বিদায়, ভালোমানুষ–আলোমানুষ আখতার হুসেন
· Prothom Alo
আখতার হুসেন আর ফিরে এলেন না।
Visit rouesnews.click for more information.
তিন দিন আগে হাসপাতাল থেকে ফিরে লিখেছিলাম, ‘ফিরে আসুন কবি আখতার হুসেন।’ ডাক্তাররা তখনো আশাবাদী ছিলেন। আমিও আশা করেছিলাম। আজ বৃহস্পতিবার বেলা একটার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি চলে গেলেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। আগে থেকেই ক্যানসার, হৃদ্রোগ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। শরীর আর লড়াই করতে পারল না।
আখতার হুসেন আমার প্রিয় মানুষ ছিলেন। শুভ্রতার প্রতীক, সরলতার উদাহরণ। বাংলাদেশের অন্যতম সেরা কিশোর সাহিত্যিক, ছড়াকার। তিনি আমার লেখকজীবনের গুরু। আমরা একই বছরে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলাম। সেই পুরস্কারের দিনগুলোতে তাঁর হাসি আর নম্রতা আজও মনে আছে। তিনি নিজেকে কখনো বড় করে দেখাননি।
বহু অসহায় পরিবারকে সহায়তা করতেন। চুপিচুপি। কাউকে জানাতেন না। কোনো মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলতেন না। মানুষের কষ্টের খবর পেলে তিনি চলে যেতেন। এই কাজটা তাঁর সাহিত্যের মতোই ছিল। সরল, নিঃশব্দ, আর প্রয়োজনে পাশে থাকা।
আষাঢ়ে গল্পের গল্পপ্রতীকী এই ছবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মডেল হয়েছেন শিশু সাহিত্যিক আখতার হুসেনতাঁর লেখা ছড়া স্কুলের পাঠ্য। শিশুরা এখনো মুখস্থ করে।
হ্যাঁরে, খবরটা কি উড়ো?
শুনতে পেলাম নিখিলপুরের চার–চারটে বুড়ো
কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো,
আরে, কী বললি দূরো!
কিশোর আলোতে আমরা তাঁর ছড়া নিয়মিত ছাপিয়েছি। একটা ছড়ার শুরু এমন—
মা-ও বলেন, বাবা-ও বলেন
অভিযোগের সুরে
আমি নাকি আলসে এবং কুঁড়ে
কাজ করি না মোটে
মিনু যেমন করে
সারাটা দিন ধরে।
শিশুদের অভিযোগ আর আত্মপক্ষ সমর্থন তিনি এমন সহজে ধরতেন যে পড়তে পড়তে হাসি আসে, তারপর একটু চুপ হয়ে যেতে হয়। ছাত্র ইউনিয়ন ও খেলাঘরের সংগঠন সংগীতও তাঁর লেখা, ‘আমরা তো সৈনিক, শান্তির সৈনিক’। মুক্তিযুদ্ধের দিনে লিখেছিলেন, ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে আজ জাগছে বাঙালিরা/ আর রুখবে তাদের কারা’।
রাজউক থেকে গুগলেবাঁ থেকে, সঞ্চালক আনিসুল হক, ছড়াকার আখতার হুসেন, বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার, নির্মাতা রেদওয়ান রনি, লেখক শিবব্রত বর্মন, কথাসাহিত্যিক তানজিনা হোসেন, ও ছড়াকার রমজান মাহমুদ। কিআ কার্নিভ্যালে।ক্লাস সিক্স-সেভেনে দুটো বই হাতে পেয়েছিলাম। একটি সত্যেন সেনের ‘পাতাবাহার’, আরেকটি আখতার হুসেনের ‘সমুদ্র অনেক বড়’। অলংকরণ করেছিলেন রফিকুন নবী। সেই বইয়ের কোকিলের গল্পটি আজও ভুলিনি। গ্রাম থেকে উড়ে ঢাকায় এসে চাকরি নেয় কোকিল। একদিন রমনা পার্কে গান গাইতে চায়। গলা দিয়ে রক্ত বেরোয়। গান হয় না। ছোটবেলায় সেই গল্প পড়ে বুঝতে পারিনি। বড় হয়ে বুঝেছি শিল্পীর গলা কত সহজে রক্তাক্ত হয়ে যায় এই শহরে।
তিনি জন্মেছিলেন ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর নাটোরের লালপুরের নুরুল্লাপুরে। বাবা টি আই এম সিকান্দার রেলওয়ের চাকরি করতেন। খুলনা, গফরগাঁও, কুলাউড়া—দেশের নানা প্রান্তে কেটেছে শৈশব। মা আয়শা খাতুনের স্নেহে বেড়ে ওঠা সেই ঘুরে বেড়ানো দিনগুলোই পরে তাঁর শিশুসাহিত্যের মূল সূত্র হয়ে ওঠে। তিনি উদীচীর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, প্রথম দিককার নাটকের রচয়িতা ও নির্দেশক। খেলাঘরের প্রথম সারির সংগঠক। সাংবাদিকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। শিশু-বিশ্বকোষে সর্বোচ্চসংখ্যক ভুক্তি লিখেছেন। ছড়া, গল্প, নাটক মিলিয়ে প্রায় ৮০টি বই।
ভূতেরা সব কোথায় থাকেশেষবার হাসপাতালের আইসিইউতে গিয়েছিলাম। ডাক্তার ডাকলেন, ‘আখতার হুসেন বাবা।’ তিনি চোখ মেলে তাকালেন। সেই দৃষ্টি আজও মনে আছে। কয়েক দিন আগে আমীরুল ইসলামের মৃত্যুর খবর তিনিই আমাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। তারপর নিজেই অচেতন হয়ে পড়লেন।
আখতার হুসেন চলে গেলেন, কিন্তু কোকিলের গান থেমে যায়নি। নিখিলপুরের বুড়োরা এখনো উড়ো খবর নিয়ে হাসে। মিনু এখনো সারা দিন কাজ করে। সমুদ্র এখনো অনেক বড়। যাঁদের তিনি চুপিচুপি সাহায্য করেছিলেন, তাঁরা হয়তো আজ নীরবে কাঁদবেন। আমাদের কাজ সেই সরলতা ও শুভ্রতাকে বাঁচিয়ে রাখা।
তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। পরিবার, বিশেষ করে ছেলে প্রমিত হুসেন ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা।
দুষ্টু ভীষণ, কাজের তবু