবে। কিন্তু কাউকে বাদ দিলে তার যে একটা নেতিবাচক প্রভাব ওই বন্ধুত্বের ওপর পড়তে পারে, সেটা তোমাকে মাথায় রাখতে হবে।

দুপুরের ভাত খাবার সময়গবেষণা বলে, সামাজিকভাবে বাদ পড়া বা এক্সক্লুড হওয়াটা মানুষের মনে খুব বাজে প্রভাব ফেলে।

তুমি তাহলে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে

শিষ্টাচারের দুনিয়ায় এত কনফিউশন আর কোনো কিছুতে নেই। কাউকে বাদ দেওয়ার আগে এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করতে পারো:

কতজনকে বাদ দিচ্ছ: ১০ জনের গ্রুপের মধ্যে তুমি যদি ৯ জনকে ডাকো, আর ১ জনকে বাদ দাও; তাহলে এটা কোনো প্রাইভেট আড্ডার আয়োজন না, এটা ওই ১ জনের সঙ্গে বেইমানি করা!

  • এমনটা কি প্রায়ই ঘটে: যদি একবার এমন হয়, তবে সমস্যা নেই। কিন্তু বার্থডে পার্টি, ফুচকা খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া—সব জায়গা থেকেই যদি একজন নির্দিষ্ট বন্ধু রহস্যজনকভাবে বাদ পড়তে থাকে, তবে তোমাকে ভাবতে হবে, সে আসলেই তোমার বন্ধু কি না!

  • আসল গ্রুপটা কত বড়: ১৫ জনের একটা আড্ডায় নতুন ১ জন যোগ হলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে? কিন্তু যদি তোমরা মাত্র ৪ জন ডিনারে যাওয়ার প্ল্যান করো, তবে সেখানে ১ জন নতুন মানুষ অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে।

  • প্ল্যানটা হলো কীভাবে: ‘আমরা দুজন দেখা করছিলাম, পরে আরও দুজন যোগ দিল’-এটা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু ‘আমি ২০ জনের একটা তালিকা করে সেখান থেকে আমার সবচেয়ে পছন্দের ৫ জনকে বেছে নিলাম’—এটা কিন্তু স্বাভাবিক নয়! এটা অনেকটা রিয়েলিটি শোয়ের মতো হয়ে গেল।

  • কীভাবে তারা জানবে: আদর্শ পৃথিবীতে হয়তো তারা জানতেই পারত না। কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে তারা ঠিকই জেনে যাবে। আর সেই খবরটা যদি তারা ইনস্টাগ্রাম স্টোরি বা ফেসবুকের ট্যাগ করা ছবি থেকে জানতে পারে, তবে সেটা খুব কষ্টদায়ক হয়।

জীবনরক্ষায় স্মার্টফোনের যে ফিচারগুলো চালু রাখতে হবে

অনুভূতিতে আঘাত লাগলে কী করবে

ওই যে শুরুতে বলেছিলাম, ‘একটু মানিয়ে নিতে শেখো’; কথাটা রূঢ় হলেও কিন্তু সত্যি। অনেক সময় মানুষ ভাবে, বিষয়টা লুকিয়ে রাখলেই বোধ হয় ভালো। কিন্তু যখন কেউ জানতে পারে যে তার ৮ জন বন্ধু তাকে ছাড়াই আড্ডা দিচ্ছে, তখন তার মন এমনিতেই ভেঙে যায়। তখন আর লুকোচুরি করে লাভ নেই।

তোমাকে যে ডিনার করার জন্য সরি বলতে হবে, তা নয়। তুমি শুধু তার খারাপ লাগাটাকে স্বীকার করে নাও। তুমি বলতে পারো, ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার কেন খারাপ লেগেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তোমার প্রতি আমার কোনো রাগ আছে।’

খেয়াল করো, তুমি কিন্তু বলছেন না, ‘তোমাকে ছাড়া ডিনারে যাওয়ার জন্য আমি দুঃখিত।’ তোমার অন্য বন্ধু থাকতে পারে, তুমি ৩০ জনের দল না বানিয়েও ৩ জনের সঙ্গে আড্ডা দিতে পারো। কিন্তু তুমি যেটা করতে পারবে না তা হলো, কেউ বাদ পড়ে কষ্ট পেলে তুমি বোকার মতো অবাক হওয়ার ভান করতে পারবে না! মানুষের অনুভূতি সব সময় লজিক দিয়ে চলে না, আর সেটাকে তুমি চাইলেও ইগনোর করতে পারবে না।

জুলফি-কাহিনি

তাহলে সমাধান কী

অপ্রীতিকর হলেও সত্যি, কাউকে ইনভাইটেশন লিস্ট থেকে বাদ দেওয়াটা রূঢ় হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে! এটাই হলো শিষ্টাচারের সবচেয়ে বিরক্তিকর দিক।

তুমি সবাইকে সব জায়গায় ডাকতে পারবে না, আর তোমার সেটা করা উচিতও নয়। বন্ধুত্বের সার্কেল থাকবেই। মাঝেমধ্যে তুমি ৩০ জনের গ্যাঞ্জাম বাদ দিয়ে ৩ জনের সঙ্গে একটা শান্ত ডিনার করতেই পারো।

কিন্তু তোমার গ্রুপটা যদি খুব সুনির্দিষ্ট হয়, তুমি যদি বারবার একজনকেই বাদ দিতে থাকো আর তোমাদের আড্ডাটা খুব পাবলিক জায়গায় হয়, তবে ইনভাইটেশন লিস্ট বানানোর আগে একটু সাবধানে চিন্তা করাই ভালো। হ্যাঁ, সবচেয়ে ভালো হয় যদি ওই আড্ডার ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট না করো!

সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট

ডাইনোসর যেভাবে পৃথিবী জয় করেছিল

Read full story at source