কনটেন্ট মানে শুধু ভিডিও নয়

· Prothom Alo

একটি ভিডিও শুরু হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দর্শক থেমে গেলেন। দেখলেন, শুনলেন, হয়তো কিছু শিখলেন। তারপর ভিডিওটি বন্ধ করে দিলেন; কিন্তু যদি সেই ভিডিওর কোনো কথা তাঁর মনে থেকে যায়? যদি তিনি সেটি বন্ধুকে পাঠান? কিংবা পরে আবার দেখার জন্য সেভ করে রাখেন? আরও এক ধাপ এগিয়ে, যদি ভিডিওটি দেখার পর কোনো একটি সিদ্ধান্ত নিতে আগ্রহী হন?

তাহলে সেটি কেবল একটি ভিডিও থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে কনটেন্ট। কনটেন্ট তৈরির বিষয়টি এভাবেই দেখতে চান ‘বাপকা বেটা’র প্রতিষ্ঠাতা শুভাশিস ভৌমিক। তাঁর কাছে কনটেন্ট মানে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা কিংবা নিয়ম করে ভিডিও প্রকাশ করা নয়। একটি ভাবনা, অভিজ্ঞতা, তথ্য, গল্প কিংবা অনুভূতিকে এমনভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা, যাতে তা দর্শকের মনোযোগে পৌঁছায় এবং কোনো না কোনো প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

Visit moryak.biz for more information.

সেই প্রতিক্রিয়া কখনো হাসি, কখনো নতুন কিছু শেখা, কখনো অনুপ্রেরণা। আবার কখনো কোনো পণ্য কেনা, কোনো বিষয়ে মতামত দেওয়া কিংবা অন্যের সঙ্গে একটি ভিডিও ভাগ করে নেওয়া।
অর্থাৎ কনটেন্টের পথটা শুধু ‘দেখা’ পর্যন্ত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মনোযোগ, বিশ্বাস, প্রভাব এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা।

শুরুটা ক্যামেরা দিয়ে নয়, সমস্যা দিয়ে
অনেকেই কনটেন্ট বানাতে গিয়ে প্রথমে ভাবেন—কীভাবে শুট করবেন, কোন ক্যামেরা ব্যবহার করবেন, কোথায় দাঁড়াবেন কিংবা ভিডিওটি কত সুন্দর দেখাবে; কিন্তু শুভাশিসের ভাবনাটা একটু অন্য রকম। তাঁর মতে, কনটেন্ট তৈরির শুরুতেই ক্যামেরার কথা না ভেবে সমস্যাটিকে চিহ্নিত করা জরুরি। মানুষের কোন সমস্যাটি নিয়ে কথা বলা হবে? দর্শক নিজে কোন বিষয়টিকে সমস্যা হিসেবে দেখছেন? সেই জায়গা থেকেই তৈরি হবে কনসেপ্ট।

এরপর সেই সমস্যাকে সহজ করে বলার জন্য দরকার স্ক্রিপ্ট। তথ্যকে শুধু তথ্য হিসেবে না বলে গল্পের মতো করে বলা যায় কি না, সেটিও ভাবতে হবে। সবশেষে আসে এক্সিকিউশন; কোথায় শুট হবে, কীভাবে কথা বলা হবে, পোশাক কেমন হবে, ক্যামেরার সামনে অবস্থান কী হবে, দৃশ্যের পরিবর্তন কোথায় থাকবে—সবকিছুই তখন কনটেন্টের অংশ হয়ে যায়।

মানুষের জীবনেই লুকিয়ে থাকে অসংখ্য আইডিয়া
কনটেন্টের আইডিয়া খুঁজতে খুব দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ভুল, অভিজ্ঞতা ও সমস্যার মধ্যেই রয়েছে অসংখ্য গল্প। কোনো সমস্যার সহজ সমাধান দেখানো যায়। মানুষ প্রায়ই যে ভুল করে, সেটি নিয়ে কথা বলা যায়। পাশাপাশি দুটি বিষয় তুলনা করে পার্থক্য বোঝানো যায়। প্রচলিত কোনো ভুল ধারণাকে প্রশ্ন করা যায়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা কিংবা কাজের নেপথ্যের গল্পও হয়ে উঠতে পারে কনটেন্ট।

চারটি প্রশ্নেই পরিষ্কার হতে পারে পথ
একজন কনটেন্ট নির্মাতা আসলে কী নিয়ে কথা বলবেন—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চারটি বিষয় সামনে রাখা যেতে পারে।
দর্শক কী জানতে চান?
নির্মাতা কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জানেন?
কোন বিষয়ের প্রতি মানুষের চাহিদা রয়েছে?
আর সবশেষে, কনটেন্ট তৈরি করে তিনি কী অর্জন করতে চান?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকেই তৈরি হতে পারে কনটেন্টের নিজস্ব ‘পিলার’। শেখানো, অনুপ্রাণিত করা, বিনোদন দেওয়া এবং নিজের পণ্য বা সেবার সঙ্গে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া—এই চার ধরনের কনটেন্টকে সেই কাঠামোর মধ্যে রাখা যায়।

‘আমাকে কারা দেখছে’ এই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি
একজন নির্মাতা যত ভালো কনটেন্ট তৈরি করুন, তিনি যদি না জানেন কার জন্য সেটি তৈরি করছেন, তাহলে তাঁর কনটেন্টের দিক নির্ধারণ কঠিন হয়ে যায়।
দর্শকদের বয়স কত? তাঁরা কোথা থেকে দেখছেন? কোন ধরনের ভিডিওতে বেশি সময় দিচ্ছেন? কী কারণে একটি ভিডিও দেখছেন? কোন ধরনের বিষয় তাঁদের আগ্রহী করছে?

শুভাশিস ভৌমিকের নিজের অভিজ্ঞতাতেও রয়েছে একটি ভিন্ন চিত্র। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণত ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী দর্শকের উপস্থিতি বেশি দেখা গেলেও তাঁর কনটেন্টের প্রায় ৭৫ শতাংশ দর্শক ২৫ বছরের বেশি বয়সী। অর্থাৎ নিজের অডিয়েন্স সম্পর্কে ধারণা অনেক সময় প্রচলিত ধারণার সঙ্গে না–ও মিলতে পারে।

তাই অনুমান নয়, নিজের কনটেন্টের তথ্যই হওয়া উচিত পরবর্তী সিদ্ধান্তের ভিত্তি।

যে কনটেন্ট মানুষ পরে আবার খুঁজে দেখে
একটি কনটেন্টের সাফল্য শুধু কতজন দেখলেন, তাতে আটকে নেই। কখনো কখনো মানুষ কোনো ভিডিও পরে আবার দেখার জন্য রেখে দেন। এই ‘সেভ’ করাটাও গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কেন মানুষ একটি কনটেন্ট সংরক্ষণ করবে?
কারণ, সেখানে হয়তো এমন কোনো তথ্য আছে, যা পরে কাজে লাগবে। কোনো সমস্যার সমাধান আছে। আছে একটি চেকলিস্ট, ধাপে ধাপে নির্দেশনা কিংবা ভবিষ্যতে ফিরে দেখার মতো কোনো রেফারেন্স।

তাই কনটেন্ট প্রকাশের আগে একটি সহজ প্রশ্ন করা যায়—‘দর্শক কেন এটি সেভ করে রাখবেন?’ প্রশ্নটির উত্তর যত পরিষ্কার, কনটেন্টের ব্যবহারিক মূল্যও তত স্পষ্ট।

দর্শক অভিনয় নয়, মানুষটাকেই দেখতে চান
উপস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হলো ব্যক্তিত্ব। ক্যামেরার সামনে এমন একজন হওয়ার চেষ্টা করলেন, যিনি আসলে আপনি নন, দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করা কঠিন।
নিজের শক্তির জায়গা খুঁজে বের করাটাও তাই কনটেন্ট তৈরির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শুভাশিস ভৌমিক তাঁর নিজের ও ছেলের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে এই জায়গাই তুলে ধরেছেন। তাঁদের যাত্রা শুরু হয়েছিল গান দিয়ে। পরে তাঁরা বুঝতে চেষ্টা করেন, গান হয়তো তাঁদের আসল শক্তি নয়। ছেলের শক্তি লেখায়—সে ছোটবেলা থেকেই গল্প লিখত। অন্যদিকে সহজভাবে গল্প বলতে পারার জায়গাটিকে নিজের শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন শুভাশিস।

অর্থাৎ সবাইকে একই ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। নিজের যে জায়গাটিতে স্বাভাবিক থাকা যায়, সেটিই হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গা।

শুধু খবর পড়া নয়, যোগাযোগের শিল্পও নিউজ প্রেজেন্টেশন

একই গল্প, বদলে যেতে পারে বলার ধরন
একটি বিষয়কে কীভাবে বলা হচ্ছে, সেটি অনেক সময় বিষয়টির মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
একই ঘটনা তথ্য হিসেবে বলা যায়। আবার সেটিকে নিজের অভিজ্ঞতার গল্পে পরিণত করা যায়। সমস্যা–সমাধানের কাঠামোয় বলা যায়। কিংবা বিনোদনের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা যায়।

এখানেই আসে ‘অ্যাঙ্গেল’। কনটেন্ট নির্মাতা শুধু ‘কী নিয়ে বলব’ সেটি ভাববেন না; তাঁকে ভাবতে হবে ‘কীভাবে বললে বিষয়টি সবচেয়ে ভালোভাবে পৌঁছাবে’।
দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখতে প্রথম কয়েক সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। ভিডিওতে প্রয়োজন অনুযায়ী গতি, কাট, শট পরিবর্তন, ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল কিংবা শরীরী অভিব্যক্তি ব্যবহার করা যায়। কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিও কনটেন্টে নতুন মূল্য যোগ করতে পারে।

ব্র্যান্ডের কথাও বলতে হবে, কিন্তু বিশ্বাস হারিয়ে নয়
কনটেন্ট নির্মাতার সামনে একসময় ব্র্যান্ড ও বিজ্ঞাপনের সুযোগ আসতে পারে। তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—দর্শকের বিশ্বাস অক্ষুণ্ন রাখা।

শুভাশিস ভৌমিকের একটি উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক। একটি পণ্য নিয়ে তৈরি ভিডিওতে তিনি শুরুতেই ব্র্যান্ডের নাম সামনে আনেননি। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন, নিজের পরিবর্তনের কথা বলেছেন, আন্তর্জাতিক রেফারেন্স ও চিকিৎসকের পরামর্শের প্রসঙ্গও জানিয়েছেন। দর্শককে সরাসরি পণ্যটি কিনতে বলেননি; বরং যাচাই করে দেখার সুযোগ রেখেছেন।

এই জায়গায় বিজ্ঞাপন আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়। কারণ, মানুষ শুধু পণ্য সম্পর্কে শুনতে চায় না; তারা জানতে চায়, কেন আপনার কথা বিশ্বাস করবে।

ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম—একই দর্শক নয়
কনটেন্ট তৈরি হয়ে গেলে আরেকটি প্রশ্ন আসে—কোথায় প্রকাশ করা হবে?
ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম বা অন্য প্ল্যাটফর্ম—প্রতিটির নিজস্ব দর্শক, ব্যবহারপদ্ধতি ও কনটেন্ট সংস্কৃতি রয়েছে। তাই একটি ভিডিও সব জায়গায় হুবহু ব্যবহার করলেই যে একই ফল পাওয়া যাবে, এমন নয়।

ট্রাভেল কনটেন্টের দীর্ঘ ভিডিওর জন্য ইউটিউব কার্যকর হতে পারে। আবার সমস্যা সমাধান, ব্যবসা, জটিল বিষয় সহজ করে বলা কিংবা ইনফোটেইনমেন্ট ধরনের কনটেন্টের জন্য অন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম বেশি উপযোগী হতে পারে।

শুভাশিস ভৌমিক নিজের কনটেন্টের ক্ষেত্রে ফেসবুককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সেখানে নিয়মিত থাকার চেষ্টা করেছেন এবং মাসে সাত–আটটি কনটেন্ট প্রকাশের একটি ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন।
একটি কনটেন্ট প্রকাশের পর কিছুটা ‘ব্রিদিং স্পেস’ দেওয়ার কথাও তিনি মনে করেন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দর্শকের কাছে পৌঁছানোর পর সেটি বোঝা, গ্রহণ করা এবং প্রতিক্রিয়া জানানোরও সময় প্রয়োজন।

পোস্ট করার পরেই আসল পরীক্ষা
কনটেন্ট প্রকাশ করেই কাজ শেষ নয়; এরপর শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—বিশ্লেষণ।
দর্শক প্রথম তিন সেকেন্ডে কতটা থাকছেন? এক মিনিট পর্যন্ত কতজন দেখছেন? মোট ওয়াচটাইম কেমন? রিলসের তুলনায় স্টোরি বা ছবিতে মানুষের আগ্রহ কেমন? থাম্বনেইল থাকলে আর না থাকলে পারফরম্যান্সে পার্থক্য হচ্ছে কি না?
এসব তথ্য পরবর্তী কনটেন্ট তৈরির জন্য নির্দেশনা দিতে পারে।

কোন সময়ে দর্শক সবচেয়ে বেশি সক্রিয়—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সময়কে পিক টাইম হিসেবে ধরা যেতে পারে। তবে শেষ সিদ্ধান্তটি নিজের অডিয়েন্সের ডেটা দেখে নেওয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ, অন্যের দর্শক আর আপনার দর্শক এক নয়।

হয়তো আগামী দিনের সবচেয়ে বড় কনটেন্ট তৈরি হবে একটি দামি স্টুডিওতে নয়; বরং কোনো সাধারণ মানুষের জীবনের অসাধারণ একটি গল্প থেকে। দরকার শুধু সেই গল্প দেখার চোখ এবং বলার মতো নিজস্ব ভাষা।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা

Read full story at source