‘বন্ধুর লাশ নিয়ে হাসপাতালে আছি, সে আর ফোন ধরবে না’

· Prothom Alo

‘বন্ধু তুই কই, এখন আর বাড়ি গিয়ে কী করব, তুই তো চলে গেলি’—হাসপাতালে শয্যায় রাখা এক তরুণের লাশের পাশে কথাগুলো বলতে বলতে আহাজারি করছিলেন সাইফুল ইসলাম। গতকাল সোমবার বিকেলে এই চিত্র দেখা যায় রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। শয্যায় রাখা লাশটি সাজিদ শাহরিয়ারের (২৪)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। গতকাল কর্ণফুলী নদীতে ডুবে মৃত্যু হয় তাঁর।

Visit esporist.org for more information.

সাইফুল ইসলাম সাজিদ শাহরিয়ারের সহপাঠী। দুজনের বাড়ি নরসিংদী জেলায়। একসঙ্গে বেড়ে উঠেছেন তাঁরা। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন একই বিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর সাজিদ চট্টগ্রামে চলে এলেও দুজনের বন্ধুতে ভাটা পড়েনি। একসঙ্গে বেড়াতে যেতে ভালোবাসতেন তাঁরা।

মো. জহিরুল ইসলাম, স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।আমাদের বিভাগে সবার সঙ্গেই ওর ভালো সম্পর্ক ছিল। খুবই ভদ্র ছিল সাজিদ। ও এভাবে চলে যাবে, সেটা কখনো ভাবিনি।

গতকাল সকাল ১০টার দিকে সাজিদ, সাইফুলসহ ৯ জন বেড়াতে যান রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায়। তাঁরা সবাই একই বিদ্যালয়ে, একই শ্রেণিতে পড়েছেন। কাপ্তাইয়ে গিয়ে সীতা পাহাড়ে ট্র্যাকিং করেন তাঁরা। পরে নেমে আসেন কর্ণফুলী নদীর পাড়ে। নদীতে হাত-পা ধোয়ার সময় হঠাৎ পা পিছলে নদীতে পড়ে যান সাজিদ। মুহূর্তেই স্রোতের সঙ্গে ভেসে যান তিনি। বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকারও করেন। তবে বন্ধুদের কেউ সাঁতার জানতেন না। ফলে উদ্ধারে এগিয়ে যেতে পারেননি কেউ। বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা কর্ণফুলী নদী থেকে সাজিদকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী মো. জহিরুল ইসলামের বাড়িও নরসিংদীতে। একই এলাকার হওয়ায় সাজিদকে স্নেহ করতেন তিনি। জহিরুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সর্বশেষ সাজিদের সঙ্গে যখন তাঁর কথা হয়, তখন সে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চেয়েছিল। দেশের বাইরে চলে যাব, নাকি দেখে থাকব—এসব কথা। ওর ইচ্ছা ছিল, মাস্টার্স শেষ করে দেশেই থাকবে। পরিবারের পাশে থাকার ইচ্ছা ছিল তার।’ জহিরুল আরও বলেন, ‘আমাদের বিভাগে সবার সঙ্গেই ওর ভালো সম্পর্ক ছিল। খুবই ভদ্র ছিল সাজিদ। ও এভাবে চলে যাবে, সেটা কখনো ভাবিনি।’

বেড়াতেও ভালোবাসতেন সাজিদ। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। বিশেষ করে পাহাড়ে ট্র্যাকিং তাঁর খুবই পছন্দের ছিল। তবে সাজিদের কাপ্তাই যাওয়ার বিষয়টি পরিবারের কেউ জানতেন না বলে জানান ইসরাফিল।

ফুটবল ছিল প্রিয়, বেড়াতেও ভালোবাসতেন

সাজিদের সহপাঠী ইসরাফিল হোসেন বলেন, সাজিদ খেলাধুলা খুব পছন্দ করতেন। বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসির ভক্ত ছিলেন তিনি। এলাকার ও জেলার সমিতির হয়ে ফুটবলও খেলতেন। কিছুদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের ফুটবল টুর্নামেন্ট হয়েছে। সেখানে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছিলেন সাজিদ।

ইসরাফিল বলেন, পড়াশোনায়ও সাজিদ ভালো ছিলেন। সর্বশেষ সেমিস্টার পরীক্ষায় তাঁর ফলাফল ছিল ৩ দশমিক ৮০। সব সময় ভালো ফল করার চেষ্টা করতেন তিনি।

পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতেন সাজিদ শাহরিয়ার

সাজিদের সহপাঠীরা জানান, বেড়াতেও ভালোবাসতেন সাজিদ। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। বিশেষ করে পাহাড়ে ট্র্যাকিং তাঁর খুবই পছন্দের ছিল। তবে সাজিদের কাপ্তাই যাওয়ার বিষয়টি পরিবারের কেউ জানতেন না বলে জানান ইসরাফিল। তিনি বলেন, গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ করেই তিনি ঘুরতে বের হয়েছিলেন। বেড়াতে যাওয়ার কথা পরিবারের কাউকে বলেননি।

গতকাল দিবাগত রাত তিনটা পর্যন্ত সাজিদের লাশ রাখা হয় কাপ্তাই থানায়। সেখানে অবস্থানরত তাঁর খালু আবু জাফর বলেন, ‘সাজিদ ছিল আমাদের সবার খুব প্রিয়। পরিবারের ছোট ছেলে ছিল সাজিদ। তাই সবার আদরের ছিল। এলাকার মানুষও তাকে খুব ভালোবাসত।’

Read full story at source